


স্বার্ণিক দাস, কলকাতা: সদ্য গাড়ি কিনেছেন হরিদেবপুরের ব্যবসায়ী। পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভবানীপুরের একটি রেস্তরাঁয় যাবেন সেলিব্রেট করতে। কিন্তু বাড়ির কেউই তো গাড়ি চালাতে পারেন না। কী হবে! অগত্যা ‘ওয়ার্কইন্ডিয়া’ অ্যাপের মাধ্যমে ড্রাইভার সেন্টারের দ্বারস্থ হলেন তিনি। নিমেষে পেয়ে গেলেন ড্রাইভার। নাম মোহিত কুমার। যথা সময়ে হাজির হয়ে সবাইকে নতুন গাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে গেলেন রেস্তরাঁয়। আনন্দ উদযাপন শেষে বেরিয়ে এসেই ব্যবসায়ীর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। দেখলেন, গাড়ি ও চালক দুই-ই গায়েব। মোহিত কুমারের ফোন বন্ধ।
কয়েকদিন আগে ভবানীপুরে এই গাড়ি চুরির ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিস। তাদের জেরা করে মিলল চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা গিয়েছে, নকল আধার কার্ড ও ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখিয়ে ড্রাইভার সেন্টারে চাকরি জুটিয়েছিল মোহিত। সে একা নয়। শহর ও শহরতলিতে এমন একাধিক ড্রাইভিং সেন্টারে ঢুকে রয়েছে গাড়ি চুরি ও পাচার চক্রের সদস্যরা। পুলিসের দাবি, এই পাচারকারীরা আন্তঃরাজ্য গ্যাংয়ের সক্রিয় সদস্য। শহর ও শহরতলি থেকে গাড়ি চুরি করে তার রেজিস্ট্রেশন ও চেসিস নম্বর দুই-ই বদলে দিচ্ছে তারা। এরপর সেই গাড়ি চলে যাচ্ছে বিহার, ঝাড়খণ্ড হয়ে নেপালে। এর জন্য সময় লাগছে মাত্র দেড় দিন। এত কম সময়ে নম্বর বদল করে বিদেশে গাড়ি পাচারের ঘটনায় রীতিমতো চিম্তার ভাঁজ পড়েছে পুলিসকর্তাদের কপালে। ভবানীপুরের এই ঘটনা সামনে আসার পর সবক’টি থানাকে বিশেষ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে বলেও সূত্রের খবর।
কীভাবে কাজ করছে এই গ্যাং? গাড়ি চালাতে পারে এমন কিছু যুবককে তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে নকল আধার কার্ড ও ড্রাইভিং লাইসেন্স। তা দেখিয়েই বিভিন্ন সেন্টারে চাকরি খুঁজছে পাচারকারীদের ‘ফার্স্ট চেইন’। প্রথম সুযোগেই যে কোনও গাড়ি নিয়ে ভাগছে না তারা। অপেক্ষা করছে দামী এসইউভি গাড়ির জন্য। কারণ, সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ির বাজারে এই গাড়ির সর্বাধিক চাহিদা। সেই মতো ‘ছদ্মবেশী’ গাড়িচোররা টার্গেট করে মাস ছয়েকের পুরনো এসইউভি গাড়ি। সেরকম কোনও গাড়ি চালানোর কাজ এলেই পাচারকারীদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে শেয়ার হয়ে যাচ্ছে গাড়ির ছবি ও নম্বর। এরপর মালিকের নজর এড়িয়ে গাড়ি নিয়ে উধাও হচ্ছে চোর। সেই গাড়ি প্রথমে চলে আসছে এন্টালি এলাকায়। সেখানে বদলে দেওয়া হচ্ছে নম্বরপ্লেট। তবে মনগড়া কোনও গাড়ির নম্বর নয়, আরটিও থেকে আগে ইস্যু করা হয়েছে, এমন কোনও নম্বরপ্লেট লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে গাড়িতে। উদ্দেশ্য, পুলিসের সন্দেহ এড়ানো। তারপর চুরি করা গাড়ি আসানসোল হয়ে চলে যাচ্ছে ঝাড়খণ্ডে। সেখান থেকে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়। তদন্তে পুলিস জেনেছে, প্রধানত নেপালে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে এসইউভি।
তদন্তকারীদের প্রশ্ন, ড্রাইভিং সেন্টার ও বিভিন্ন অ্যাপ কর্তৃপক্ষ কি তাহলে কোনও যাচাই প্রক্রিয়া ছাড়াই চাকরি দিয়ে দিচ্ছে? আদৌ কি তাদের কোনও যাচাই প্রক্রিয়া রয়েছে? তা না থাকলে চালকের জমা দেওয়া নথির সত্যতা যাচাইয়ের কোনও উপায় নেই। এসব ক্ষেত্রে গাড়ি চুরি হলে বা অন্য কোনও বিপত্তি ঘটলে দায় কার? সেটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।