


জানাচ্ছেন ফর্টিস হাসপাতালের নেফ্রোলজি এবং ট্রান্সপ্লান্ট বিভাগের ডিরেক্টর ডাঃ পার্থ কর্মকার।
চা
‘এক কাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই ’, থেকে শুরু করে ‘এক কাপ চা খাস্তা লেড়োয় সকালটা শুরু’— বাঙালির সঙ্গে এই ভিনদেশি পানীয়ের সম্পর্ক আদি ও অকৃত্রিম।
চা গাছের বিজ্ঞানসম্মত নাম ক্যামেলিয়া সিনেনসিস। তৃতীয় শতাব্দীতে চীনা চিকিৎসক হুয়া তাও তাঁর গ্রন্থে প্রথমবার চায়ের উল্লেখ করেন। পর্তুগিজ পাদ্রী ও বণিকদের হাত ধরেই ইউরোপে পৌঁছয় এই সুগন্ধি পানীয়। বাড়তি জনপ্রিয়তার জন্য ব্রিটিশরা চায়ের বাণিজ্যিকীকরণে মন দেয়। ভারতে ব্যাপক হারে চা রোপণ শুরু করে তারা। এই পানীয়তে ক্যাফিন থাকে। এই উপাদান মস্তিষ্কে বিশেষ উদ্দীপনা তৈরি করে।
• চায়ের উপকার: চা পাতায় পলিফেনলস নামে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা হৃদরোগ, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপের আশঙ্কা কমায়। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। মুখ ও ত্বকে ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। হাড়ে খনিজ বা মিলারেলসের ঘনত্ব বাড়িয়ে ভঙ্গুর হওয়ার থেকে রক্ষা করে। অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম (অণুজীব)-এর উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে চা। ফলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা থেকে বিপাক ক্রিয়ার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াগুলো সঠিকভাবে চলতে পারে। চায়ে ভিটামিন ও খনিজ রয়েছে, যা সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
• রয়েছে ঝুঁকিও: উচ্চ মাত্রায় ক্যাফিন থাকায় কিছু ক্ষেত্রে উদ্বেগ, মাথা ঘোরা, ঘুমে ব্যাঘাত এবং বুকজ্বালা ভাব দেখা দিতে পারে। গর্ভাবস্থায় উচ্চ মাত্রায় ক্যাফিন গর্ভপাত ঘটতে পারে। আবার জন্মের সময় শিশুর ওজন খুব কমেও যেতে পারে। এছাড়া অনেকে বারবার উচ্চ তাপমাত্রায় ফুটিয়ে (যেমন ১৪০-১৬০ ডিগ্রি) চা পান করেন। এই প্রবণতা মুখ ও খাদ্যনালীর জন্য অত্যন্ত খারাপ। এই অভ্যেস ক্যান্সারের দিকে ঠেলে দিতে পরে।
• চা ও কিডনির মধ্যে সম্পর্ক: ব্ল্যাক টি’তে উচ্চ অক্সালেট থাকে। তাই অধিকমাত্রায় এই ধরনের চা খেলে কিডনিতে পাথর হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। তবে গ্রিন টি কিডনির জন্য ভালো। একাধিক রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। নচড-১ স্ট্যাট পাথওয়ে কিডনি থেকে অ্যালবুমিন লিকেজ আটকায়। মনে রাখবেন, ব্ল্যাক টি-এর তুলনায় গ্রিন ও হোয়াইট টিতে কম অক্সালেট থাকে। এছাড়া যাদের কিডনি ফেলিওর রয়েছে, তাদেরও চা পানের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, এক্ষেত্রে পরিমিত মাত্রায় জল গ্রহণ জরুরি। তাই কত কাপ চা আপনি পান করতে পারবেন, তার সঠিক পরিমাপের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এছাড়া, রেনাল ফেলিওরের ক্ষেত্রে রোগীর পটাশিয়াম নিয়ন্ত্রণে থাকলে তিনি সামান্য চা খেতে পারেন।
• কতটা চা খাবেন?
