


কী সুন্দর মায়াময় এই বিশাল পৃথিবী! সুনীল সাগর থেকে উত্তুঙ্গ পর্বতমালা, ঊষর মরুভূমি থেকে গহীন অরণ্য, গগনচুম্বী অট্টালিকার নগরী থেকে প্রাচীন জনপদ—সর্বত্রই ছড়িয়ে রয়েছে অপার সৌন্দর্য। তারই সন্ধানে ছুটে বেড়ায় ভ্রমণ পিয়াসী মন। তাই তো পাখির ডানায় রৌদ্রের গন্ধ মেখে উড়ে চলা। দলবদ্ধভাবে কিংবা একা।
হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত: ইলিশ বাঙালির কাছে রসনা তৃপ্তির বড় আকর্ষণ। অনেকে তো এও মনে করেন খাঁটি পদ্মার ইলিশের মতো সুস্বাদু খাদ্য বস্তু পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি আর নেই। আর সেরা ইলিশ মেলে যেখানে পদ্মা-মেঘনা আর ডাকাতিয়া নদী এসে মিলেছে সেই ত্রিবেণী সঙ্গমে। বাংলাদেশের চাঁদপুর। সেখানকার ইলিশের খ্যাতির জন্য সরকারিভাবেই সে জায়গার নাম, ‘ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর’।
চাঁদপুরে আমি ঢাকা থেকে আগেও গিয়েছি সড়ক পথে কুমিল্লা হয়ে। ঘুরে দেখেছি চাঁদপুর মোহনা, ইলিশও খেয়েছি। তবে এবারে চাঁদপুর যাওয়ার পিছনে বিশেষ এক কারণ আছে, ইচ্ছা আছে এক বিশেষ অভিজ্ঞতা অর্জনের। ঢাকার সদরঘাটে যখন উপস্থিত হলাম তখন সকাল আটটা। ঢাকার দু’জন ভালোবাসার মানুষও আছেন আমার সঙ্গে। এবার আমার চাঁদপুর যাত্রা জলপথে। নদী দেখতে দেখতে যাব।
সদরঘাট অঞ্চলটা বেশ ঘিঞ্জি। স্টিমার কোম্পানির লোকগুলোর কর্মচঞ্চলতা চোখে পড়ার মতো। একটা মাঝারি আকৃতির স্টিমারের কেবিন বুক করা হল। বেশ সস্তাই ভাড়া। শুনলাম, যখন পদ্মা সেতু ছিল না, তখন এই কেবিনের ভাড়াই নাকি ছিল তিনগুণ বেশি। তাছাড়া, অ্যাডভান্স বুকিং না করলে নাকি কেবিনও মিলত না।
যাইহোক চড়ে বসলাম লঞ্চে। তার নীচের অংশটা একটা হলের মতো ফাঁকা জায়গা। সেখানে স্বল্প ভাড়ায় স্থানীয় গরিব মানুষজন, ছোট ব্যবসায়ীরা তাদের মালপত্র নিয়ে যাওয়া-আসা করে। আর দোতলায় নানা আকৃতির বেশ কিছু কেবিন আছে। যার একটিতে আমরা এসে উঠলাম। সৌভাগ্যবশত সেটা স্টিমারের সামনের দিক। রেলিং ঘেরা ছোট ডেকও আছে। বেলা সাড়ে ন’টা নাগাদ যাত্রা শুরু করল আমাদের স্টিমার। কেবিন থেকে বেরিয়ে ডেকে গিয়ে বসলাম আমরা। ইতিহাসের একটা সময় ছিল যখন বুড়ি গঙ্গা বেয়েই বিশেষত মুর্শিদাবাদের সঙ্গে ঢাকার সংযোগ স্থাপন করত এই নদী পথ। বুড়ি গঙ্গা নদী আজ অপরিসর। জল এমন দূষিত যে মাছও নাকি তেমন মেলে না। নদীর দু’পাশের কল-কারখানার বর্জ্য এসে মিশছে নদীর জলে। আশপাশের স্টিমার-নৌকার ভিড় কাটিয়ে এগিয়ে চলতে লাগল আমাদের স্টিমার। এক জায়গায় দেখলাম নদীর পাড়ে সার সার স্টিমার গা ঠেসাঠেসি করে নিস্তব্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। আমার সঙ্গী খবরের কাগজের লোক। সে নানা খবর রাখে। সে বলল, ওই স্টিমারগুলোকে নাকি গোয়ালন্দ আর কাঠালিয়া ঘাট থেকে তুলে এনে এখানে রাখা হয়েছে। পদ্মা সেতু হওয়ার কারণে নাকি যাত্রী মিলছে না। তিন-চার তলা বিশালাকৃতির স্টিমারগুলোর চালাবার মতো খরচ উঠছে না। ওরা এখন পরিত্যক্ত। ওদের যন্ত্রাংশ খুলে বিক্রি করা হবে, তারপর কাটাই করা হবে। কথাটা শুনে মনটা একটু বিষণ্ণ হয়ে গেল। বছরখানেক আগে প্রথমবার যখন বাংলাদেশ এসেছিলাম, তখন পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হয়নি। এমনই কোনও একটা স্টিমারে গোয়ালন্দ ঘাট থেকে পদ্মা পেরিয়েছিলাম আমি। দেখেছিলাম চন্দ্রালোকিত রাতে পদ্মার অপরূপ শোভা। সে ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। এক সময় ঢাকার সদরঘাটকে পিছনে ফেলে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেল স্টিমার। আমাদের যাত্রা পাশের দু’পাশে নগর সভ্যতার চিহ্ন মুছে যেতে থাকল। স্টিমার এক সময় বাঁক নিল। জল এখানে পরিষ্কার। আমার সঙ্গীরা জানাল বুড়ি গঙ্গা ছেড়ে শীতলক্ষা নদীতে এসে পড়েছি আমরা। শীতলক্ষা বেয়ে এগিয়ে চলল জল যান। মাঝে মাঝে চোখে পড়ছে ছোট ছোট জেলে নৌকা, বা উল্টো দিক থেকে আসা বালি ভর্তি ট্রলার নৌকা। আমাদের মাথার ওপর মেঘমুক্ত আকাশ এখন। যদিও বর্ষা ঋতু। এক সময় রোদের তেজ প্রচণ্ড হওয়াতে কেবিনের ভিতর ঢুকে আসতে হল। তবে সমস্যা নেই তাতে। কেবিন থেকেই বাইরের সব কিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সময় এগিয়ে চলল। এক সময় দেখতে পেলাম একটা ছোট নদী এসে মিশছে আমাদের যাত্রাপথের সঙ্গে। নদীর জলের রং দুধের মতো সাদা। আমার সঙ্গী দু’জনের এ পথে যাওয়া-আসা আছে। আমার যাত্রাপথে তারা আমারই গাইডও বটে। সেই ধবল নদীকে দেখিয়ে তারা আমাকে বলল, ‘ওই হল, জীবনানন্দ দাশের কবিতার ধলেশ্বরী নদী।’ কবিতায় পড়া নদীর রূপ চাক্ষুস করলাম আমি। শীতলাক্ষ, ধলেশ্বরী, মেঘনাকে চাক্ষুস করব বলেই তো এই যাত্রাপথ নির্বাচন করেছি।
সময় এগিয়ে চলল। শীতলক্ষা বেয়ে মেঘনাতে পৌঁছে গেলাম আমরা। যে মেঘনা পৌঁছে দেবে আমাদের গন্তব্য চাঁদপুরে। মেঘনা নদী পদ্মার মতো অত বিস্তৃত নয়। আবার পদ্মার মতো শান্তও নয়। মেঘনা চঞ্চলা। তার ঘোলা জল সব সময় পাক খেয়ে চলছে। মাঝে মাঝে মেঘনার পারে চোখে পড়ছে ছোট-বড় ঘাট। নৌকা, স্টিমার চলাচল করছে সেখান থেকে। একবার মেঘনার পথে একটা ঘাটে আমাদের স্টিমার মিনিট দশেকের জন্য ভিড়ল। মালপত্র সমেত কিছু যাত্রী উঠল স্টিমারে। সেই ছোট ঘাটের নাম ‘সুখের ঘাট’। শুনলাম ‘দুঃখের ঘাট’ নামেও নাকি একটা ঘাট আছে। সুখ-দুঃখ নিয়েই তে ঘাটের কথা—নদীর কথা—জীবন কথা। অবশেষে বেলা একটা নাগাদ ইলিশের বাড়ি চাঁদপুরে এসে পৌঁছলাম আমরা। একটা ত্রিভুজ আকৃতির স্থলভূমির মতো জায়গা। তাকে তিন দিক থেকে ঘিরে ধরেছে তিনটি নদী। পদ্মা-মেঘনা আর ডাকাতিয়া। পদ্মার সাদা জল, মেঘনার ঘোলা আর ডাকাতিয়া নদীর জল কালো। ডাকাতিরা নদী অন্য দুই নদী অপেক্ষা কলেবরে, জলপ্রবাহে অনেকটাই ছোট। তিন নদী এখানে এসে মিলিত হয়ে পাক খেতে খেতে এগিয়েছে সমুদ্রে যাবে বলে।
