


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: আইপিএস অফিসারের শাশুড়ি নাকি সিভিক ভলান্টিয়ার? নাঃ, আইপিএস অফিসার নিজে তেমন কিছু জানেন না। আর তাঁর শাশুড়ি তো নয়ই! কিন্তু কাগজে-কলমে সেটাই সম্ভব হয়েছে। মেডিক্লেম পলিসিতে। হাসপাতালে ওই নামে ভুয়ো রোগী দেখানো হয়েছে, তার চিকিৎসা হয়েছে এবং সেই খরচ ক্লেম করে তুলেও নেওয়া হয়েছে। বিষয়টা সামনে আসতেই চোখ কপালে উঠেছে পুলিসকর্তাদের। খোঁজখবর করতে গিয়ে তাঁর দেখেছেন, এটা তো একটা উদাহরণ মাত্র! ভূতুড়ে ক্লেমের চোটে অনিয়ম আকাশ ছুঁয়েছে। সহায়ক পুলিস কর্মীদের (সিভিক ভলান্টিয়ার, হোমগার্ড) জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে স্বাস্থ্যবিমা শুরু করেছিলেন, তাকেই ‘আমদানি’র নিশ্চিত মাধ্যম বানিয়ে ফেলেছে একটা চক্র। এভাবে তুলে নেওয়া হয়েছে অন্তত ৪৪ লক্ষ টাকা! অন্দরের লোক তো বটেই, হাসপাতাল এবং থার্ড পার্টি সংস্থাও (টিপিএ) এই ভূতুড়ে কারবারে জড়িত।
নবান্ন সূত্রে খবর, কিছুদিন ধরে সহায়ক পুলিস কর্মীদের একাংশ হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চরম বিপাকে পড়ছেন। চিকিৎসার পর তাঁরা আবিষ্কার করেছেন, মেডিক্লেম পলিসি থেকে তাঁদের যা প্রাপ্তি, তার সবটাই নাকি খরচ হয়ে গিয়েছে। এমনকী বাফারটুকুও অবশিষ্ট নেই। বাধ্য হয়ে গাঁটের কড়ি খরচ করেই হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেতে হয়েছে তাঁদের। তারপর খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, তাঁদের ‘ডিপেন্ডেন্ট’ পরিবারের সদস্য দেখিয়ে অন্য রোগীর জন্য সেই টাকা ক্লেম বাবদ তুলে নেওয়া হয়েছে। রাজ্য পুলিস কর্তাদের কাছে এ নিয়ে অভিযোগের পাহাড় জমতে থাকে। তারপরই আসরে নামে সিআইডি। গত এক বছরে সিভিক বা হোমগার্ডদের কারা কারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং স্বাস্থ্যবিমার টাকা তুলেছেন, তার পূর্ণাঙ্গ নথি জোগাড় হয়। তথ্য এবং অডিট রিপোর্ট নেওয়া হয় ইনস্যুরেন্স কোম্পানির থেকে। দু’বছর আগে এই সংস্থা মেডিক্লেমের দায়িত্বে এসেছে। সহায়ক পুলিসরা বছরে ৪,৫০০ টাকা প্রিমিয়াম বাবদ দিয়ে থাকেন। সিভিক, ভিলেজ পুলিস, হোমগার্ড—সকলের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক তথ্যই সংস্থার কাছে রয়েছে। তাহলে এই ‘ভুল’ হল কীভাবে?
সূত্রের খবর, অডিট রিপোর্ট ঘেঁটে নজরে আসে কেলেঙ্কারি। সেখানেই এই ‘শাশুড়ি কাহিনি’ জানা যায়। আবার আর এক ‘শাশুড়ি’কে ‘নির্ভরশীল’ দেখিয়ে মোটা অঙ্কের লেনদেন হয়ে গিয়েছে বলে জেনেছেন অফিসাররা। অথচ, তিনি জামাইয়ের ‘ডিপেন্ডেন্ট’ মোটেই নন। এক যুবতী সিভিক ভলান্টিয়ার নন, যদিও তাঁর নাম সহায়ক পুলিস কর্মীদের পলিসিতে নথিভুক্ত আছে। এমন পাঁচ সহায়ক পুলিসের খোঁজ সিআইডি পেয়েছে, যাঁরা কখনও হাসপাতালে ভর্তিই হননি! অথচ, তাঁদের ভুয়ো অ্যাডমিশন দেখিয়ে টাকা তোলা হয়েছে। ‘ডিপেন্ডেন্ট’দের নকল নথি তৈরি করে পুরো কেলেঙ্কারিকে রূপ দিয়েছে চক্রটি। অন্য ফোন নম্বরে ভুয়ো মেডিক্লেম কার্ড তৈরি করেছে। তারপর হাসপাতালে হাজির হয়েছে ‘থার্ড পার্টি’। ক্লেম চূড়ান্ত হওয়ার পর সইও করেছে সহায়ক পুলিস কর্মীর নামে। এমনকী, এক পুলিসকর্তার সই ও স্ট্যাম্প জাল করে দেখানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সহায়ককে বাফার দেওয়া হল। ইতিমধ্যে ওই টিপিএ অফিসে হানা দিয়ে প্রচুর ভুয়ো নথি উদ্ধার করেছে সিআইডি। অন্দরমহলের কারা এই চক্রে জড়িত, এবার তার খোঁজ চলছে।