


তৃতীয় ব্যক্তির প্রভাবে বন্ধুত্ব ভেঙে যেতে পারে? বন্ধুত্বের শর্তগুলো কীভাবে একটা সম্পর্কে কাজ করে? এই নিয়ে বিস্তারিত জানালেন মনোবিদ ডাঃ রীমা মুখোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে কথা বললেন কমলিনী চক্রবর্তী।
বন্ধুত্বে তৃতীয় ব্যক্তির প্রভাব পড়লে সম্পর্ক কি নষ্ট হয়ে যায়? মনোবিদ রীমা মুখোপাধ্যায় জানালেন, নষ্ট হয়, তবে তার বেশ কিছু পর্যায় রয়েছে। আর সেই পর্যায় অনুযায়ী সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হয় বা তা ভেঙে যায়। প্রতিটি পর্যায়ই মনের পরিণতির উপর নির্ভর করে। আর কখন কেমন মানসিক অবস্থা থাকে সেটাও এর উপর প্রভাব ফেলে। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি ঘটনা সাজিয়ে একে একে মনের বদল, বন্ধুত্বের ক্ষেত্রগুলো জানালেন তিনি।
ঘটনা ১
স্কুলের প্রাইমারি ক্লাস থেকেই তৃণা আর অনন্যার বন্ধুত্ব। স্কুলে সারাদিন কাটানোর পরেও একইসঙ্গে কোচিং ক্লাসে যায় তারা। পড়াশোনা, গল্প, সিনেমা দেখা, বই পড়া সবই একসঙ্গে। বাড়ি ফিরেও কথা যেন আর ফুরোয় না। মেয়েদের এমন বন্ধুত্ব দেখে তাদের মায়েরা মজা করে বলতেন, একই বাড়িতে দু’জনের বিয়ে দিতে হবে। নাহলে মাইনের সব টাকা বুঝি ফোন বিলেই শেষ হয়ে যাবে! স্কুলের শেষেও দুই বন্ধু একই কলেজে ভর্তি হল। তবে বিষয় আলাদা। আর তারপর থেকেই ক্রমশ বদল হতে শুরু করল তাদের সম্পর্কের সমীকরণ। প্রাথমিক বদলটা অনন্যার তরফে হল। কেমন যেন আলগোছে বন্ধুত্ব বজায় রাখে সে তৃণার সঙ্গে। সময়ের অভাব বা অন্য কোনও অজুহাতে আড্ডার সময় ক্রমশই কমতে শুরু করে তাদের। প্রথম দিকে অদ্ভুত লাগলেও ক্রমশ দু’জনের মধ্যে এক তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি টের পেল তৃণা। মহুয়া আর অনন্যা একই বিষয় নিয়ে ভর্তি হয়েছে তৃণারই কলেজে। বিষয় এক বলেই বোধহয়, নাকি পরিণত মনের প্রভাব, মোটমাট অনন্যা আকৃষ্ট হতে শুরু করল মহুয়ার প্রতি। বন্ধুত্ব তাদের যতই গাঢ় হল, ততই দূরে সরে যেতে লাগল তৃণা। ক্রমশ তৃণা আর অনন্যার বন্ধুত্বটা ‘নেই’-এর পর্যায়ে চলে গেল।
প্রথম ক্ষেত্রে যে ঘটনার উল্লেখ রয়েছে তাতে বন্ধুত্ব ভাঙার কারণটা মানসিক পরিণতি। বড় হওয়ার সঙ্গেই আমাদের মন পরিণত হয়। শৈশবের শখ, আহ্লাদ বদলে যায়। সেই মতোই ভালোলাগাগুলোও পাল্টাতে থাকে। তখন হয়তো মনে হয় ছোটবেলায় যে বন্ধুটিকে প্রাণের সব কথা দ্বিধাহীনভাবে বলা যেত, যার সঙ্গে মনের সবচেয়ে বেশি মিল খুঁজে পাওয়া যেত, বড় হয়ে আর তা হচ্ছে না। তার মনের প্রতিটি ভাঁজের সঙ্গে হয়তো বা আমার পরিণত