


স্বপন দাস, কাকদ্বীপ: রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলিতে তাঁর নাম সযত্নে লেখা। ব্লাড ব্যাঙ্কগুলিতে গিয়ে তাঁর নাম খোঁজ করলে অনায়াসেই মিলে যায়। মানুষটি সাধারণ। কিন্তু যে কাজটি মাঝেমধ্যেই করতে হয় তাঁকে, সেই কাজটি অসাধারণ।
পাথপ্রতিমার শিবগঞ্জে গিয়ে সুধীরকুমার মান্না নাম বললে যে কেউ এক ডাকে চিনে ফেলবেন। এতটাই নামডাক তাঁর। জনপ্রিয়তার কারণ, মরণাপন্ন কোনও মানুষের প্রয়োজন পড়লেই সুধীরবাবু ছুটে যান। রক্ত দেন। তিনি বিরলতম একটি গ্রুপের রক্ত বহন করছেন শরীরে। সেটির নাম ‘বোম্বে’ (OH+) গ্রুপ। লাখে একজনের দেহে এই গ্রুপের রক্ত থাকে। ফলে সুধীর মান্না লাখের মধ্যে এক। রক্তদান করতে একটি টাকাও নেন না। নিজের খরচেই রোগীর কাছে পৌঁছন। এখনও পর্যন্ত ২৬ জন মরণাপন্নকে রক্ত দিয়েছেন। বুধবার দিলেন শেওড়াফুলির সমরকুমার দে নামে এক অসুস্থকে।
পাথরপ্রতিমার মাধবনগর গ্রামীণ হাসপাতাল থেকে রক্ত সংগ্রহ করে নিয়ে গেলেন সমরবাবুর ছেলে সন্দীপন। হাসপাতালের বিএমওএইচ মহম্মদ হোসেন শাহ উপস্থিত থেকে রক্ত তুলে দেন। বিএমওএইচ বলেন, ‘সমর দে’র পরিবারের হাতে রক্ত তুলে দেওয়া হয়েছে। কোনও সমস্যা হয়নি। দাতা সুধীরবাবু সুস্থ আছেন।’ সন্দীপন দে বলেন, ‘বাবার কিডনির অসুখ। প্রস্রাবের মাধ্যমে রক্তক্ষরণ হয়। কলকাতার একটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তাঁর অপারেশন হবে। রক্তের প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি কোনও ব্লাড ব্যাঙ্কে এই গ্রুপের রক্ত পাওয়া যায়নি। তারপর সুধীরবাবুর নাম ও মোবাইল নম্বরটা ওখান থেকেই পাই। যোগাযোগ করার পর সুধীরবাবু রক্ত দিতে এক কথায় রাজি হয়ে যান। একটি টাকাপয়সাও নেননি। বিনামূল্যেই দিয়েছেন।’
রক্তদাতা সুধীর মান্না বলেন, ‘আমার রক্ত যে এতটা বিরল জানতাম না। ২০০৯ সালে একটি শিবিরে দান করেছিলাম। কলকাতার মানিকতলা সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাঙ্কের প্রতিনিধিরা এসেছিলেন। তাঁরা জানান আমার রক্তের গ্রুপ আর সেটি লাখে একজনের দেহে মেলে। সেই থেকে আর কোনও শিবিরে রক্তদান করি না। এই গ্রুপের রক্তের প্রয়োজন পড়লে সরকারি ব্লাডব্যাঙ্কগুলি থেকে ডাক আসে। তখন যাই। প্রতিবেশী শুভ্রাংশুশেখর নায়েক, ভাগ্যধর মাইতি ও সুজিত মাইতি সঙ্গে থাকে। বুধবার কলকাতায় গিয়ে রক্তদান করার কথা ছিল। কিন্তু পারিবারিক সমস্যার কারণে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তাই পাথরপ্রতিমার হাসপাতালে দান করেছি।’
শুধুমাত্র বিরলতম গ্রুপ হওয়ার কারণে স্বাস্থ্যদপ্তরের কাছে সুধীর মান্না অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি। যদিও সুধীরবাবু বলেন, তিনি অত্যন্ত সাধারণ একজন মানুষ। তবে যাঁদের জীবন বেঁচেছে তাঁর রক্তের দৌলতে তাঁরা বলেন, মানুষটি অসাধারণ। বিরল গ্রুপের জন্য শুধু নয়। নিজের উদ্যোগে ছুটে আসেন দান করতে। এই নিঃস্বার্থ, পরোপকারী মানসিকতাও বোম্বে গ্রুপের রক্তের মতোই বিরল।