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, দিনে এক থেকে দুই কাপ উপকারী। তবে, দিনে সাড়ে তিন কাপের বেশি চা পান ঝুঁকিপূর্ণ। আরও এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, চায়ে চিনি যোগ করলে উপকারী গুণ অনেকটা নষ্ট হয়ে যায়। চিনিতে উচ্চ ক্যালোরি থাকে। তাতে ডায়াবেটিস মাথাচাড়া দিতে পারে। কিছু লোক চায়ের উপর এতটাই নির্ভরশীল যে তাঁরা জল পান কমিয়ে দেন। এতে ডিহাইড্রেশন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ব্ল্যাক টিতে দুধ মিশিয়ে খাওয়া আমাদের শরীরের জন্য বেশ উপকারী।
• টি ব্যাগে ক্ষতি?
টি-ব্যাগে প্লাস্টিক উপাদান থাকে। চায়ের কাপেও থাকে প্লাস্টিক। সেখান থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক আমাদের শরীরের কোষে জমা হয়। যা অঙ্গগুলির ক্ষতি করতে পারে।
লিখেছেন সুদীপ্ত সেন
বিস্তারিত জানালেন অ্যাপোলো হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডাঃ দেবাঞ্জলি সিনহা।
কফি
অফিসে কাজের চাপ। রাত জেগে কোনও বাকি থাকা কাজ শেষ করতে হবে। মুড ভালো নেই। কেমন জানি ক্লান্ত লাগছে। কাজের জায়গা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা হোক বা প্রিয়জনের সঙ্গে একান্তে সন্ধ্যাযাপন। সব ক্ষেত্রেই কফির জুড়ি মেলা ভার। তবে প্রশ্ন একটাই। কতটা পরিমাণ কফি পান নিরাপদ?
কফির মধ্যে ক্যাফেইন, ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান থাকে। তাই নিয়মিত কফি পান স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়। এর পাশাপাশি ডায়াবেটিস ও ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতেও সক্ষম। এই পানীয় শরীরে ওরাল আলসার, প্রস্টেট ক্যান্সার, লিভার ক্যান্সার, ফ্যাটি লিভার ডিজিজ, লিভার সিরোসিসের আশঙ্কা কমাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেয়। একইসঙ্গে অ্যালঝাইমার্স, ডিপ্রেশন অর্থাৎ অবসাদ কমাতে মোক্ষম দাওয়াই কফি। এটি শরীর সতেজ রাখার পাশাপাশি মুডও ভালো রাখে। অনেকেই ওজন বেড়ে যাওয়া নিয়ে, মোটা হওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন। নিয়মিত জিম যাওয়া, মেপে খাওয়া থেকে শুরু করে নানা রকমের ঝক্কি পোহাতে হয়। আর এখানেও মুশকিল আসান কফি। এটি ওজন কমাতে ও মেদ ঝরাতে সাহায্য করে। বিপাকীয় হার বাড়াতেও সাহায্য করে কফি। প্রসঙ্গত, কফিতে উপস্থিত অ্যান্টি অক্সিডেন্ট শরীরের জন্য খুবই উপকারী।
কফির অপকারিতা
কোনওকিছুই অতিরিক্ত ভালো নয়। কফির ক্ষেত্রেও এটি সমানভাবে প্রযোজ্য।অতিরিক্ত কফি খেলে ঘুম কমে যায়। এর জেরে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। অল্পেই মেজাজ হারানোর প্রবণতা বাড়ে। হজমের সমস্যা দেখা দেয়। পেট খারাপ, গ্যাস, অম্বল, বুকজ্বালা শুরু হয়। খালি পেটে অতিরিক্ত কফি পাকস্থলীরও ক্ষতি করে। কিডনির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা কমায়। অতিরিক্ত কফি পান শরীরে রক্তচাপ, হার্টরেটও বাড়িয়ে দেয়। কফি পানের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সচেতন হতে হবে গর্ভবতী মহিলাদের। কারণ অতিরিক্ত কফি পান সন্তান প্রসবে সমস্যা তৈরি করে। হাড়ের স্বাস্থ্যেরও ক্ষতি করে।
কী করণীয়
এক্ষেত্রে দিনে তিন থেকে পাঁচ কাপ অর্থাৎ ২০০-৩৬০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত কফি খাওয়া যেতে পারে। যতটা সম্ভব ব্ল্যাক কফি, ফিল্টার কফি খাওয়া ভালো। অতিরিক্ত চিনি, দুধ, ক্রিম দিয়ে কফি পানের অভ্যেস ত্যাগ করা উচিত। কোনও রোগ ব্যাধি থাকলে আগেভাগেই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
লিখেছেন শোভন চন্দ