


বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: মোট রোগীর সংখ্যা প্রায় এক লাখ ছুঁইছুঁই। তার মধ্যে ৬২ হাজার যক্ষ্মা রোগীকে চিকিৎসার আওতায় আনতে পেরেছে রাজ্য। আর তাঁদের ৬০ শতাংশকেই ‘দত্তক’ নিল বাংলার অসংখ্য সহানুভূতিশীল মানুষ, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। যখন একদিকে মানুষ দিনরাত নৃশংসতা, বীভৎস, বিকৃতি, হিংসার বহিঃপ্রকাশ দেখে দেখে ক্লান্ত, এই দৃষ্টান্ত ফের প্রমাণ করল, এখনও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো লোকের অভাব নেই রাজ্যে। মানবিকতাও মোটেই শেষ হয়ে যায়নি! স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, বাংলার ৩৭ হাজারেরও বেশি টিবি রোগীকে ‘দত্তক’ নেওয়া হয়েছে।
‘দত্তক’ নেওয়া ব্যাপারটা ঠিক কী? জাতীয় যক্ষ্মা নির্মূলকরণ অভিযানে টিবি রোগীদের পুষ্টিকর খাওয়াদাওয়া নিশ্চিত করতে দুটি প্রকল্প চালু করা হয়েছে। একটি হল ‘নিক্ষয় পোষণ যোজনা’। অন্যটি ‘নিক্ষয় মিত্র’। ‘নিক্ষয় পোষণ যোজনা’য় যক্ষ্মা রোগীকে কেন্দ্রের সরকারের তরফে মাসে মাসে হাজার টাকা করে আর্থিক সাহায্য করা হয়। ছ’মাস ধরে টিবি’র চিকিৎসা চলে। রোগীও প্রতি তিনমাস অন্তর দু’কিস্তিতে এই টাকা পান। প্রতিবার ৩ হাজার টাকা (তিন মাসের জন্য) করে দেওয়া হয় তাঁকে।
দ্বিতীয় প্রকল্পটি হল নিক্ষয় মিত্র। এই প্রকল্পে যেকোনও সাধারণ মানুষ, সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যক্ষ্মা রোগীদের পুষ্টিকর খাবার (চাল, ডাল, সোয়াবিন, ডিম, মাংস ইত্যাদি) কিনে দিতে পারেন। দেখা গিয়েছে, মাসে মাসে এই পুষ্টিকর খাদ্যের জন্য একজন রোগীর ন্যূনতম ৫০০ টাকা খরচ হয়। সেই অর্থ বা সমতুল্য পরিমাণের পুষ্টিকর খাদ্য কিনে যাঁরা যক্ষ্মা রোগীদের পাশে দাঁড়ান, তাঁরাই নিক্ষয় মিত্র। দপ্তর সূত্রের খবর, ২০২২ সালে এই প্রকল্প শুরু হয়েছে। বর্তমানে দুই ২৪ পরগনা, বর্ধমানসহ কয়েকটি জেলার জেলাশাসক, মহকুমা শাসক, বিডিও, মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক থেকে স্বাস্থ্যদপ্তরের বিভিন্ন স্তরের কর্মী-আধিকারিক-চিকিৎসক নিক্ষয় মিত্র হয়েছেন। রাজ্যের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী দত্তক নিয়েছে শ্যাম স্টিল। সংস্থার সিএসআর প্রকল্পের কর্তা আনজানিকুমার শর্মা বলেন, প্রকল্প শুরুর সময় থেকেই আমরা যক্ষ্মা রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। বাঁকুড়ার মেজিয়া আর শালতোড়া ব্লকের অসংখ্য যক্ষ্মা রোগীকে সংস্থার তরফে দত্তক নেওয়া হয়েছে। রামকৃষ্ণ মিশনসহ বহু সংগঠনও প্রচুর রোগীকে দত্তক নিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের বায়োটেকনোলজি বিভাগের ডঃ সপ্তর্ষি বিশ্বাস ও নদীয়ায় সেন্ট্রাল জিএসটি এবং কাস্টমসের সুপাজিরনটেন্ডেন্ট বিদ্যুৎকুমার টিকাদার রীতিমতো ৪০ জন রোগীকে দত্তক নিয়েছেন। স্বাস্থ্যদপ্তরের নিক্ষয় মিত্র প্রকল্পের রাজ্য কনসালটেন্ট ডাঃ জুহি চক্রবর্তী নিজেও একজন নিক্ষয় মিত্র। তিনি বললেন, ভালো কাজ হচ্ছে। তবে এখনও বহুদূর যাওয়া বাকি। স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রের খবর, উত্তর দিনাজপুর, পূর্ব মেদিনীপুর, নদীয়া প্রভৃতি জেলা এই প্রকল্পে প্রশংসনীয় অগ্রগতি করেছে। যেমন, নদীয়াএ এবছর ১০৪৮ জন টিবি রোগীকে দত্তক নেওয়া হয়েছে। তার প্রায় তিনভাগের একভাগ রোগীকে দত্তক নিয়েছেন জেলার ২৫৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী ও আধিকারিকই।