


হ্যান্ডলুম। ইদানীং খুব ট্রেন্ডিং এই শব্দটি। আদতে তা হল হাতে বোনা শাড়ি। এর কদর সুপ্রাচীন। একটা সময় শুধুমাত্র চরকায় সুতো কেটে হাতে শাড়ি বুনতেন তাঁতিরা। ধীরে ধীরে পাওয়ারলুম এল। পরিমাণে অনেক শাড়ি তৈরি হল বটে, কিন্তু কোথাও হারিয়ে গেল হাতে বোনার আরাম। যাঁরা খাঁটি জিনিসের কদর করতে জানেন, তাঁরা আজও হ্যান্ডলুম খোঁজেন। বিভিন্ন প্রাদেশিক শাড়িতে হাতে বোনা নকশার চাহিদা প্রচুর। ওড়িশা তার মধ্যে অন্যতম। নানা ধরনের হ্যান্ডলুমের ঐতিহ্যবাহী নকশায় সমৃদ্ধ ওড়িশার ইতিহাস। শাড়ি ভালোবাসেন, অথচ ওড়িশার শাড়ি সংগ্রহে নেই, এমন মানুষ কম।
জটিল নকশা, উজ্জ্বল রং এবং বুনন পদ্ধতি— ওড়িশার হ্যান্ডলুমের মূলত এই তিন বিশেষত্ব। ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, কলিঙ্গ সাম্রাজ্যের সময় থেকে এই ধরনের শাড়ি বোনা শুরু। অর্থাৎ দ্বাদশ শতাব্দীতে প্রথম নিজস্ব নকশায় বুনন শুরু করেন ওড়িশার কারিগররা। তাঁত বোনা সেসময় পবিত্র কর্ম বলে বিবেচিত হতো। সপ্তদশ শতাব্দীতে মারাঠা সাম্রাজ্যের শাসন শুরু হল। টাই অ্যান্ড ডাই পদ্ধতির সূচনা হল তখন থেকে। আজও ওড়িশার নিজস্ব ঘরানায় এই টাই অ্যান্ড ডাই পদ্ধতির ব্যবহার রয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে শুরু হল ব্রিটিশ শাসন। ধীরে ধীরে পিছনের সারিতে যেতে শুরু করল হাতে বোনা নকশা। কারণ ব্রিটিশরা কারখানা নির্মাণ করে। সেখানে ওড়িশার নিজস্ব নকশায় পাওয়ারলুমে শাড়ি বোনা শুরু হয়। ১৯৪৭-এ স্বাধীনতার পর সরকার ফের হ্যান্ডলুম কোঅপারেটিভ তৈরি করে।
ইক্কত
রঙিন সুতো দিয়ে একটা নির্দিষ্ট ডিজাইনে বোনা হয় এই শাড়ি। জ্যামিতিক নানা নকশা তোলা হয় শাড়িতে। অ্যাবস্ট্রাক্ট ডিজাইনও ইক্কতে খুব জনপ্রিয়। প্রাথমিকভাবে নিজস্ব ভাবনা থেকেই নানা ডিজাইনে শাড়ি বুনতেন তাঁতিরা। ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট প্যাটার্ন অনুসরণ করতে শুরু করেন। ফলে সহজেই এখন ইক্কতকে আলাদাভাবে চেনা যায়।
কটকি
সুতির কটকি পরে দিনের বেলা যে কোনও অনুষ্ঠানে চমৎকার ফ্যাশনেবল হয়ে ওঠা যায়। আর রাতের অনুষ্ঠানের জন্য সিল্কে বোনা কটকি শাড়ির কদর আলাদা। মেটালিক থ্রেডের জন্য বিখ্যাত কটকি।
বোমকাই
ওড়িশার ঐতিহ্যবাহী নকশার বিশেষত্ব হল, এক একটা কাপড়, এক একটা পদ্ধতি অবলম্বন করে তৈরি হয়। নকশাভেদে কখনও বা স্থানভেদেও বদলে যায় নাম। কাপড়ের প্রস্থ বরাবর যে সুতো থাকে তা দিয়ে তৈরি হয় বোমকাইয়ের নকশা। অভিজ্ঞ তাঁতিরা বংশপরম্পরা ধরে বুনে চলেছেন বোমকাই।
সম্বলপুরি
রঙিন সুতো দিয়ে যে শাড়ি বোনা হবে, এ তো জানা কথা। কাপড়ও আগে থেকে রং করে নেওয়া হয়। তারপর শুরু হয় নকশা বোনার কাজ। সম্বলপুরি তৈরির ক্ষেত্রে রং করার আগে মাপমতো কাপড়ের নির্দিষ্ট কিছু কিছু অংশ বেঁধে রাখা হয়। রং করে শুকিয়ে নেওয়ার পর বোনার সময় ওই বেঁধে রাখা অংশ খুলে নেওয়া হয়। তাতেই তৈরি হয় সম্বলপুরির আদর্শ ডিজাইন।
তসর
এক এক প্রদেশের তসর এক একরকম বিশেষত্ব নিয়ে তৈরি। ওড়িশার নিজস্ব তসরের চাহিদা দেশজুড়ে। আন্তর্জাতিক বাজারেও এই ধরনের তসর কদর পায়। ওক পাতা খেয়ে বেঁচে থাকা রেশম পোকার লালা থেকে তৈরি হওয়া সুতো দিয়ে বোনা হয় এই বিশেষ তসর। এই শাড়ির কাঁচামাল, অর্থাৎ সুতো জোগাড় করতেই বেগ পেতে হয় কারিগরদের। তাই খাঁটি তসর বোনার পরিমাণ এখন কমেছে অনেকটাই।
পাশাপলি
ওড়িশা হ্যান্ডলুমের মধ্যে একটু যেন অচেনা এই পাশাপলি ডিজাইন। চেক ডিজাইনের জন্য বিখ্যাত পাশাপলি। এই ধরনের শাড়ির জমি, আঁচল কোথাও না কোথাও চেক মোটিফ থাকবেই।
ডোংরিয়া
ওড়িশার আদিবাসী সম্প্রদায়ের তৈরি বিশেষ ধরনের শাড়ি এই ডোংরিয়া। যা তাঁদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার পরিচয়বাহক। শাড়ির জমিতে ছোট বুটি। কখনও গোল, কখনও চৌকো মোটিফের সেই বুটি ঘিরে নিখুঁত সুতোর কাজ। আর আঁচলভরা নকশা এই শাড়ির বিশেষত্ব। আঁচলে তৈরি নানা মোটিফে আদিবাসি সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার গল্প বোনা থাকে। পুরনো হয়ে যাওয়া ডোংরিয়া শাড়ির আঁচল কেটে ফ্রেম করে দেওয়ালে টাঙিয়ে বাড়িও সাজান রুচিশীল বাঙালি।
হ্যান্ডলুম শাড়িকে আপন করে নেওয়ার অর্থ ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা। তাঁতশিল্পী, দক্ষ কারিগরদের বাঁচিয়ে রাখার দায় আসলে সকলের। তাঁদের হাত ধরেই বেঁচে থাকে হারিয়ে যেতে বসা নকশার ইতিবৃত্ত। পরিধানশিল্পকে যা অমরত্ব দেয়।
স্বরলিপি ভট্টাচার্য