


আয়ুর্বেদিক দৃষ্টিভঙ্গিতে মাছ অতি পুষ্টিকর খাদ্যের উত্স। তা কোন মাছ খেলে উপকার বেশি? প্রায় চল্লিশটিরও বেশি মাছের খাদ্যগুণ নিয়ে লিখেছেন আয়ুর্বেদিক চিকিত্সক ডাঃ বিশ্বজিৎ ঘোষ।
মাছের গুণ:
আয়ুর্বেদ দ্রব্যগুণ মতে মাছ সাধারণত পুষ্টিকারক, বলকারক, গুরুগুণ যুক্ত, শুক্রবর্ধক, স্নিগ্ধ, মধুর রস ও কফপিত্ত জনক। যাঁরা অধিক কায়িক পরিশ্রম করেন, ব্যায়াম করেন তাঁদের পক্ষে মাছ বেশ হিতকর।
১. বাতব্যাধি রোগে মাছের উপকারিতা:
আয়ুর্বেদ চিকিৎসাবিদ্যায় সর্বমোট আশি প্রকার বাতব্যাধির কথা বলা হয়েছে পাশাপাশি এই বাতব্যাধির পথ্য নিয়েও সবিস্তারে বর্ণনা রয়েছে। আয়ুর্বেদ মতে ‘মৎস্যাশিনো ন বাধন্তে রোগা বাতসমুদ্ভবা’—
অর্থাৎ নিয়মিত মাছ সেবনকারীরা বাত রোগে আক্রান্ত হয় না
২ বড় মাছের গুণ:
বড় মাছ গুরু, শুক্রজনক ও মলরোধক।
যাদের কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে বড় মাছ সেবনে সমস্যা বাড়তে পারে।
৩ ছোট মাছের গুণ:
ছোট মাছ লঘু, সহজপাচ্য, মলসংগ্রাহক এবং গ্রহণী রোগ অর্থাৎ মূলত ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোমে উপকারী।
৪ রুই মাছ:
সর্বপ্রকার মাছের মধ্যে রুই মাছ শ্রেষ্ঠ। এই মাছ রক্তাক্ষ, রক্তমুখো, রোহিত ইত্যাদি নামে পরিচিত। গুণে কষায়যুক্ত, মধুররস, বাত নাশক, মূলত শুক্রবর্ধক, অর্দিতরোগ অর্থাৎ (ফেসিয়াল প্যারালাইসিস) সমস্যায় বেশ উপকারী। অন্যদিকে ‘ঊর্ধজত্রুগত রোগান হন্যা রোহিত মুন্ডকম’— অর্থাৎ রুই মাছের মাথা ঊর্ধজত্রুগত (ই.এন.টি- নাক, কান, গলা)-এর রোগ নিবারণ করে।
৫ কাতলা:
কাতলা মাছ গুরু অর্থাৎ দেরিতে হজম হয়, মধুররস ও উষ্ণবীর্য এবং ত্রিদোষনাশক ( বাত, পিত্ত, কফ তিন প্রকার দোষের অসাম্যাবস্থায় উপকারী)
৬ বোয়াল:
এই মাছ শ্লেষ্মাকর ও বলবর্ধক কিন্তু এতে রক্ত ও পিত্ত দূষিত হয়। ফলে যাঁদের ত্বকের রোগ রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে এই মাছ সেবন অহিতকারক।
৭ মৃগেল:
মৃগেল মাছের গুণ প্রায় রুই মাছের সমতুল্য।
তবে বেশ সুস্বাদু ও রুচিকর।
৮ ইলিশ:
ইলিশের প্রতি বাংলা ও বাঙালির এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ‘ইল্লিশো মধুর: স্নিগ্ধ রোচনো বহ্নিবর্ধন:’— ইলিশ মাছ মধুররসযুক্ত, স্নিগ্ধ, মুখরোচক, অগ্নিবর্ধক, পিত্তনাশক, কফ কারক, শুক্রকর ও বায়ুনাশক।
