


১৪ বছর পর বাংলা ছবিতে ফিরছেন শর্মিলা ঠাকুর। সঙ্গী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। সুমন ঘোষের পরিচালনায় ‘পুরাতন’-এর গল্প শোনালেন ঋতুপর্ণা।
পুরাতন শব্দটা শুনলে কী মনে পড়ে?
অনেক কিছু। আমি পুরাতনে খুব বিশ্বাসী। পুরনো সম্পর্ক, বই, পুরনো বন্ধুত্ব...। আমাদের সিঙ্গাপুরের বাড়িতে খুব পুরনো একটা চেয়ার ছিল। এবারে গিয়ে দেখলাম একটু কাত হয়ে গিয়েছে। অতটা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কিছুদিন আগে ওই চেয়ারটা রিপ্লেস করা হল। এত মনখারাপ হল! পুরনো সব কিছুর সঙ্গে বোধহয় আমাদের আবেগ জড়িয়ে থাকে। আমার ঠাকুরমা ডায়েরি লিখতেন। সেটা খুব যত্ন করে রেখে দিয়েছি।
মা, মেয়ের সম্পর্কের গল্প ‘পুরাতন’, আপনার মাকে আর দেখানো হল না...
ঈশ্বর হয়তো চাইলেন না। তাই নিয়ে নিলেন মাকে। কিন্তু মা ছবিটার সবটাই জেনে গিয়েছিল। যখন মা অচেতন ছিল, শর্মিলা ঠাকুর আমাকে বলতেন তুমি মায়ের সঙ্গে কথা বলবে। মা সবকিছু শুনতে পাচ্ছে। আমি যখন ক্লান্ত হয়ে অনেক রাতে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যেতাম, মা বলত, এত ক্লান্তি নিয়ে আসিস, দুটো কথাও বলতে পারি না। কিছু জিজ্ঞেসও করতে পারি না, রেগে যাস। এবারও বলেছিল, বড্ড পরিশ্রম করছিস, এবার একটু কম কর। এরকম তো বলতেনই। কিন্তু এই কথাটা যে মা আর কোনওদিন বলবে না, সেটা বুঝতে পারিনি। সেকারণে ছবিটা আরও স্পেশাল।
১৪ বছর পর বাংলা ছবিতে শর্মিলা ঠাকুরকে রাজি করালেন কীভাবে?
উনি আমাকে খুব ভালোবাসেন। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে আমরা কথা বলি। উনি আমাকে বলেছিলেন, জানো ঋতুপর্ণা আমার অনেকদিন বাংলায় ছবি করা হয়নি। ভালো চিত্রনাট্য পেলে বাংলায় ছবি করব। আমি ভেবেছিলাম, বাপ রে বাপ! শর্মিলা ঠাকুর আমাকে বলছেন, উনি বাংলা সিনেমা করতে চান! কয়েকদিন পরে পরিচালক সুমন ঘোষ আমার বাড়িতে এসেছিলেন অপর্ণা সেনের তথ্যচিত্র নিয়ে কথা বলতে। জানি না কেন মনে হয়েছিল, সুমনের সঙ্গে কাজটা হতে পারে। আমরা দিল্লিতে গিয়ে ওঁকে চিত্রনাট্য শুনিয়েছিলাম।
শর্মিলা ঠাকুরের কাছে কী শিখলেন?
এত কিছু শেখার আছে, আলাদা করে কী বলব জানি না! এই ছবিতে ওঁর জন্মদিন দেখানো হয়েছে। আমরা একটা বয়স নির্ধারণ করেছিলাম। উনি বলেছিলেন, না না। আমার যা বয়স তাই দেখাতে হবে। তখনই বুঝেছিলাম জীবন সম্বন্ধে কতটা স্বাভাবিক পরিধি ওঁর। ছবির কেমন ল্যান্ডস্কেপ হবে, কালার স্কিম কেমন হবে, সব কিছু নিয়েই আমরা আলোচনা করেছিলাম। ওঁর বাড়িতে আমাদের গলৌটি কাবাব খাইয়েছিলেন। ওঁর বয়সে কাজের প্রতি যা ডেডিকেশন, তা অভাবনীয়।
ওঁর নিজস্ব মতামত ছিল তাহলে?
অবশ্যই। শট দেওয়ার পর জিজ্ঞেস করতেন, এটা ভালো হল? বাক্যটা আমি ঠিক বললাম? প্রতিটা বিষয়ে ওঁর কৌতূহল আমাকে মুগ্ধ করেছে।
প্রযোজনা এবং অভিনয় একসঙ্গে ব্যালেন্স করলেন কীভাবে?
আমি প্রথম একজন অভিনেতা। পরে প্রযোজক। ‘পুরাতন’ হয়তো অনেক প্রযোজকই করতে রাজি হতেন। কিন্তু আমার মনে হল, আমারই প্রযোজনা করা উচিত। ফলে প্রযোজক সত্তাটা একটা পর্যায় পর্যন্ত কাজ করে। আমার শিল্পীদের সঙ্গে, প্রোডাকশনের সঙ্গে যাতে একটা সুন্দর সমঝোতা থাকে, আমি সেভাবে কাজ করি। আমি সত্যিই অত বড় প্রযোজক নই। ক্রিয়েশনের ভিতরে যতটা প্রোডাকশন করতে পারি, সেটাই করতে চাই।
প্রযোজক হিসেবে সিনেমা হল পাওয়া নিয়ে সমস্যায় পড়েছেন?
অল্প বিস্তর সমস্যা সকলকেই সামলাতে হয়। এটার একটা ডায়নামিক্স আছে। অনেক ছবি যখন একসঙ্গে মুক্তি পায়, সেসময় সিনেমা হল ভাগাভাগি করতে অসুবিধে হয়। এখন সিনেমা হলের সংখ্যাও কমে গিয়েছে। ফলে ডিস্ট্রিবিউশনও বেছে করতে হয়। তবে ভালো সিনেমা তৈরি করতে পারলে দর্শকের আকর্ষণ বাড়ে। কিছু সমস্যা থেকেই যায়। তার সমাধান তৈরির চেষ্টাও করছি।
‘পুরাতন’ কি আন্তর্জাতিক ছবি?
ঠিক বলেছেন। ‘পুরাতন’ শুধুমাত্র বাঙালিদের ছবি নয়, আন্তর্জাতিক ছবি। কারণ আজকের দিনে আমরা যেভাবে সিনেমা দেখি, বুঝি, সেখানে সারা বিশ্বের সিনেমা এক জায়গায়। পরবর্তীকালে এই ছবিটা অন্য ভাষায় ডাবিং করারও ইচ্ছে আছে।
শ্যুটিংয়ের কোনও মুহূর্ত শেয়ার করবেন?
সবথেকে ভালো লাগত দুপুরের লাঞ্চ। শর্মিলা ঠাকুর মাছ খেতে খুব ভালোবাসেন। ওঁর কই মাছ খেতে ইচ্ছে করেছিল। আমার হঠাৎ বাবার কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। বাবাও কই মাছ খেতে ভালোবাসতেন।
স্বরলিপি ভট্টাচার্য