


বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: বাজার বাড়াতে একগুচ্ছ পণ্যের উপর থেকে কামানো হয়েছে জিএসটির বোঝা। শ্রম কোড চালু করে দেশে শিল্প পরিস্থিতি আরও উজ্জ্বল করা হয়েছে। ব্যবসায় মূলধন জোটাতে ঋণের থলি নিয়ে প্রায় রাস্তায় নেমে এসেছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। সুদের বোঝা লাঘবে নানা নীতি ও ভরতুকি প্রকল্প আনা হয়েছে। লাগাম পরানো গিয়েছে মূল্যবৃদ্ধিতে। ছোটো শিল্পের পাশে দাঁড়াতে এমন বহু পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে দাবি করে আসছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। এই পরিস্থিতিতে দেশে এমএসএমই-এর বাস্তব ছবিটা কেমন? চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের তৃতীয় ত্রৈমাসিক, অর্থাৎ গত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালের একটি সমীক্ষা রিপোর্ট পেশ করেছে কেন্দ্রীয় সংস্থা সিডবি। সেখানে ধরা পড়েছে, দেশের ক্ষুদ্র, ছোটো ও মাঝারি শিল্পের অবস্থা আদৌ খুব একটা উজ্জ্বল নয়। চলতি অর্থবর্ষে ছোটো শিল্পের সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি গিয়েছে উৎসবমুখর ওই তিন মাসেই। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এদেশে বাণিজ্যে লক্ষ্মীলাভের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় এই তিনটি মাসই।
কী উঠে এসেছে সমীক্ষায়? ব্যবসার হাল জানতে একাধিক সূচকের সাহায্য নেয় সিডবি। তারই অন্যতম ‘বিজনেস কনফিডেন্স ইনডেক্স’ বা ব্যবসায় ভরসা সংক্রান্ত সূচক। দেখা যাচ্ছে, তৃতীয় ত্রৈমাসিকে এই সূচক ছিল ৬০.৮। তার আগের তিন মাসে তা ছিল ৬১.৬। অর্থবর্ষের প্রথম তিন মাস, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সেই সূচক ছিল ৬৩.৮। অর্থাৎ ব্যবসায় ভরসার জায়গা ক্রমশ কমেছে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত। ট্রেডিং বা কেনাবেচা বৃদ্ধি সংক্রান্ত যে সূচক ব্যবহার করা হয়েছে সমীক্ষায়, সেখানে গত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তা ছিল ৫৭.৪। দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে ৫৮.১ এবং প্রথম তিন মাসে ছিল সর্বোচ্চ, ৬৫.৪। পর্যটন, রেস্তরাঁর মতো পরিষেবা শিল্পেও এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পরপর তিনটি ত্রৈমাসিকে তা ছিল যথাক্রমে ৬২.১, ৬২.৫, ৬০.৪। অর্থাৎ সূচক ধাক্কা খেয়েছে এখানেও।
সীমক্ষাটিতে ৫৮ শতাংশ সংস্থা জানিয়েছে, আগামী এক বছর পর ব্যবসা বা বিক্রিবাটা বাড়তে পারে। অর্থাৎ ৪২ শতাংশের মতামত, বিক্রি বাড়বে না। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য টাকা কি ঠিকমতো পাওয়া যাবে? উৎপাদন শিল্পের মাত্র ৪৬ শতাংশ মনে করছে, ঋণ মিলবে ঠিকমতো। পরিষেবা শিল্পে সেই হার ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি সংস্থা মূলধন জোটানো নিয়ে সন্দিহান। ব্যবসার মূল অক্সিজেন মুনাফা। সমীক্ষায় সিংহভাগ ট্রেডিং এবং পরিষেবা শিল্প স্পষ্ট জানিয়েছে, লাভের অঙ্ক আগামী দিনে কমে যাবে বলে মনে করছে তারা।
কেন্দ্রীয় সরকার যে শ্রম কোড নিয়ে প্রচারে মেতেছে, তা নিয়ে কতটা আশাবাদী ছোটো শিল্পমহল? সমীক্ষায় ৩৫ শতাংশ সংস্থা জানিয়েছে, এই কোড চালু করায় ব্যবসার খরচ বেড়ে যাবে। ১৮ শতাংশের দাবি, নতুন যে বিধিগুলি আনা হয়েছে, তাতে স্বচ্ছতার অভাব আছে। ১২ শতাংশের মতামত, নয়া শ্রম কোড চালু করার বিষয়ে প্রযুক্তিগত ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। ১৯ শতাংশ সংস্থার দাবি, এই বিধি চালুর ক্ষেত্রে নতুন করে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে এবং কোড নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে প্রচারে জোর দিতে হবে। ১১ শতাংশ সংস্থার মতামত, এই কোড কর্মীদের বেতনের উপর প্রভাব ফেলবে। পিএফ, গ্র্যাচুইটির মতো সামাজিক সুরক্ষাতেও প্রভাব ফেলবে নয়া আইন। মোট কথা, নরেন্দ্র মোদি সরকারের দাবি এবং বাস্তবের মধ্যে যে ফারাক বিস্তর, তা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে সিডবি’র সমীক্ষায়।