


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ‘কলেজের একটাই গ্রুপ, সেটাতেই সবাই থাকবে। এটাই সেই গ্রুপ। একজনই থাকবে তার মাথায়। ১০ জায়গায় যদিও কেউ গ্রুপ বানানোর চেষ্টা করে, তাহলে তাদের আইডেন্টিফাই (চিহ্নিত) করে রাখব.....’ল’ কলেজের অফিসিয়াল হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপে এমনই একটি অডিও ক্লিপ আসে গণধর্ষণকাণ্ডের দিনকয়েক আগে। পড়ুয়াদের দাবি, গলাটি আর কারও না, কলেজের ত্রাস মনোজিৎ মিশ্রর। গলার স্বর শুনলেই বোঝা যায় এই অডিও কোনও বার্তা নয়, পড়ুয়াদের উদ্দেশে স্রেফ হুমকি। লালবাজার সূত্রের খবর, গোয়েন্দা বিভাগের হাতে ইতিমধ্যেই সেই অডিও ক্লিপ হাতে এসেছে। কেন এই হুমকিবার্তা? পড়ুয়ারা কি লাগাতার ম্যাঙ্গো-ত্রাসে রীতিমত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন? সবটাই খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। এই আবর্তেই বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌমেন সেন এবং বিচারপতি স্মিতা দাসের ডিভিশন বেঞ্চ কসবা কাণ্ডের তদন্ত রিপোর্ট এবং কেস ডায়েরি জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে রাজ্যকে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আইন কলেজকে হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছে আদালত। এ মামলার তদন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে হলেও, তার অগ্রগতি সংক্রান্ত রিপোর্ট তলবও করেছে ডিভিশন বেঞ্চ। একইসঙ্গে বেঞ্চের নির্দেশ, নির্যাতিতা ছাত্রী এবং তাঁর পরিবারের কোনও সদস্যের কোনও ছবি-ভিডিও সরাসরি সম্প্রচার না করার।
কসবা গণধর্ষণকাণ্ডের তদন্তে নেমে ধৃত মনোজিত সম্পর্কে একাধিক তথ্য পেয়েছে স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম। তাতেই স্পষ্ট হয়েছে, প্রভাবশালী-তত্ত্ব। একাধিক নেতানেত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ। ধর্ষণের পর বাঁচার জন্য প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎও করেছিল মনোজিৎ। কলেজের পড়ুয়াদের দাবি, এই ক্ষমতার জন্যই কলেজ থেকে পাস করে গেলেও, তার প্রভাব কমেনি। সেই প্রভাবের জোরেই সাউথ ক্যালকাটা ল’ কলেজে চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে যুক্ত হয় সে। মূলত ইউনিয়নে মনোজিতের আধিপত্য কায়েম রাখার রাস্তা করে দিয়েছিল এই নিয়োগ। কলেজের অস্থায়ী কর্মী হলেও, পরোক্ষভাবে ইউনিয়নের মাথাই ছিল ম্যাঙ্গো। পড়ুয়াদের রীতিমত ভয়ে রাখতে অভিযুক্ত। প্রমাণ সেই অডিও ক্লিপ। এমনটাই মনে করছেন গোয়েন্দারা। সূত্রের দাবি, ধৃতের ফোন থেকে দেখা গিয়েছে, কলেজ সংক্রান্ত সমস্ত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের ‘অ্যাডমিন’ ছিল মনোজিৎ।
এমনই একটি গ্রুপ হল ‘অফিসিয়াল এসসিএলসি ব্যাচ’। সেই গ্রুপেই এসেছে হুমকিবার্তা। তাতে ম্যাঙ্গো জানায়, ‘আনুষাঙ্গিক অনেক গ্রুপ আপনারা দেখতে পাবেন। কোন ইয়ার আপনাদের কীভাবে ব্যবহার করতে চাইছে, সেটা বুঝতে শিখুন। কে কীভাবে মিসগাইড করছে সেটা বুঝুন। আপনাদের কখনও দরকার পড়লে যাকে পাবেন, তার সঙ্গেই থাকবেন।’ গোয়েন্দাদের বিশ্লেষণ, অডিও ক্লিপে ‘দরকার পড়লে যাকে পাবেন’ বলতে নিজেকেই বুঝিয়েছে মনোজিৎ। সেই অডিও ক্লিপেই অন্য গ্রুপে যোগ দেওয়া পড়ুয়াদের চিহ্নিত করে রাখা হবে বলে জানায় গণধর্ষণকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত। কতটা ক্ষমতা থাকলে কলেজ পড়ুয়াদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রপে এধরনের হুমকিবার্তা দিতে পারে এক চুক্তিভিত্তিক কর্মী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পড়ুয়া বলেন, ‘আমরা ‘দাদা’র ভয়ে ছিলাম। ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলাম চারজন বন্ধু। সেই কথা মনোজিৎ অ্যান্ড কোং এর কানে যেতেই বেধড়ক মারধর করা হয় আমাদের। দু’জন গুরুতর জখম হন’। একথা জানানোর সঙ্গেই পড়ুয়ার করুণ আর্তি— ‘আমার নাম প্রকাশ্যে আসবে না তো?’ ম্যাঙ্গোর ত্রাসের পরিধি ঠিক কতটা, সেটাই যেন ফুটে উঠছিল পড়ুয়ার আর্জিতে।