


কলহার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: পাথুরিয়াঘাটা স্ট্রিট গলিটি সরু। হরবখত ভিড়। সব জায়গায় আবর্জনা। তার মধ্যে এরকম জাঁকজমকপূর্ণ একটি মন্দির যে থাকতে পারে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হবে না। গলি ধরে একটু এগলে বহু পুরানো একটি বাড়ি। বিশাল হাঁ করে থাকা দরজার উপরে লেখা ‘শ্রী বিহারীজী মন্দির’। ভিতরে ঢুকলেই ঝাঁ চকচকে দেবস্থান। তা ঝলমল করে। কারণ ছাদজুড়ে রংবেরঙের কাচের আধুনিক ঢঙের কাজ। দেওয়ালে ধাতুর মিনাকারি। জমকালো আলো। পাথরের বিশাল অপূর্ব দেখতে সিংহাসন। তাতে অধিষ্ঠান বিহারীজীর। ৪০০ বছর আগে তিনি ঈশ্বরের প্রচারক হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। ধীরে মানুষের মনে দেবতার আসন পান। এখন তাঁর সিংহাসন শোভা পায় রাধাকৃষ্ণের পাশে।
কলকাতায় তাঁর বাৎসরিক পুজো আজ, ২৫ জানুয়ারি। শহরে সে উপলক্ষ্যে নেপাল-ভুটান-শ্রীলঙ্কা থেকে এসেছেন ভক্তরা। নেপাল থেকে এসেছেন রজনীদেবী, ভীমদেও, শ্যাম আগরওয়াল সহ আরও ২০ ভক্ত। ভুটান, শ্রীলঙ্কা থেকে আসছে বেশ কয়েকটি পরিবার। এছাড়াও কয়েক হাজার ভক্ত আসছেন রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি থেকে। ভারতের প্রায় সর্বত্র স্থানীয়স্তরে বিহারীজীর পুজো হয়। তাঁর মূল মন্দির রয়েছে রাজস্থানের ঝুঝুন জেলার ভাড়ুন্দা কলাঁ গ্রামের নব বৃন্দাবনে। সেখানে কাটলি নদীর তীরেই ছিল তানসেনের গুরু সন্ত হরিদাসের প্রিয় শিষ্য বিহারীজীর তপোভূমি। সেখানে তিনি শ্রী পুরুষোত্তম দাস নামে বিখ্যাত।
কলকাতায় বিহারীজী মন্দিরের ট্রাস্টি বিক্রম প্রকাশ সুলতানিয়া এবং শঙ্কর জালান জানান, বাবার জন্ম প্রায় ৪২৩ বছর আগে রাজস্থানের চুরু জেলার রাজগড়ের সিদ্ধমুখে। যুবক বয়সে ঈশ্বরের সন্ধানে উত্তরপ্রদেশে বৃন্দাবনে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণ তপস্যায় যান। কিন্তু সাত অন্য তপস্বীর সঙ্গে মতানৈক্যের কারণে সেখানে বেশিদিন থাকেননি। ভারতের অন্য ধর্মগুরুদের মতো বেরিয়ে পড়েন ভারতবর্ষকে আবিষ্কার করতে। পৌঁছন অমরাবতী পর্বতমালা। সেখানে মানব একতার বার্তা প্রচার। এবং রাধাকৃষ্ণের মূর্তি নিয়ে নির্জন স্থানের সন্ধানে যাত্রা শুরু। চলার পথে কাটলি নদীর তীরে জল ও বৃক্ষ দেখে বৃন্দাবনর ন্যায় মনে করে শুরু করেন ধ্যান। অচিরেই এই স্থানকে নিজের কর্মভূমি হিসেবে গ্রহণ করে নাম দেন ‘নব বৃন্দাবন’। পাঁচটি বৃক্ষকে তিনি পঞ্চ পরমেশ্বর রূপে মান্য করে তপোভূমি হিসেবে খ্যাতি দান করেন। কলাঁ গ্রামের বাসিন্দাদের মুখে মুখে মুখে ফেরে এরকম বহু কথা। যেমন, সকাল-সন্ধ্যা আরতির সময় বিহারীজী শাঁখ বাজাতেন। তখন একটি গোরু এসে গাছের নীচে দাঁড়াত। গাছের নীচে কমণ্ডুল রাখতেন পুরুষোত্তম। গোরুটি কামধেনুর মতো দুধে পূর্ণ করে দিত পাত্র। সকলের বিশ্বাস, এই গাছের নীচে দাঁড়িয়ে কিছু মানত করলে তা পূরণ করেন বাবা বিহারীজী। সেই কারণে সম্বৎসর সেখানে অসংখ্য ভক্তের যাতায়াত। তাঁরই কিছু শিষ্য কলকাতাতে ২৫ বছর আগে স্থাপন করেছিলেন এই মন্দির। যেখানেই শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটানের ভক্তরা পুজো দিতে এসেছেন।
বিহারীজী রাজস্থানের সন্ত পুরুষ। সেখানে নব বৃন্দাবন স্থাপন করেছিলেন। সারা বিশ্বজুড়ে তাঁর ভক্ত। কলকাতাতেও আছে তাঁর মন্দির। তিনি প্রথাগত দেবতা নন। আবার কেবল ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বও নন। তিনি এক মানুষের মধ্যে দেবত্বের সম্ভাবনার প্রতীক। সাধারণ মানুষ হয়েও ভক্তিমূলক সাধনার ফলে তিনি অলৌকিক মর্যাদা লাভ করেন। এবং আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।