আমাদের থাকার জায়গা আগে থেকেই ঠিক করা আছে মোহনার গায়ে চাঁদপুর প্রেস ক্লাব ভবনে। মাছের ব্যবসায়ীরা, পর্যটকরা এখানে নিয়মিত যাওয়া-আসা করে বলে বেশ কিছু ছোট-বড় হোটেল রেস্টুরেন্টও আছে। বিশেষত ইলিশের পদ পাওয়া যায় সেখানে। তবে জেটিতে নেমে আমাদের প্রথম গন্তব্য হল, চাঁদপুরের বিখ্যাত ইলিশের আড়ত। মিনিট দশেকের পথ জেটি থেকে। আগে যখন কুমিল্লা হয়ে সড়ক পথে চাঁদপুর এসেছিলাম সেবারও গেছিলাম সেই আড়তে। বিশাল টিনের শেড ঘেরা জায়গার নীচে মাছের আড়ত ঘরগুলো। তাদের সামনে কোথাও রাখা আছে স্তূপাকৃত ইলিশ। কোথাও বা শোলার বাক্সে প্যাক করা হচ্ছে মাছ, কোথাও বা সকালে আনা মাছগুলো আকার অনুসারে বাছা হচ্ছে বা বিশাল বিশাল দাঁড়ি পাল্লায় ওজন করা হচ্ছে। আড়তদার, জেলে, মাঝি-মল্লার চিৎকার চেঁচামেচিতে জায়গাটা সরগরম। নির্দিষ্ট ব্যক্তির আড়তে পৌঁছে গেলাম আমরা। সে জানাল, কোনও চিন্তা নেই সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। শুধু স্থানীয় কোনও মানুষের সঙ্গে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন নেই। কারণ, আমি বিদেশি নাগরিক তাই সমস্যা হতে পারে।
সেই ট্রলার মালিকের সঙ্গে কথা বলার পর ভ্যান রিকশ চেপে পৌঁছে গেলাম চাঁদপুর প্রেস ক্লাবে। দোতালা সুন্দর ছিমছাম প্রেস ক্লাব। ইলিশ নয়, যা খাবার পাওয়া গেল সেই মুরগির মাংস আর ভাত দিয়েই দুপুরের খাওয়া সারা হল। এমনিতে আমার দুপুরে ঘুমের অভ্যাস নেই। তাছাড়া কোথাও গেলে ঘুমিয়ে সময় নষ্ট না করে চারপাশ ঘুরে দেখি। কিন্তু বিশেষ কারণবশত এই দিন দুপুরে ঘুমিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন আছে। কাজেই আমরা তিনজনই খাওয়া সেরে ঘুমিয়ে নিলাম। ঘুম যখন ভাঙল তখন বিকেল হয়ে গিয়েছে। প্রেস ক্লাব থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম মোহনার পার্কে। বিরাট একটা ইলিশের মূর্তি আছে এ জায়গায়। চাঁদপুরের আইকনিক সিম্বল এই ইলিশ মূর্তি। গাছে ঘেরা এই পার্কের মতো জায়গাতে বিকেলবেলা ছোটখাট মেলার মতোও বসে। লোকজন নৌকা ভ্রমণের জন্যও এখানে আসে। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে লোকজনকে হাঁক দিচ্ছে মাঝিরা। কোনও কোনও জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে ছোট-বড় ইলিশ ধরার ট্রলার বা জেলে নৌকা। সে সব নৌকাতে কেউ বা জাল গোটাচ্ছে, কেউ বা রান্নাবান্না করছে। দেখে মনে হয় ওই নৌকাগুলোই ওদের ঘরবাড়ি। চারপাশ থেকে নদীর ঠান্ডা বাতাস ভেসে আসছে আর তার সঙ্গে জলের গন্ধ। আকাশের দিকে তাকিয়ে খেয়াল করলাম