মনের পরতগুলো মিলছে না। ফলে বন্ধুত্বের সম্পর্কটা আলগা হয়ে আসছে। এই যে মানসিক পরিবর্তন, পরিণতমনস্ক হওয়া এটা যে সবার একই সময় আসে, এমন নয়। কারও আগে আসে, কারও পরে। আর সেই কারণেই একটা বিভেদের সৃষ্টি হয়। তাছাড়া পরিণত হওয়ার পর একই জিনিস যে দু’জনের সমানভাবে ভালো লাগবে বা সেটি তাদের একইরকম আকর্ষণ করবে তাও নয়। এই ছোটখাট ব্যাপারগুলোই বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
ঘটনা ২
কলেজের প্রথম দিন থেকেই অর্ণব, মেহুল আর শ্রাবণী একেবারে অভিন্নহৃদয় বন্ধু। অধ্যাপকদের কাছে তাদের পরিচিতি ‘থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’ নামে। ক্লাসের সকলেই জানে এই তিনজনকে কোনওভাবেই আলাদা করা সম্ভব নয়। অথচ কলেজের শেষের দিকে সেই বন্ধুত্ব পাল্টে গেল। মেহুলের সঙ্গে অর্কর ভাবটা জমে উঠতে লাগল ক্রমশ। মেহুল আর অর্ক অনেকগুলো শখ শেয়ার করে। একইরকম তাদের পছন্দগুলো। সেই থেকেই অর্কর সঙ্গে মেহুলের বন্ধুত্ব গাঢ় হতে শুরু করে। প্রথম দিকে মেহুল অর্ককে নিজেদের দলে টানার চেষ্টাই করেছিল। কয়েকবার একসঙ্গে চারজনের জমায়েত হল, আড্ডা, খাওয়াদাওয়া মতের আদানপ্রদান সবই হল। কিন্তু নাহ্, অর্ক এই থ্রি মাস্কেটিয়ার্স-এর দলের সঙ্গে তেমন মিলে যেতে পারল না। আপত্তিটা প্রথম জানায় শ্রাবণী। সমস্বরে তার সঙ্গে গলা মেলাল অর্ণবও। ব্যস, দল ভেঙে চৌচির। মেহুলকে এড়িয়ে চলছিল দলের বাকি দু’জন তারপর মেহুলও আর বিশেষ তাগিদ দেখাল না ওদের সঙ্গে মেলামেশায়। থ্রি মাস্কেটিয়ার্স ভেঙে গেল। অর্ণব আর শ্রাবণীর যোগাযোগটা রয়েছে। তবে তেমন ঘনিষ্ঠতা আর দু’জনের কারও তরফেই নেই।
বন্ধুত্বের এ আবার ভিন্ন একটি ক্ষেত্র, জানালেন রীমা। তাঁর কথায়, অনেক সময় উপর উপর একটা মানসিক ভাব থাকে আমাদের। কিন্তু ভেতরে হয়তো আরও বড় কিছুর প্রতি আকর্ষণ জন্মাতে থাকে যা সবসময় আমরা নিজেরাও টের পাই না। এই বিশেষ চাহিদাগুলো কোনও না কোনও সময় ঠিকই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আর তখনই একটা ভিন্ন আকর্ষণের খোঁজ করে মন। সেই আকর্ষণে যদি কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়, যার মনেও একইরকম একটা ইচ্ছে বা বাসনা রয়েছে তাহলেই তার প্রতি আলাদা টান আমরা অনুভব করি। তখন আগের টান, বন্ধুত্ব সবই তুচ্ছ করে এই নতুন তৈরি টানের দিকে ছুটে যেতে চায় মন। মেহুল আর অর্কর ক্ষেত্রেও এমনটাই হয়েছিল। দু’জনেরই তিরন্দাজি খেলার প্রতি ভীষণ আকর্ষণ। খেলাটার প্রতি লোকের আগ্রহ কম। আলাদা করে এই নিয়ে আলোচনার তেমন সুযোগ মেহুল পায়নি কোনওদিন। সে