


নিজস্ব প্রতিনিধি, ঝাড়গ্ৰাম: ঝাড়গ্রামে হাতির তাণ্ডব চলছেই। জেলায় হাতির হানায় মৃত্যু মিছিলের তালিকায় আরও একটি নাম যোগ হল। রবিবার ভোরে নয়াগ্ৰাম ব্লকের বড়খাঁকরি গ্ৰামের বাসিন্দা জলেশ্বরী সিং বাড়ি লাগোয়া জঙ্গলে মহুল ফুল তুলতে গিয়েছিলেন। দু’টি হাতি তাঁকে শুঁড়ে পেঁচিয়ে মাটিতে আছাড় মেরে মাথা পা দিয়ে থেঁতলে দেয়। স্থানীয় খড়িকা গ্ৰামীণ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে জানান। এই ঘটনা ঘিরে এলাকায় আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। খড়্গপুর বন বিভাগের ডিএফও মণীশ যাদব বলেন, ওই গৃহবধূ ভোরে মহুল ফুল তুলতে গিয়েছিলেন। দলছুট দু’টি হাতির সামনে পড়ে যান। পালানোর চেষ্টা করলে হাতি দু’টি প্রথমে শুঁড়ে তুলে আছড়ে মারে। তারপর পা দিয়ে পিষে দেয়। খড়্গপুর ও ঝাড়গ্রাম বন বিভাগের কর্মীরা খবর পেয়েই দ্রুত এলাকায় ছুটে যান। তাঁকে উদ্ধার করে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। মৃতার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
গ্রামবাসীরা জানাচ্ছেন, জমির ফসল খাওয়া ও বাড়িঘর ভাঙচুরের মধ্যেই হাতির তাণ্ডব আর থেমে থাকছে না। কখনও গোয়াল ঘরে ঢুকে গোরুর পেটে দাঁত ঢুকিয়ে দিচ্ছে। বাছুরকে শুঁড়ে তুলে আছড়ে মারছে। কখনও দলবদ্ধ ভাবে নাগালে পাওয়া মানুষকে মারার চেষ্টা করছে। জঙ্গল এলাকার বাসিন্দাদের কাছে হাতির এই ‘খুনে’ রূপ একবারেই নতুন। গ্ৰামীণ এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তাই আতঙ্ক বাড়ছে। জঙ্গল লাগোয়া এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, বনবিভাগ নিজেদের ইচ্ছামতো হাতির পালকে এক রেঞ্জ থেকে অন্য রেঞ্জে নিয়ে যাচ্ছে। হাতির পালের স্বাভাবিক বিচরণ ক্রমাগত বাধা পাচ্ছে। ঝাড়গ্রাম ব্লকের বন সুরক্ষা কমিটির এক সদস্য বলেন, দিন পাঁচেক আগে ঝাড়গ্রাম রেঞ্জ এলাকায় একটি স্ত্রী হাতি বাচ্চা প্রসব করে। চব্বিশ ঘণ্টার আগেই বন বিভাগের কর্মীরা মা ও শাবক সহ হাতির দলটিকে মানিকপাড়া রেঞ্জে তাড়িয়ে নিয়ে যান। বন বিভাগ ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেয়। হাতি ড্রাইভের নামে শান্ত এই বন্য প্রাণীদের ওপর নির্যাতন চলছে। নয়াগ্ৰাম ব্লকে যেটা হয়েছে, সেটা বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়।
জলেশ্বরী সিংয়ের ছেলে সূর্যকান্ত সিং বলেন, মা ভোরে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। বাড়ি থেকে ১০০ মিটার দূরত্বে ঘটনাটি ঘটে। ছুটে গিয়ে দেখি মা মাটিতে পড়ে আছে। শরীর দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছে। মাথা থেঁতলে দিয়েছে। গ্ৰামের চারপাশে দলছুট হাতির দল আসে। ফসল খায় আবার চলে যায়। কিন্তু এমন ঘটনা আগে ঘটেনি। ঝাড়গ্রাম বন বিভাগের প্রাক্তন আধিকারিক সমীর মজুমদার বলেন, হাতির আক্রমণাত্মক আচারণের পরিবর্তন ঘটছে। দীর্ঘ কর্মজীবনে হাতি গোরুর পেটে দাঁত ঢুকিয়ে দিচ্ছে, এমন ঘটনা শুনিনি। তবে ভোরে জঙ্গলে হাতির পাল মহুল ফুল খেতে আসে। সেইসময় মানুষ দেখলে হাতি আক্রামণ করে। আগে এপ্রিল জুনের সময় হাতির পাল দলমায় ফিরে যেত। সেখানেই সন্তান প্রসব করত। সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। স্ত্রী হাতি বাইশ মাসে শাবক প্রসব করে। এইসময় স্ত্রী হাতি ও হাতির পাল সতর্ক থাকে। মানুষের কাছ থেকে আক্রমণের শঙ্কা থাকলে আক্রমণ করে। বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা কম বলেই প্রাণহানির ঘটনা বাড়ছে।