


সন্তানের কাছে মাতৃঋণ আজীবনের। নিজের মাকে নিয়ে কতই না গল্প জড়িয়ে আছে জীবনের নানা বাঁকে। কিন্তু মায়েদের কথা আলাদা করে বলা হয় কই? বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা লিখছেন তাঁদের মায়ের কথা। এই পর্বে রাজ চক্রবর্তী।
• আমার কঠিন থেকে কঠিনতম জীবনযুদ্ধে যে মানুষটি নীরবে আমাকে সব সময় সাহস দিয়েছেন তিনি আমার মা লীলা রানি চক্রবর্তী। মায়ের কথা বলতে গেলে বা লিখতে গেলে আমার শব্দভাণ্ডারে টান পড়বে। কারণ মা যে আমার গোটা পৃথিবী। সন্তানের জন্য নিঃশব্দে, নিঃস্বার্থে ত্যাগ স্বীকার একমাত্র মায়েরাই করতে পারেন। আমার মাও ব্যতিক্রম নন। মা অনেক কষ্ট করে আমাদের ভাই-বোনদের বড়ো করেছেন। তাঁর প্রচুর ত্যাগ রয়েছে আমাদের বড়ো করার জন্য। আমার মনে হয় মায়েরা এরকমই হন। সন্তানের জন্য ত্যাগেই তাঁরা জীবনটা অতিবাহিত করে দেন। আজ জীবনে এতটা পথ পেরিয়ে আসার পর কিছুটা সাফল্যের মুখ যখন দেখেছি, কলকাতায় নিজের একটা আস্তানা করেছি, তখনও কিন্তু আমার মা সেই হালিশহরে নিজের শিকড়টা ভোলেননি। এখনও মায়ের কথায় পুরানো দিনগুলি ফিরে ফিরে আসে।
আমার বাবা চলে যাওয়ার পর মা মানসিকভাবে কিছুটা ভেঙে পড়েছেন। তাই আমরা পুরো পরিবার মিলে মাকে ভালো রাখার চেষ্টা করি। আমার স্ত্রী শুভশ্রীর (গঙ্গোপাধ্যায়, অভিনেত্রী) সঙ্গে মায়ের খুব সুন্দর বন্ডিং। আমাদের সন্তান ইউভান, ইয়ালিনি মায়ের চোখের মণি। এখন আমার দুই মা। মা আর ইয়ালিনি। এই দুই মাকে যখন একসঙ্গে দেখি আমি খুব ইমোশনাল হয়ে যাই। কিন্তু, আমার মা একটুও ইমোশনাল নন। কঠিন পরিস্থিতি খুব কঠোর হাতে পেরিয়ে এসেছেন। তাই পৃথিবীর সমস্ত সুখ আমি মাকে দিতে চাই। যদিও মায়ের থেকে যা যা পেয়েছি সেই ঋণ শোধ হয় না। তার কাছে সবকিছুই তুচ্ছ।
আমার মতে মায়ের হাতের আলু পোস্ত পৃথিবীর সেরা খাবার। মনে আছে যখন কলকাতায় আমার নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার লড়াই চলছে সেই সময় যখন মাঝে মাঝে বাড়ি ফিরতাম, তখন মা আমার জন্য অবশ্যই আলু পোস্ত রান্না করত। আমি যা যা খেতে ভালোবাসি মা সেগুলো যত্ন করে রান্না করে রাখত। আমার জীবনের ভালো সময়ে আমার সাফল্যে মা যেরকম গর্ববোধ করেছেন, আনন্দে মায়ের চোখে জল দেখেছি, ঠিক খারাপ সময়ও সব সময় সাপোর্ট হিসেবে থেকেছেন আমার মা।
এখন মায়ের বয়স হয়েছে। মা একটু আদুরে হয়ে গিয়েছে। তাই আমরা মাকে আদরে মুড়ে রাখতে চাই। এখনও কাজের ফাঁকে দিনে একাধিকবার মাকে ভিডিও কল করি। ব্যস্ততার মধ্যেও আমি মাকে সময় দেওয়ার চেষ্টা করি। মায়েরা হয়তো আমাদের থেকে এই সময়টুকুই চান। এই সময় দেওয়াটা খুব জরুরি। এখন মা আদুরে হলেও আমার মায়ের কড়া শাসন ছিল। ছোটোবেলায় কয়েক ঘা আমার পিঠেও পড়েছে। মাকে আমি এখনও ভয় পাই। এখনও আমি কোথাও যাওয়ার আগে মায়ের অনুমতি নিই। বাড়ি থেকে বেরনোর সময় মাকে প্রণাম করি। আমার মনে হয় মায়ের আশীর্বাদ সঙ্গে থাকলে কোনো বিপদ ছুঁতে পারে না।
মা আমার স্রষ্টা। মায়ের জন্যই আমি সৃষ্টি হয়ে এই পৃথিবীতে এসেছি। মায়ের হাসি মুখটা দেখে যা শান্তি, তা পৃথিবীর অন্য কোনো কিছুতে নেই। মায়ের আদর, স্নেহ, শাসন, প্রশ্রয় না থাকলে আজকের রাজ চক্রবর্তীর তৈরি হওয়া সম্ভব ছিল না।