নিয়ে খুব যে একটা মাথাব্যথা ছিল তার তাও নয়। কিন্তু নিজের এই বিরল আগ্রহে আর একজন সঙ্গী জুটে যেতে, তার প্রতি আগ্রহ জন্মাতে দেরি হয়নি মেহুলের, অর্কর ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একইরকম। এই বিষয়ে যেহেতু বাকি দু’জন আগ্রহী ছিল না, তাদের অর্কর উপস্থিতিটা বন্ধুত্বে সংশয়ের মতো লাগল। বন্ধুত্বের পরিধি বাড়িয়ে নিয়ে আর একজনকে আহ্বান জানাতে তারা পেরে উঠল না বলেই তাদের এই বন্ধুত্ব ভেঙে গেল।
ঘটনা ৩:
জিনিয়া আর মোহনার খুব ভাব ছিল ছোটবেলায়। কিন্তু স্কুলের পর কলেজে ভর্তি হতেই ক্রমশ সম্পর্কটা থমকে গেল। বন্ধুত্বের টান কমার সঙ্গে সঙ্গেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হল। এবং একটা সময় এমন হল যে একে অপরের সঙ্গে দিনের পর দিন তো বটেই, বছরের পর বছর আর কথা হয় না। আর এই যে কথা হচ্ছে না, তার কোনও অভাবও অনুভূত হচ্ছে না দু’জনের একজনেরও মনে। অনেকেই বলেছিল বন্ধুত্বে তেমন প্রগাঢ়ভাব নিশ্চয়ই ছিল না কোনও কালেই, সেই কারণেই এত অনায়াসে তা ভেঙে গেল। আর ভেঙে যাওয়ার দুঃখটাও তেমন একটা নজরে পড়ল না কারও। এর বেশ কয়েক দশক বাদে হঠাৎই একটা জমায়েতে দেখা হয়ে গেল দুই বন্ধুর। ব্যস, বন্ধুত্বের সুতো এমনভাবে জোড়া লাগল যেন কোনওদিন ছেঁড়েইনি। ফোন নম্বর বিনিময়, অনিয়মিত মেসেজ আদান প্রদান দিয়ে শুরু হয়েছিল যে ফেরতা বন্ধুত্ব তা-ই রোজকার যোগাযোগে এসে ঠেকল কয়েক মাসের মধ্যেই। এমন অনেক কথা যা জমানো ছিল, অন্য কাউকে বলা হয়ে ওঠেনি সেগুলোই অনর্গল বলতে শুরু করল একে অপরকে। পরিণত বন্ধুত্ব যেন অন্য ধরনের এক ভরসার জায়গা হয়ে উঠল দু’জনের কাছেই।
রীমা মুখোপাধ্যায়ের মতে, অল্পবয়সের অপরিণত মন অনেক জিনিস বুঝে উঠতে পারে না, যা পরিণত মন সহজেই বুঝে যায়। ফলে এই ক্ষেত্রে বন্ধুত্বের সমীকরণগুলোও বদল হতে থাকে। আসলে পরিণত মন অনেক বেশি গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখে। তার কাছে বর্জন আর গ্রহণের মাত্রাগুলো আলাদাভাবে ধরা পড়ে ফলে সেই অনুযায়ী সে বন্ধুত্ব বাছাই করতে চেষ্টা করে। যেমন, একটা বয়সে হয়তো কারও ব্যবহারে নিজেকে তার খুবই কাছের মনে হয়েছিল, পরে একটু বয়স বাড়লে সেই কাছাকাছি ভাবটা কেটে যায় আবার তারও পরে যখন বয়স আরও খানিকটা বেড়ে যায় তখন আগে যাকে দূরে সরিয়েছিল মন, তাকেই আবারও কাছে পেতে ইচ্ছে করে। বা হঠাৎ তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে সেটাকেই আঁকড়ে ধরতে মন চায়। এইভাবেই বন্ধু চয়ন বারবার বদলায়। লোক পাল্টায়, পরিধি ভিন্ন হয়ে যায়। আর এগুলো সবই হয় মনের বেড়ে ওঠা, গ্রহণ ও বর্জনের মাত্রা কখন কেমন তার উপর নির্ভর করে।