মোহনার আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। এক সময় পদ্মার বুকে দিনের শেষ আলো ছড়িয়ে সূর্য অস্ত গেল। পার্কের স্ট্রিট লাইটগুলো জ্বলে উঠল। মোহনা ত্যাগ করে এগলাম কাছেই গঞ্জের মতো জায়গা আছে সেদিকে। সেখানে একটা কালী মন্দিরও আছে। সেই কালী মন্দির দর্শন করে ইতস্ততভাবে গঞ্জের এদিক-ওদিক ঘুরে ঘণ্টাখানেক সময় কাটিয়ে আমরা প্রেসে ক্লাবে ফেরার আগে একটা হোটেলে গিয়ে ঢুকলাম ইলিশ খাব বলে। মাছের পিসের আকার অনুসারে তার দাম। তাছাড়া, ইলিশ মাছের লেজের ভর্তা ইত্যাদি নানা পদ পাওয়া যায়। চাঁদপুরের ভাজা ইলিশের তেল আর সর্ষে ইলিশ দিয়ে ভাত খেলাম আমরা। স্বাদ অমৃতের মতো না হলেও বেশ ভালোই। আসলে এপার বাংলার ইলিশ রান্নার সঙ্গে ওপার বাংলার ইলিশ রান্নার খানিকটা পার্থক্য আছে। বাংলাদেশে অনেক জায়গাতেই ইলিশ রান্নাতে পেঁয়াজ, রসুন ব্যবহার করা হয়। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ প্রেস ক্লাবে আমাদের ঘরে ফিরে গল্পগুজব শুরু করলাম। রাত বেড়ে চলল আর তার সঙ্গে সঙ্গে আমার মনের মধ্যেও যেন উত্তেজনা বাড়তে লাগল। আমার মনের ইচ্ছা সত্যিই পূরণ হবে কি? আরও ঘণ্টা দুই বাদে একটা ফোন কল এল আমার সঙ্গীর মোবাইলে। প্রেস ক্লাবের দোতলা থেকে নেমে বাইরে বেরতেই দেখলাম একজন যুবক দাঁড়িয়ে আছে। সে নিজের নাম বলল ঝিনুক। সে এসেছে আমাদের নিয়ে যেতে। কাছেই ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে সে নৌকা নিয়ে এসেছে। সেই মাছ ধরার ছোট ট্রলার বা নৌকার মালিক চাঁদপুর আড়তের সেই আড়তদার তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়েছে।
এরপর তাকে অনুসরণ করলাম আমরা। কয়েক কদম এগতেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হল। সেই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই এক বুক রোমাঞ্চ নিয়ে এগলাম নদীর দিকে। ঝিনুক নামের ছেলেটা বলল, ‘এমন ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতেই নাকি ভালো ইলিশ পাওয়ার সম্ভাবনা।’ হ্যাঁ, আমরা চাঁদপুরে এসেছি ইলিশ ধরা দেখব বলেই। সেই রোমাঞ্চ অনুভব করব বলেই।
ডাকাতিয়া নদীর যে ঘাটে ট্রলার রয়েছে সেখানে আলোর ব্যবস্থা না থাকলেও আকাশে চাঁদের আলো আছে। একটাই ট্রলার সেখানে। ছোট ট্রলার। বড় আকৃতির যন্ত্র চালিত নৌকাও বলা যেতে পারে। একটা ঘরের মতো জায়গা আছে সেই যান্ত্রিক নৌকাতে। তার মাথার ওপর শুধু একটা লাল বাতি জ্বলছে। বাকি অংশটা উন্মুক্ত। সেখানে খোলের ওপর পাটাতন বিছিয়ে স্তূপাকৃত জাল রাখা আছে। আরও তিনজন নানা বয়সি লোক আছে ট্রলারে। ইলিশ ধরার সেই অলৌকিক জলযানে ওঠার পর ঝিনুক আমাদের বলল, ঘরের মতো জায়গার ভিতরে গিয়ে বসতে। বাইরে পাটাতনের ওপর বসলে হঠাৎ দুলুনি হলে জলে ছিটকে পড়ার আশঙ্কা আছে। ঝিনুক সহ অন্যরা অবশ্য উন্মুক্ত পাটাতনে বৃষ্টির মধ্যেই রইল। মৃদু শব্দ তুলে চলতে শুরু করল আমাদের যান্ত্রিক নৌকা। মোহনার দিকে এগতেই দেখলাম আরও বেশ কিছু ট্রলার, ছোট-বড় নৌকা এগিয়ে চলেছে ইলিশ ধরবে বলে। বেশ কিছু বড় ট্রলারও আছে। তারা যাচ্ছে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরবে বলে।
বেশ খানিকটা মোহনার পথ ধরে এগবার পর ছোট ছোট ট্রলারগুলো পরস্পর থেকে দূরে সরে গিয়ে যেন নিজেদের সীমানা ভাগ করে নিল। এক সময় আমাদের ট্রলার থেকে জলে জাল ফেলা শুরু হল। জাল ফেলতে ফেলতে এক জায়গায় গিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে নোঙর ফেলল নৌকা। প্রাথমিক কাজ শেষ। বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে ভিজতে ট্রলারের খোলা জায়গাতেই বসে রইল জেলেরা। বেড়ে চলল রাত। কখনও কাছে-দূরে ভেসে যাচ্ছে ছোট বড় জেলে ডিঙি। তারাও এই বৃষ্টির রাতে মাছ শিকারে বেরিয়েছে। সে সব নৌকার ছইয়ের ভিতর জোনাক বিন্দুর মতো জ্বলছে লণ্ঠনের আলো। আমাদের নৌকার জেলেরা মাঝে মাঝে জলে হাত ডুবিয়ে কী যেন দেখছে। হয়তো বা জলের স্রোত বা অন্য কিছু। একবার একজন জেলেকে এক আজলা জল নিয়ে শুকতেও দেখলাম। জানি না তারা জলে ইলিশের গন্ধ পায় কি না? মাঝে মাঝে মেঘ এসে ঢেকে দিচ্ছে চাঁদকে। চারপাশে নেমে আসছে অন্ধকার। অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে উন্মুক্ত পাটাতনে বসে ইলিশের ঝাঁকের জন্য প্রতীক্ষা করে থাকা লোকগুলো। চারপাশে বর্ষণ সিক্ত নিস্তব্ধ চরাচর। এ যেন এক অচেনা পৃথিবী।
শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সঙ্গীর ডাকে ঘুম ভাঙল। সে বলল, ‘মাছ উঠছে দেখুন।’ চোখ মেলে দেখি ভোরের আলো ফুটে গেছে। জাল টেনে মাছ ওঠানোর কাজ শুরু হয়েছে। জালের মধ্যে ছটফট করছে জ্যান্ত ইলিশ! চাঁদপুরের বিখ্যাত রুপোলি ইলিশ। জাল থেকে খুলে ফেলার পরও তারা নড়ছে। এর আগে জ্যান্ত ইলিশ কখনও চোখে দেখিনি। অদ্ভুত দৃশ্য! এক সময় জাল পুরো টেনে তোলা হল, খোল ভরে উঠেছে ইলিশে। সকালের প্রথম আলোতে ঝলমল করছে তাদের শরীর।
নোঙর উঠিয়ে ফেরার জন্য যাত্রা শুরু হল এরপর। ঝিনুক আমাদের মাছগুলো দেখিয়ে বলল, ‘লাল চোখের ইলিশ। আড়ত মালিক ভালো দাম পাবে।’
এরপর সে স্বগোতক্তির স্বরে বলল, ‘আড়তে মাছ জমা করে একটা ইলিশ কিনে নিয়ে বাড়ি যাব। মেয়ে ইলিশ খেতে চাইছে ক’দিন ধরে। ইলিশের যা দাম, কিনে উঠতে পারিনি।’
কথাটা শুনে আমি প্রশ্ন করলাম, ‘তুমি ইলিশ কিনবে কেন? এত ইলিশ ধরলে সারা রাত জেগে। একটা ইলিশ তো তুমি এর মধ্যে থেকেই নিতে পার।’
সে একটু বিষণ্ণ হেসে বলল, ‘নিলে আমার কাজ চলে যাবে। ওই দেখুন ইলিশের লাল চোখ আমাদের দেখছে।’—এই বলে সে আঙুল তুলে দেখাল ঘরের মতো জায়গার মাথার ওপর বসানো সিসি টিভি ক্যামেরা।