


নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: বাস্তবে যা ছোঁয়া যায় না, থিম পুজোর মরশুমে সেসবই হয়তো হয়ে ওঠে বিশেষ আধার। চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোকে কেন্দ্র করে এমনিতেই হাজারো থিমের সমাবেশ। কিন্তু সেখানেও কাল্পনিক থিমের বহর ও বাহার দু’টিই বেশি। কোথাও কাল্পনিক বাগানের পসরা সাজিয়ে বসেছেন উদ্যোক্তারা, তো কোথাও শিল্পকে ঘিরে কাল্পনিক গড়নের সমাবেশ। আর সেসব থিমকে ঘিরেই থাকছে আলোর বর্ণময় আয়োজন। চন্দননগরের আলো এমনিতেই বিশ্বখ্যাত। তার উপরে জগদ্ধাত্রী পুজো মানেই নতুন আলোর আত্মপ্রকাশের মঞ্চ। স্বাভাবিকভাবেই থিমের ময়দানে আলো দিয়ে মাতানোর উদ্যোগ বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে।
৫২ বছরে পা দিয়েছে চন্দননগরের বোড় পঞ্চাননতলার পুজো। এবারের আয়োজন ‘কল্পোদ্যান’। এক অনবদ্য কাল্পনিক বাগান তৈরি করেছেন উদ্যোক্তারা। প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে গড়ে ওঠা গাছ এখানে শিল্পীর মনের রঙে রাঙিয়ে এক অন্য অবয়ব তৈরি করেছে। পাতার গড়নও চেনা, কিন্তু তার সজ্জা অচেনা। বহুবিধ রং, নানা উপকরণে সেজে সে কাল্পনিক বাগানকে শিল্পের এক ভিন্নধর্মী চেহারা দিয়েছে। বাগান আছে তাই আছে গাছপালা, পাতা, ফল, ফুল। পাটকাঠি, মশারি, সুতো, ফোম সহ হরেক উপাদানে নির্মিত সেই বাগান চমক জাগাবেই। এমনটাই দাবি উদ্যোক্তা দেবসদয় কুণ্ডুর। তিনি বলেন, বাগান মানে এক অনন্ত আকাশ। সেখানে যদি কল্পনা জুড়ে যায়, তবে স্বর্গোদ্যানও হার মেনে যায়। আমরা সেই স্বর্গীয় সমাবেশ তৈরি করেছি। কল্পনার বাগানকে আরও মোহময় করে তুলতে ব্যবহার করা হয়েছে বিশেষ আলো। মণ্ডপ থেকে আলোতে থিমের বাহার থাকবে আর প্রতিমায় থাকবে না! না, সেখানেও আছে। দেবীর সাবেক ধাঁচা ধরে রেখেই অভিনব আঙ্গিকে প্রতিমা নির্মাণ করা হয়েছে। উদ্যোক্তাদের দাবি, এই প্রথম কেনপোনিষদকে পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করে দেবীর অবয়ব গড়া হয়েছে। চন্দননগরের চমকদার পুজোর তালিকায় দৈবকপাড়ার নাম থাকেই। এবারও দৈবকপাড়া চমকের ডালি সাজিয়ে হাজির হতে কোমর কষেছে। দৈবকপাড়ার এবারের থিম, ‘প্রান্তিক চিত্রশিল্প’। সাবেক বাংলা অর্থাৎ বাংলা, বিহার, ওড়িশায় লোকায়ত চিত্রশিল্প এক অনন্য চেহারা নিয়েছিল। সময়ের গতিকে সেসব চর্চার আড়ালে চলে গিয়েছে। মধুবনী, বিভিন্ন প্রদেশের পটশিল্প জাদুঘরের সম্পত্তি হয়ে গিয়েছে। সেইসব শিল্পকে আশ্রয় করেই এক কল্পনার চিত্রশিল্প-নগরী তৈরি করছে দৈবকপাড়া। পুজোর উদ্যোক্তা বিজয় গুহ মল্লিক বলেন, আমাদের গোটা মণ্ডপই সেই লোকায়ত চিত্রশিল্পের অনবদ্য ক্যানভাস। নানাভাবে সাবেক শিল্পধারাকে ব্যবহার করে মণ্ডপসজ্জা করা হয়েছে। উদ্যোক্তাদের সূত্রে জানা গিয়েছে, কলসি, বাঁশ, কুলো এবং একাধিক ক্যানভাস সহ নানা উপকরণকে ছোট ছোট ক্যানভাসে ধরে সেখানেই লোকায়ত চিত্রশিল্প ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। সাবেক ধাঁচার প্রতিমাতেও আধুনিকতার ছোঁয়া রাখছেন উদ্যোক্তারা। সঙ্গে থাকছে আলোর চমকপ্রদ সাজ। কল্পনার উড়ান এসে থামছে বাস্তবের চন্দননগরের মাটিতে। চির চেনা পাড়া বদলে যাচ্ছে আলোর সমাবেশে। রাতের চন্দননগর হাতছানি দিতে শুরু করেছে। দেবীর ও শহরের বদলে যাওয়া রূপ দর্শনের ডাক এখন অনেকটাই স্পষ্ট।