তবে এখানে একটা কথা পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। যখন কাউকে একবার বন্ধুত্বের স্থানে বসানো হয়, তখন তার একটা মূল্য কিন্তু একে অপরের কাছে সারা জীবনই থেকে যায়। পরে সম্পর্কে দূরত্ব এলেও, বন্ধুত্ব চিড় খেলেও মর্যাদাটা অটুট থাকে। ফলে পরে সেই মর্যাদার হাত ধরেই হয়তো আবারও বন্ধুত্ব জোড়া লেগে যায়। এটা যেমন এক ধরনের ব্যাখ্যা, তেমন আর একটি ব্যাখ্যাও হয়, বয়সের সঙ্গে মন যত পরিণত হয়, ততই তার মধ্যে একটা বদল দেখা যায়। সেই বদলের হাত ধরেই কখনও কোনও সম্পর্ক গাঢ় হয়, কখনও তা ভেঙে যায় আবার কখনও বা পুনরায় জোড়া লাগে।
অনেক সময় তৃতীয় ব্যক্তির সক্রিয় অবদান থাকে বন্ধুত্ব ভাঙার পিছনে, কখনও বা তার উপস্থিতির কারণেই বন্ধুত্ব কমে যায়। সম্পর্কে দূরত্ব আসে। কিন্তু তার পরেও দু’জন বা তিনজন বন্ধুর মানসিক পরিস্থিতি কখন কেমন থাকে সেটা ভেবে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেই পরিস্থিতির উপরেই বন্ধুত্বের ওঠাপড়া, অদলবদল নির্ভর করে। অনেক সময় মানসিক পরিণতিগত বদলও বন্ধুত্বের উপর প্রভাব ফেলে। ধরুন, অল্প বয়সে একজনকে ভীষণ ভালো লাগল, একটু বড় হলে তার সঙ্গে মনের মিলমিশ হল না, বন্ধুত্ব চিড় খেল। তারপর একেবারে বয়স্ক হলে আবার মনে হল সবকিছু হয়তো মেলে না, কিন্তু এমনও অনেক কিছু আছে যা শুধু ওই বন্ধুকেই বলা যায়। আসলে আমাদের মন খুব জটিল একটা জায়গা। তার ভালোলাগা, মন্দলাগা, মন খারাপ হওয়া সবই বিভিন্ন পরিস্থিতি ও মানসিকতা নির্ভর। ফলে এগুলো একে একে মিলে গেলে তবেই একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
সবশেষে একটা জিনিস মাথায় রাখা খুবই জরুরি। বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে মা-বাবার বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। বিশেষত স্কুল জীবনের ক্ষেত্রে। বাবা-মা যদি বাধা দেন তাহলে সেটা শুনুন। আমাদের অপরিণত মনে অনেক কিছুই এড়িয়ে যেতে চায় যা বাবা মায়ের বয়স্ক চোখে ধরা পড়ে। ফলে কোনও বন্ধুত্বে যদি বাবা মায়ের আপত্তি থাকে তাহলে সেই সম্পর্কের দিকে না যাওয়াই ভালো। একটি ভালো বন্ধু যেমন জীবনে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারে, আপনাকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, খারাপ বন্ধু তেমনই বিপথে চালনা করতে পারে। ফলে বাবা মা কী বলছে, সেটা বন্ধুত্ব গড়া বা ভাঙার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ।