


মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় একসময় মাথায় তুলে নেওয়ার কথা বলতেন স্বদেশিরা। তখন এই ‘মোটা কাপড়’-এর তালিকায় অন্যতম ছিল ধনেখালি ফ্যাব্রিক। স্বাধীনতার ৭৭ বছর পেরলেও এই ফ্যাব্রিকের আদর আজও কমেনি। ইতিমধ্যেই বাংলার মুকুটে যোগ হয়েছে ধনেখালির জিআই ট্যাগ। গরম পড়লেই বাঙলির ঘরে ঘরে ধনেখালির কদর বাড়ে। আড়াআড়ি নকশার পুরু জমির সুতির মাড় দেওয়া কাপড়, আঁচলে ধানের শিষ, সুতি বা রেশম সুতোর লাল বর্ডার— সাধারণত হালকা রঙের এমন শাড়িই বাড়িতে নিত্য পরার জন্য বেছে নিতেন বাঙালি গৃহিণীরা। তবে যুগের সঙ্গে ভোলবদলেছে শাড়িরও। মূল বৈশিষ্ট্য এক রেখে ধনেখালিতে এসেছে বিবর্তন। একটা সময় ৮০, ৮২, ৮৪ কাউন্টে এই শাড়ি তৈরি হতো। অথচ ফ্যাশনের ব্যকরণ বলে, যে শাড়ির কাউন্ট যত বেশি, সেই শাড়ি তত হালকা। এখন এই ধনেখালির বেশিরভাগই তৈরি হচ্ছে ১০০-১৪০ কাউন্টে। তাই গরমকালের কোনও অনুষ্ঠান বা দৈনন্দিন কর্মস্থল, ধনেখালি শাড়ি সবসময়েই আধুনিকাদের পছন্দের তালিকায় থাকছে।
আর কী কী বদল এসেছে ধনেখালিতে? এই ফ্যাব্রিকের অন্যতম সেরা ডিজাইনার হুগলির ভাগবত ভূষণ ভড়ের পৌত্র জয়দীপ ভড় জানালেন, ‘নকশায় বদল এনে ও নানা রাজ্য সরকারি উদ্যোগে ধনেখালি শাড়িকে ফ্যাশনের অন্যতম অঙ্গ করে তোলার চেষ্টা শুরু হয়েছে। ধনেখালিতে হরাইজন্টাল নকশা ও আঁচলে ধানের শিষ আজও রয়েছে, তবে যুগের চাহিদা মেনে এখন আর মাড় পড়ে না কাপড়ে। রং ব্যবহারেও এসেছে বৈচিত্র্য। এখন জমি হয়েছে উজ্জ্বল রঙের। বুটি ও নকশাতেও এসেছে বিবর্তন। এই ধরনের শাড়ি পরে শরীর ও মন দুই-ই জুড়োয়। আগে ধনেখালি বললেই মাছের নকশা বোঝাত। প্রায় ৭৫ বছর ধরে ধনেখালির মাছ নকশা শাড়িপ্রেমীদের কাছে ‘হিট’। তবে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মাছের নকশায় আনা হয়েছে দেশীয় শিল্পের ছোঁয়া। আমরা ফুলবডি ব্রোকেড, সম্বলপুরি কটকি ও অন্ধ্রের নানা নকশা ধনেখালিতে তুলছি এবং তা খুবই সাফল্যের সঙ্গে চাহিদা মেটাচ্ছে।’
সাধারণত ৭০ শতাংশ ধনেখালি ও ৩০ শতাংশ কটন নকশাদার সুতো, এই অঙ্ক ধরেই শাড়ি তৈরির হিসেব এগয়। বাংলায় ধনেখালি নকশার নানা প্রকারভেদ বোঝাতে গিয়ে জয়দীপ জানালেন, ‘মাঠা, নকশা ও বুটিই মূলত ধনেখালির সম্পদ। মাঠা বলতে শুধু থান, যেখানে নকশা আলাদা করে কিছু থাকবে না। পাড় থাকবে আলাদা রঙের। নকশা তো নামেই মালুম! আর রয়েছে প্লেন জমির উপর বুটি কাজ। আজও এই ধরনের ধনেখালির কদর। এছাড়াও রঙ্গবতী নামেরও একটি ধরন বাজারে মেলে। তবে এই শাড়ির জমি বেশ মোটা। রং ওঠার ঝুঁকিও থাকে। তাই এই শাড়ি বাজারে কম মেলে।’
পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরতে নামীদামি সরকারি চাকরি ছেড়ে হরিপালে চলে এসেছিলেন জয়দীপ। বিশ্ব ঘুরে নানা ছবি ও নকশাকে ধনেখালি শাড়িতে নিয়ে আসছেন তিনি। সম্প্রতি ওমানের কার্পেটের নকশাকে ১০০-১৪০ কাউন্টের মিহি সুতোর ধনেখালিতে তুলেছেন তিনি। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার শিল্পসৌকর্যও তাঁকে আলাদা করে উৎসাহিত করে ধনেখালির নকশা-বিপ্লবের পথে। এই গরমে বঙ্গনারীদের জন্য তিনি বেছে দিলেন চওড়া পাড় বুটি বা চওড়া পাড়ের নকশা কাপড়। জানালেন, ধনেখালিতে ইক্কতের নকশার চাহিদাও এবার বেশি।
বাংলার এই শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে বঙ্গদেশের ফুল-পাতা-পাখি সহ নানা মোটিফ যেন বাংলারই গল্প শোনায়। আঁচলে তার মায়ের আদরের মতো ধানের শিষ। রঙে মাটির বুকের গন্ধ। এই নিয়েই বাংলার ধনেখালি শাড়ি জেগে থাকে বাংলার গৃহিণীর মনের তাকে।
মনীষা মুখোপাধ্যায়