


কোরা বা ঘিয়ে রঙের জমির উপর লাল হলুদ সুতোর ভরাট কাজ। পাড় আর আঁচলে কাজের ঘনত্ব বেশি। আর সারা গায়ে সুতো দিয়ে ফুলের বুটিদার নকশা। না, শাড়ি নয়। পোশাকটির নাম মেখলা চাদর। অসমের এই ঐতিহ্যবাহী পোশাকটি এখন দেশের অন্যান্য রাজ্যেও জনপ্রিয়। আধুনিকারা অনেকেই এখন শাড়ির বদলে মেখলার দিকে ঝুঁকছেন। মেখলা পরার ইতিহাস কিন্তু বহু পুরনো। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অসম রাজ্যে এই পোশাক পরেন মহিলারা। সেই সংস্কৃতি ক্রমশ আমাদের রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। আজকাল আধুনিকারা অনেকেই শাড়ির বিকল্প হিসেবে এই পোশাকের দিকে হাত বাড়াচ্ছেন।
ইতিহাস কী বলে
বৈদিক যুগে মহিলারা যে ধরনের মেখলা পরতেন, তা ছিল শাড়ির মতোই লম্বা একটি বস্ত্র। নাম রিহা। তা কোমর থেকে জড়িয়ে নিয়ে ক্রমশ উপরদিকে উঠে কাঁধ ও মাথা পর্যন্ত ঢেকে রাখত। শুধু মুখের অংশ থাকত আবরণমুক্ত। পরবর্তীতে এই রিহাই দু’টি ভিন্ন বস্ত্রখণ্ডে পরিণত হয়, যার নাম মেখলা চাদর। দু’টি বস্ত্রখণ্ডের নীচের ভাগকে বলা হতো মেখলা এবং উপরের ভাগটি চাদর। এখন নীচের অংশটা স্কার্টের মতো সেলাই করে পরার রীতি। প্রাচীন যুগে এমন নকশা ছিল না। তখনকার দিনের মেখলায় কোনও সেলাই পড়ত না। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে তা শাড়ির মতোই, শুধু একটানা একটা কাপড় দিয়ে তৈরি না করে বরং দুটো কাপড় দিয়ে বানানো। আর সেই ক্ষেত্রে বস্ত্রের দু’টি ভাগই শাড়ির তুলনায় ছোট। তাতে পরার সুবিধে হয়। বৈদিক যুগে ঋষিপত্নীরা এই পোশাক যখন পরতেন, তখন তা কোমরের কাছে গুঁজে নিতেন। সেই অংশের নানারকম ভাঁজ থাকত যাতে সেই অংশটা খুলে না যায়। প্রতিটি ভাঁজই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কোমরের কাছে একটা ব্রিজের মতো বেড় তৈরি করত। যা কোনও সেলাই বা গিঁট ছাড়াই সংরক্ষিত থাকত। কিন্তু সেই যে বন্ধন প্রক্রিয়া, কাপড়ের অংশগুলো একে অপরের ভিতর গলিয়ে সংরক্ষিত রাখা, তা বেশ সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়ছিল মহিলাদের পক্ষে। সারা দিনের নানা কাজের মাঝে তাড়াহুড়োয় কেউই আর সহজে এই বন্ধন জুড়ে নিতে পারছিলেন না। তাছাড়া এই সময় পোশাকেরও সামান্য বদল এসে গিয়েছিল সমাজে। সেমিজের বদলে পেটিকোট ও ব্লাউজের প্রচলন ঘটতে শুরু করল। সেই ক্ষেত্রে মেখলার নীচের অংশটি লম্বালম্বি সেলাই করে পরার কায়দা শুরু করেন সে যুগের মহিলারা। তার সামনের অংশের কুঁচি অটুট রাখা হয়, কিন্তু কোমরের কাছে অন্য অংশ দিয়ে বেড় না দিয়ে বরং পেটিকোটের ভিতর এই কুঁচি গুঁজে নেন এ যুগের আধুনিকারা। সেই কায়দাই ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে মহিলাদের মধ্যে। পরতে সুবিধা হয়, খুলে যাওয়ার ভয় থাকে না বলেই মহিলারা মেখলার এই ধরনটি আপন করে নিয়েছেন। এই যে সেলাইয়ের প্রচলন তা অবশ্য গতানুগতিক স্টাইল নয়। অসমের মহিলারা অনেকেই কিন্তু মেখলার সঙ্গে পেটিকোট ব্যবহার করলেও তাতে সেলাই করেন না। বরং শাড়ির মতোই কোমরে গুঁজে কুঁচি দিয়ে তা পরে নেন। তারপর চাদরটাও আঁচলের মতোই আলাদা করে কোমরে গুঁজে কাঁধে ফেলে দেন। কিন্তু আধুনিক প্রজন্ম, যাঁরা শাড়ি পরতে অভ্যস্ত নয়, তাঁরা এই সেলাই করা মেখলাই বেশি পছন্দ করছেন। বিয়েবাড়ি বা অন্য কোনও অনুষ্ঠানে এই ধরনের পোশাকের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। শাড়ির মতো দেখতে হলেও এই পোশাক পরা এবং সামলানো দুটোই অনেক সোজা।
