


গণেশ মজুমদার, কালনা: স্বাধীনতা সংগ্রামে কালনার বিপ্লবীদের উজ্জীবিত করতে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু থেকে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সহ একাধিক মনীষী ও বিপ্লবীদের পদধুলি পড়েছিল কালনা শহরের মহিষমর্দিনীতলার আটচালায়। নেতাজি কালনায় দু’বার এসেছিলেন। প্রথমবার কালনা মহিষমর্দ্দিনীতলায় আটচালা ও দ্বিতীয়বার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের গোপন ডেরা জ্ঞানানন্দ মঠে। আজও শতাব্দি প্রাচীন মহিষমর্দিনীতলার সেই টিন ও কাঠের তৈরি সাবেকিআনার আটচালা অতীতের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
কালনা শহরে আড়াইশো বছর আগে ব্যবসায়ীদের হাত ধরেই প্রাচীন মহিষমর্দিনী মায়ের পুজো শুরু। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে ১৮৯৭ সালে মায়ের মন্দিরের সামনে নির্মিত হয় টিনের ছাউনি দেওয়া বৃহৎ এক আটচালা। পুজোর দিনগুলিতে এই আটচালার প্রশস্থ জায়গায় যাত্রা মঞ্চ সহ মায়ের প্রসাদ বিলির জায়গা হিসাবে ব্যবহৃত হয়। বিংশ শতাব্দির শুরুর দিকে যখন স্বাধীনতা আন্দোলনে উত্তাল গোটা দেশ, তখন তার ঢেউ আছড়ে পড়েছিল কালনা শহর ও শহরতলি এলাকায়। কালনার বিপ্লবীরা বিভিন্ন ভাবে ইংরেজদের নাস্তানাবুদ করছিলেন। ইংরেজ পুলিশের হাতে ধরাও পড়েন অনেক বিপ্লবী। কালনা জ্ঞানানন্দ মঠে আধ্যাত্বিকতা ও ঠাকুরের নাম গান হলেও বিস্তীর্ণ জঙ্গলময় মঠে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে গোপনভাবে চলত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের লাঠি খেলা, শরীর চর্চা সহ তৈরি হতো বিপ্লবীদের আন্দোলনের রূপরেখা। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু এখানে এসেছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উজ্জীবিত করেছেন। মঠে আজও নেতাজির ব্যবহৃত চেয়ার সহ আসবাবপত্র সংরক্ষিত রয়েছে।
অন্যদিকে, ১৯৩৫ সালে কালনার স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা চিকিৎসক বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় কালনার বিপ্লবীদের একত্রিত করে আন্দোলন সংগঠিত করেন। সেই বছরই তাঁর ডাকে সারা দিয়ে কালনায় আসেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু। শহরের মহিষমর্দিনীতলার আটচালায় সভা হয়। নেতাজির জ্বালাময়ী বক্তৃতা শুনতে ও তাঁকে এক ঝলক দেখতে দূরদূরান্ত থেকে গরুর গাড়িতে মানুষ হাজির হয়েছিলেন সেদিন। এই জায়গা থেকে নেতাজি স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য অর্থ সংগ্রহের ডাক দিলে পুরুষদের সঙ্গে মহিলারাও এগিয়ে এসে নিজেদের হাতের, কানের সোনার গয়না খুলে দিয়ে দিয়েছিলেন। শুধু নেতাজিই নন, এই আটচালায় রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যুবসমাজ থেকে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে সভা করেছিলেন। স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে বহু সভা সমিতির সাক্ষ্যবহন করে চলেছে মহিষমর্দিনীতলার এই আটচালা।
কালনার ইতিহাস গবেষক সুমাল্য দাসের কথায়, ভাগীরথী নদীর জলপথকেন্দ্রীক বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল মহিষমর্দিনীতলা। নদীপথে বাণিজ্যের নৌকা নোঙর করা হত এখানে। মহিষমর্দিনী মন্দিরের সামনে বিস্তীর্ণ আটচালা মায়ের পুজোর ক’দিন ব্যবহৃত হলেও বাকি সময় গুলিতে নানা অনুষ্ঠানের সভাস্থল হিসাবে কাজে লাগত এই মঞ্চ। আজও আটচালার সাবেকিআনাকে সংস্কারের মধ্যে দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে পুজো কমিটি। পুজো কমিটির সম্পাদক রাজা কুণ্ডু বলেন, প্রাচীন মহিষমর্দিনী মায়ের মন্দিরের সামনে শতাব্দিপ্রাচীন টিন, কাঠের তৈরি আটচালাকে শুধুমাত্র সংস্কারের মধ্যে দিয়েই টিকিয়ে রেখেছি। যা আমাদের কাছে হেরিটেজ।