


বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: মানবদেহে ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু সংক্রমণ ঘুম উড়িয়েছে চিকিৎসকদের। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, এখন ‘ওয়ান হেলথ’-এর যুগ। সুপারবাগের বিরুদ্ধে লড়তে হলে প্রাণী, উদ্ভিদ ও মানুষ—তিন জগতেরই ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়তে হবে। কারণ, অ্যান্টিবায়োটিক তো শুধু মানুষ গোগ্রাসে গিলছে না। ইচ্ছাখুশি দেওয়া হচ্ছে হাঁস, মুরগি, গবাদি পশু, মাছ—সবাইকে। দেওয়া হচ্ছে শাক-সবজি, ফলমূলেও। তাই বিপদের কারণকে গোড়া থেকে উৎপাটিত করতে গেলে তিন জগতেরই সমস্যার সমাধান করতে হবে। এমনই এক সময়ে সামনে এল প্রাণীজগতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর গবেষণা। বেলগাছিয়ার ইন্ডিয়ান ভেটেরেনারি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (আইভিআরআই) এবং রাজ্য প্রাণী এবং মৎস্য বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক-গবেষকদের যৌথ গবেষণায় পথকুকুরদের শরীরে ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু পাওয়ার কথা জানা গিয়েছে। ‘সেজ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে গবেষণাপত্রটি। সেখানে আইভিআরআই-এর ভেটেরেনারি মেডিসিনের মুখ্য বিজ্ঞানী ডাঃ সমীরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ১০জন প্রাণী চিকিৎসক-গবেষক কলকাতার রাস্তার কুকুরদের নিয়ে গবেষণা চালান। তাতে দেখা যায়, তাদের শরীরে অন্তত ৫৯টি মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু রয়েছে। তার মধ্যে ৪৮টি হল মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া। ১১টি হল মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া ‘ক্লেবসিয়েলা নিউমোনি’। অন্যতম গবেষক রাজ্য প্রাণী এবং মৎস্য বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরেনারি মাইক্রোবায়োলজির প্রধান ডাঃ ইন্দ্রনীল সামন্ত বলেন, ‘২৯৩টি কুকুর নিয়ে আমরা গবেষণা করেছিলাম। জিনগত প্রভেদে ৫৯ প্রকারের মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট মারণ ব্যাকটেরিয়া পেয়েছি। আমাদের পরামর্শ, খালি হাতে রাস্তার কুকুর ধরবেন না। মাস্ক বা গ্লাভস পরা অত্যন্ত জরুরি। নয়তো শ্বাসপ্রশ্বাস বা কাটা জায়গার মাধ্যমে সংক্রমণ হতে পারে।’ চিকিৎসক-বিজ্ঞানীরা আরও জানিয়েছেন, যেসব পথকুকুরের উপর গবেষণা করে তাঁরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, তাদের অসুখবিসুখের জন্য আগে কখনও অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স দেওয়া হয়নি। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, পরিবেশ থেকেই কুকুরগুলির শরীরে ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া ঢুকেছে।
এ বিষয়ে কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন সুপারিনটেন্ডিং ভেটেরেনারি অফিসার ডাঃ উৎপল দাস বলেন, ‘পশুপাখিদের মারাত্মক হারে ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু সংক্রমণ হচ্ছে। প্র্যাকটিসে হামেশাই দেখছি, বহু সাধারণ অসুখবিসুখেও চেনা ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিকে আর কাজ হচ্ছে না। ডায়ারিয়ার মতো রুটিন সমস্যায় পর্যন্ত প্রচলিত ওষুধ কাজ করছে না। আমার মতে, এর কারণ দু’টি। এক, প্রাণী চিকিৎসায় রাজ্যজুড়ে হাতুড়েদের দাপাদাপি। তাঁরা নিয়ম না মেনেই অ্যান্টিবায়োটিক দিচ্ছেন। খেসারত বইতে হচ্ছে পরিবেশকে। দুই, পরিত্যক্ত, মেয়াদোত্তীর্ণ, অতিরিক্ত ওষুধ ফেলার বা নষ্ট করার কোনও নিয়মই মানা হয় না। অধিকাংশ মানুষই এসব ফেলছেন রোজকার আবর্জনা ফেলার ডাস্টবিনে। রাস্তার কুকুররা সেসব জায়গা থেকে খাদ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্টের শিকার হচ্ছে।’ প্রসঙ্গত, এই কারণেই রাজ্য স্বাস্থ্যদপ্তর রাজ্যে নয়া অ্যান্টিবায়োটিক পলিসি তৈরি করার জন্য শুধু স্বাস্থ্য নয়, প্রাণী সম্পদ, মৎস্য, বন সহ আনুষঙ্গিক দপ্তরের পদস্থ কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন।