


উদিত নারায়ণ: ভারতীয় সিনেমার একটা ইতিহাস শেষ হয়ে গেল। আশাদিদি চলে গেলেন। ভারতীয় সংগীতের মহারানি চলে গেলেন...। ‘আশাজি’ বলে খুব কম সময়ই সম্বোধন করেছি। দিদি বলতাম। দিলখোলা মানুষ ছিলেন। সবসময় হাসি, ঠাট্টা, মজার মধ্যে থাকতেন। সেই মানুষটাই মাইকের সামনে গেলে সম্পূর্ণ বদলে যেতেন। তখন যেন বাঘিনী। অন্য মেজাজ তৈরি হতো ওঁর। একবার আমাকে বললেন, ‘উদিত তুমি খুব ভালো কাজ করছ। তোমার কণ্ঠ সুন্দর।’ লজ্জা পেলাম, ‘আমি তো আপনার থেকে অনেক ছোটো।’ জবাব দিলেন, ‘সংগীতজগতে ছোটো, বড়ো কিছু না। সবাই শিল্পী। তুমি নিজের স্টাইলে গাইছো। সেটা ছেড়ো না।’ যতবারই কথা বলেছি, ততবার এই আত্মীয়তার বন্ধনটা ছিল। জুনিয়রদের সবসময় উৎসাহ দিতেন। দিলখোলা মানুষ ছিলেন তো। তাই যে কোনো জায়গা জমিয়ে রাখতেন। প্রতিবছর জন্মদিনে আশাজিকে শুভেচ্ছা জানাতাম। শিশুর মতো খুশি হতেন। আর কোনো বছর ভুলে গেলে পরে যখন দেখা হতো, তখন অভিমান করতেন।
আরও একদিনের কথা মনে পড়ছে। আমি তখন স্ট্রাগলার। হোলির দিন আশাজির বাড়ি গেলাম। বললাম, ‘আজ হোলি খেলব আপনার সঙ্গে।’ মিষ্টি হেসে বললেন, ‘না, কাল রেকর্ডিং রয়েছে’, বলে একটা টিকা লাগিয়ে নিলেন কপালে। খাবারের প্রতি অদ্ভুত টান ছিল। সব ধরনের খাবার ট্রাই করতে বলতেন। ওঁর হাতের রান্নাও ছিল অপূর্ব। খুব খেতে ভালোবাসতেন। খাওয়াতেও। কোন দোকানের কী খাবার খাওয়া যায়, সেটার পরামর্শ দিতেন। শুধু মুম্বই নয়, কলকাতায় গেলে কোন দোকানের কচুরি, কোন দোকানের মিষ্টি ভালো, সেটাও বলে দিতেন। লতাজির সঙ্গে অনেক স্টেজ পারফরম্যান্স করেছি। তবে একটা আক্ষেপ রয়ে গেল। আশাদিদির সঙ্গে কখনো স্টেজ শেয়ার করা হল না...।
আটের দশকে আশাজির সঙ্গে আমার প্রথম প্লেব্যাক। ‘গেহরা জখম’ ছবির ‘চাল মে মাল লেকে আয়া হ্যায়’। পঞ্চমদার সুর। আশাজি আর রফি সাহাব ছিলেন মূল শিল্পী। আমিও ছিলাম সেখানে। সেখানে ওঁদের থেকে যে শিক্ষা পেয়েছিলাম, কখনো ভুলব না। তারপর এ আর রহমানের সুরে ‘লাগান’ ছবির ‘রাধা ক্যায়সে না জ্বলে’ গাইলাম আশাজির সঙ্গে। একটার পর একটা ঘটনা, আর গান...। হইহই করে আড্ডা দিতেন। সেসব স্মৃতি হয়ে গেল।
১৯৯৭ সালে আমার জন্মদিন পালন করেছিলাম। উনি এসেছিলেন। প্রায় দু’ঘণ্টা ছিলেন। সেখানেও মাতিয়ে রেখেছিলেন। গান, গল্প, খাওয়াদাওয়া— ওঁকে ঘিরেই আমরা ব্যস্ত ছিলাম। শেষবার কথা হয়েছিল ছ’মাস আগে। কেমন আছেন, খবর নিয়েছিলাম। উনিও আমাদের খবর নিতেন। সকলের সঙ্গে অনায়াসে মিশে যেতেন। হাসি, ঠাট্টা করতে পারতেন। আর শেষ দেখা হয়েছিল দু’বছর আগে একটি অ্যাওয়ার্ড ফাংশনে।
আজ একটা সত্যি কথা বলি। আমি মনে করি, শিল্পী হিসাবে আশা ভোঁসলেকে কেউ ছুঁতে পারবেন না। কিন্তু যেভাবে বাঘিনীর মতো দাপটে বাঁচতেন, সেই স্পিরিটকে প্রণাম জানাই।