কাপড়ের বৈচিত্র্য
নানারকম ফ্যাব্রিক ব্যবহার করা হয় এই পোশাকটি তৈরির জন্য। অসমে পাট ও সিল্ক সুতোর সংমিশ্রণে এক বিশেষ কাপড় তৈরি হয় যার নাম পাটসিল্ক। সেই কাপড়ে তৈরি মেখলা চাদর খুবই জনপ্রিয়। এই ধরনের মেখলা একটু জমকালো দেখতে হয়। অনুষ্ঠানে অনায়াসে পরা যায়। অথচ দামটা তুলনায় কম থাকে বলেই এই ফ্যাব্রিকের কদর বেশি। এছাড়া অসম সিল্ক ও মুগার মেখলা তো আছেই। আজকাল অনেকেই তসরের কাপড় দিয়েও মেখলা চাদর বানাচ্ছেন। সেক্ষেত্রে কেউ আবার কম্বিনেশন ফ্যাব্রিকও ব্যবহার করছেন, যেমন মেখলাটা তসরের বানিয়ে চাদরটা সিল্ক বা সুতি দিয়ে তৈরি করছেন। তবে রোজকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুতির মেখলার চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। অনেকে অসমের বিশেষ পদ্ধতিতে বোনা রেশম সুতো, ইরি সিল্ক, দিয়েও মেখলা চাদর বানান। আঞ্চলিক কাপড় হিসেবে এই ফ্যাব্রিকটিও বেশ জনপ্রিয়।
অভিনব নকশা
মেখলা চাদরের নকশায় সুতোর কাজ সবচেয়ে জনপ্রিয়। তবে মেখলা অংশে কাজের বহর কম থাকে। চাদরেই বেশি কাজ চোখে পড়ে। শাড়িতে যেমন পাড় আর আঁচলে কাজ থাকে তেমনই মেখলাতেও পাড়ের কাছে ভারী কাজ করা হয়। আর চাদরের অংশে গোটাটাই ভরাট কাজ করা থাকে। তবে রোজকার পরার মতো মেখলা চাদরে অনেক সময় চাদরের অংশেও আঁচলের দিকটায় বেশি ভরাট কাজ থাকে। বাকি চাদরে কাজ তুলনায় কম থাকে। সুতোর এমব্রয়ডারির, কাঁথা, গুজরাতি স্টিচের কাজ, তাঁতে বোনা সুতো ও জরির ভরাট ডিজাইন সবই পাবেন মেখলা চাদরে। গতানুগতিক স্টাইলে জামদানি কাজ, ঢাকাই কাজ, সুতোর এমব্রয়ডারি ইত্যাদি পাড়ে, আঁচলে ভরাট করে করা হতো। আর সারা গায়ে অনেক ক্ষেত্রে বুটির কাজ চোখে পড়ত। অথবা সুতোর ফুলও সেলাই করা হতো। কিন্তু আধুনিক ডিজাইন অনুযায়ী এখন প্রিন্টেড কাপড়ের মেখলা চাদরও তৈরি হচ্ছে।
রঙেও এখন নতুনত্ব
আগে রোজকার পোশাক বা বাড়িতে পরার পোশাক হিসেবে অসমের মহিলারা একেবারে সাধারণ সুতির
মেখলা চাদর পছন্দ করতেন। কাপড় কতটা আরামদায়ক সেদিকে খেয়াল রাখা হতো। রঙের ক্ষেত্রেও তা ছিল হালকা রঙের, একরঙা জমিতে পাড় ও আঁচলে সামান্য সুতোর কাজ করা ইত্যাদি। আর পোশাকি মেখলা চাদরে সিল্ক, ইরি সিল্ক, পাটসিল্ক, মুগা ইত্যাদি ফ্যাব্রিকের উপর সুতোর কাজ করা থাকত। ক্রমশ মেখলা চাদর যতই অসম থেকে অন্যান্য প্রদেশে পাড়ি জমিয়েছে, ততই তার নকশা ও রঙে
বদল এসেছে। উজ্জ্বল রং, কনট্রাস্ট কাজ এখন
বেশি চোখে পড়ছে নকশায়। ভারী কাজও দেখা যাচ্ছে। মিক্স অ্যান্ড ম্যাচ করে ডিজাইন করা হচ্ছে। আজকাল অনুষ্ঠান বাড়ি, নেমন্তন্ন ইত্যাদিতেও এই পোশাক পরতে চাইছেন মহিলারা। ফলে বেনারসি কাজ, সিল্কের ফ্যাব্রিক, জরির কাজ মেখলার ডিজাইনে উঠে আসছে।
ব্লাউজের নানারকম
শাড়ির মতোই মেখলার সঙ্গে ব্লাউজের বিভিন্ন ধরন ট্রাই করতে চাইছেন এযুগের আধুনিকারা। ফলে কনট্রাস্ট রঙের গতানুগতিক ব্লাউজের পাশাপাশি ক্রপটপ, হল্টার টপ, চাইনিজ কলার দেওয়া শর্ট কুর্তি ইত্যাদিও অনেকেই পরছেন মেখলা চাদরের সঙ্গে। অনেকে আবার জ্যাকেট স্টাইল ব্লাউজ বানাচ্ছেন। কেউ বা শর্ট শার্টের সঙ্গেও টিম
আপ করে পরছেন এই পোশাক। সব মিলিয়ে ডিজাইন, রং ও পরার ধরনে বেশ নতুনত্ব এসেছে মেখলা চাদরে। তবে গতানুগতিক নকশার কদর আজও রয়েছে।
কমলিনী চক্রবর্তী