


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: আর পাঁচটা দিনের মতোই স্বাভাবিক ছিল জনজীবন। পুরো চিত্রটা আমূল বদলে গেল কয়েক মিনিটে! শুক্রবার ভরদুপুরে আচমকা কেঁপে উঠল কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা। ঠিক কী ঘটছে, বুঝে ওঠার আগেই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল খবর—ভূমিকম্প হচ্ছে! আতঙ্কগ্রস্ত মানুষ যে যার মতো বেরিয়ে এলেন রাস্তায়। পার্ক স্ট্রিট থেকে বি বা দী বাগ অফিসপাড়া, নবান্ন থেকে সল্টলেক সেক্টর ফাইভ—সর্বত্র দেখা গেল, কর্মী-আধিকারকরা বেরিয়ে এসেছেন চার দেওয়ালের ঘেরাটোপ থেকে। নেমে এসেছেন বহুতল আবাসনের বাসিন্দারা। সময় যত গড়িয়েছে, দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তীব্র কম্পন অনুভূত হওয়ার খবর এসেছে। প্রায় সবারই অভিজ্ঞতা—সম্প্রতি এত তীব্র ভূমিকম্প ঘটেনি। আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, এদিন ১টা ২২ মিনিটে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা অঞ্চলে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার নীচে ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল বা এপিসেন্টার। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫.৫।
ভরদুপুরে গোটা কলকাতাই তখন কার্যত রাস্তায়! এমন দৃশ্য শেষ কবে দেখা গিয়েছে, তা নিয়ে যেমন আলোচনা চলল, তেমনই অনেকে উদ্বেগ নিয়ে ফোন করলেন বাড়িতে। নবান্ন, বিধানসভা ভবনে প্রায় সবাই কম্পন টের পান এবং বাইরে বেরিয়ে আসেন। পার্ক স্ট্রিটের এক অফিসের কর্মী বললেন, ‘অদ্ভুতভাবে চেয়ারটা কাঁপছিল। একটা সময় মনে হল গোটা বিল্ডিংই দুলছে। অফিসের সিসিটিভি পর্যন্ত কাঁপছিল।’ তাঁর সহকর্মী বললেন, ‘মাথা এখনও ঘুরছে। আফটার শকে আবার কাঁপতে পারে’। কলকাতায় একটি বাড়ি হেলে পড়ার গুজব ছড়ায়। বেহালার পর্ণশ্রী এলাকার মান্নাপাড়াতে একটি রাস্তা ফেটে দু’ভাগ গিয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।
এসবের মধ্যে বিভিন্ন জেলা থেকে ভূমিকম্পের খবর আসতে শুরু করে। জানা যায়, বারুইপুর গার্লস হাইস্কুলের দেওয়াল ও মেঝেতে ফাটল ধরেছে। বনগাঁ, কাকদ্বীপ, পূর্ব বর্ধমান, নদীয়া, দুই মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রামে কম্পন অনুভূত হয়। বেশ ভালোরকম কম্পন টের পেয়েছে উত্তর ২৪ পরগনার টাকি, বসিরহাট, হিঙ্গলগঞ্জ। কারণ, এসব এলাকার অনতিদূরেই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল। ইছামতী নদীর পাড়ে বেশ কয়েকটি বাড়িতে ফাটল ধরে। বসিরহাটে একটি নির্মীয়মান বাড়ির চাঙড় খসে পড়ে। হিঙ্গলগঞ্জে একটি গয়নার দোকানের কাচ ভাঙে।
কেন কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় বারবার ভূমিকম্প হচ্ছে? বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তথা ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ শঙ্কর নাথ বলেন, ‘বঙ্গোপসাগর থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত রয়েছে ইওসিন হিঞ্জ। এটি কলকাতা শহরে মাটির সাড়ে চার কিলোমিটার নীচ দিয়ে গিয়েছে। সাতক্ষীরায় যে এলাকায় ভূমিকম্পের উত্সস্থল, সেটি এই হিঞ্জ বা লাইনের খুব কাছে। ওই হিঞ্জে অনেকগুলো চ্যুতি বা ফল্ট রয়েছে। যা ভূমিকম্পের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ তথা জিএসআইয়ের অবসরপ্রাপ্ত ডিরেক্টর শিখেন্দ্র দে বলেন, ‘এই এলাকার মাটি পলিসমৃদ্ধ। তাই কম্পন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।’