৯ শিঙ্গি:
বাত রোগে হিতকর, শ্লেষ্মাপ্রকোপক, তিক্ত কষায় রস, লঘু ও রুচিকারক।
১০ ভেটকি:
মধুররস যুক্ত, শীত, বৃষ্য অর্থাৎ বাজীকারক, শ্লেষ্মাকর, গুরু, রুচিকারক কিন্তু আমবাত অর্থাৎ যাদের রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিসের সমস্যা রয়েছে তাঁদের ক্ষেত্রে ভেটকি মাছ খাওয়া অহিতকারক।
১১ শিলন মাছ:
বলবর্ধক, শ্লেষ্মাকর, গুরুগুণ যুক্ত, বাতপিত্ত নাশক, হৃদ্য অর্থাৎ হার্টের পক্ষে উপকারী কিন্তু আমবাত সমস্যায় সেবন বর্জনীয়।
১২ শাল মাছ:
মল সংগ্রাহক, হৃদ্য, কষায় মধুররস যুক্ত।
১৩ গাগর মাছ:
অল্প পিত্তজনক, বাতনাশক ও কফ প্রকোপক।
১৪ কই মাছ:
মধুররস, স্নিগ্ধ, কফ প্রশমক, রুচিকারক, পিত্তবর্ধক, বায়ুনাশক ও অগ্নিবর্ধক।
১৫ বাইন মাছ:
গুরু, শুক্রবর্ধক, কষায়রস ও রক্ত পিত্ত নাশক।
১৬ আড় মাছ:
গুরু, স্নিগ্ধ,বায়ু এবং শ্লেষ্মা প্রকোপক।
১৭ মাগুর মাছ:
মধুররস, স্নিগ্ধ, মল সংগ্রাহক, শুক্রকারক ও গুরু।
১৮ ট্যাংরা মাছ:
পিত্তনাশক, রুক্ষ, অগ্নিদীপক, কফনাশক ও লঘু।
১৯ চ্যাংমাছ:
মধুররস, স্নিগ্ধ, বিষ্টম্ভী অর্থাৎ শীতবীর্য্য, লঘুপাক।
২০ পুঁটি মাছ:
পুঁটি তিক্ত-কটু মধুর রস, শুক্রজনক, কফবাতনাশক, স্নিগ্ধ, কণ্ঠগত রোগনাশক।
২১ বড় পুঁটি মাছ:
স্নিগ্ধ, মুখগত ও কণ্ঠগত রোগনাশক।
২২ ভেলে মাছ:
ভল্লকী মধুর: শীতো বৃষ্য: শ্লেষ্মকরো গুরু:।।
অর্থাৎ ভেলে মাছ মধুররস, শীতবীর্য্য প্রধান, শুক্রজনক, শ্লেষ্মাবর্ধক ও গুরু।
এই মাছ সেবন কফপ্রধান ব্যক্তিদের পক্ষে অহিতকারক।
২৩ চিতল মাছ:
চিতল মাছ সংস্কৃতে চিত্রফল মৎস্য নামে পরিচিত যা সুস্বাদু, গুরু অর্থাৎ মধুররস, স্নিগ্ধ, শুক্রজনক ও বলপ্রদ।
২৪ বেলে মাছ:
এই মাছ কুলিশ মৎস্য নামে পরিচিত। যথার্থ পুষ্টিগুণের পাশাপাশি এই মাছ লঘু, কষায়— মধুররস যুক্ত, বলবর্ধক, স্নিগ্ধ, রুচিকারক,বায়ুনাশক, হৃদ্য অর্থাৎ হার্টের পক্ষে উপকারী, অগ্নিদীপক গুণযুক্ত।
২৫ কালবোস মাছ:
এটি বায়ু মাছ নামেও পরিচিত যা গুণে মধুররস, শুক্রজনক, পুষ্টিকারক, ধাতুবর্ধক।
২৬.শোল মাছ:
এই মাছ মধুররস যুক্ত, মল সংগ্রাহক, রুক্ষ, রক্তপিত্ত নাশক ও গুরু। আয়ুর্বেদে মাছের গুণাগুণ চিংড়ি বলবর্ধক, রুচিকর, মধুররস, শুক্রজনক, কফ ও বাতবর্ধক কিন্তু মেদ পিত্ত ও রক্তদোষ নাশক।
যাঁদের এলার্জির সমস্যা রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে চিংড়ি সেবনের বিধিনিষেধ মেনে চলা উচিত।
২৮ শকুলী মাছ:
শকুলী মাছ পিপলেশোল নামে পরিচিত। অনেকটা রুই মাছের মতো দেখতে এটি গুণে গুরুপাক, ভেদক অর্থাৎ মলের বেগ বাড়ায় এবং দোষ প্রকোপ করে।
২৯ চাঁদা মাছ:
চাঁদা মাছ মধুররস,বলবর্ধক ও অনভিসন্ধি।
৩০ খয়রা মাছ:
খয়রা মাছ গ্রামবাংলায় করতি মাছ নামে এবং আয়ুর্বেদে চম্পকুন্দমৎস্য নামে পরিচিত। বহুগুণসম্পন্ন এই মাছ মূলত বলবর্ধক, শুক্রজনক, স্নিগ্ধকারক, বাত এবং পিত্তনাশক, মধুররস, বৃষ্য অর্থাৎ শারীরিক স্ফূর্তি ও বল বর্ধক এবং অন্যদিকে শ্লেষ্মা বাড়ায়।
৩১ দণ্ডিক অর্থাৎ ডানকুনি মাছ:
ত্রিদোষনাশক গুণযুক্ত ডানকুনি মাছ তিক্তরস, লঘু।
৩২ মৌরলা মাছ:
মলঙ্গী বা মৌরলা মাছ মধুররস, হৃদ্য অর্থাৎ হার্টের পক্ষে ভালো, বাতনাশক, শ্লেষ্মাকারক এবং গুরু।
৩৩ ফলুই মাছ:
এটি মধুররস, স্নিগ্ধ, বলকারক, শুক্রবর্ধক কিন্ত গুরুপাক।
৩৪ খলিশা মাছ:
খলিশা লঘু ও রুক্ষ গুণযুক্ত, বলকারক, ত্রিদোষ সমনের পাশাপাশি শূল ও আমনাশক।
৩৫ ল্যাটা মাছ:
লঘু ও কষায় মধুররস গুণযুক্ত, রুক্ষ এবং শীত প্রকৃতির।
৩৬ পাবদা মাছ:
পর্ব্বতো বাতহা স্নিগ্ধ: শুক্রলো বলবর্ধন:।।
অর্থাৎ পাবদা মাছ বাতনাশক, স্নিগ্ধ, শুক্রজনক ও বলবর্ধক।
৩৭ বাচা মাছ:
বাচামাচ গুণে মধুররস, গুরু, স্নিগ্ধ, শ্লেষ্মাকর ও বাত পিত্ত নাশক।
৩৮ পাঁকাল মাছ:
এই মাছ সেবনে অজীর্ণ রোগ হয়,বেশ গুরুপাক এবং শরীরে শ্লেষ্মার প্রকোপ হয় তাই এই মাছ সেবন শরীরের পক্ষে অহিতকারক।
৩৯ মাছের ডিম:
অত্যন্ত শুক্রকর অর্থাৎ যাদের শুক্রস্বল্পতা জনিত বিবিধ সমস্যা রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে পথ্য। স্নিগ্ধ গুণযুক্ত, পুষ্টিকারক, লঘু, বলবর্ধক, মেহরোগনাশক। যারা কৃ শ অর্থাৎ রোগা চেহারার তাদের ক্ষেত্রে মাছের ডিম সেবন বেশ উপকারী কারন এটি কফ ও মেদবর্ধক।
৪০ শুঁটকি মাছ / শুষ্ক মৎস্য:
আয়ুর্বেদ দ্রব্যগুণ মতে এটি বলকারক হলেও দুষ্পাচ্য অর্থাৎ সহজে হজম হয় না এবং এটি মলবদ্ধতাকারক।
যাদের হজমের গোলযোগ ও কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা রয়েছে সেক্ষেত্রে শুঁটকি সেবন একেবারেই নৈব নৈব চ।
৪১ দগ্ধ মৎস্য:
দগ্ধমৎস্য অর্থাৎ পোড়া মাছ গুণে শ্রেষ্ঠ, পুষ্টিকারক ও বলবর্ধক।