


রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়: সম্পর্কে তৃতীয় ব্যক্তি। শুনেই রে রে করে ওঠেন অনেকে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, তৃতীয় কেউ এলে জানবেন, তাঁর জায়গা আগে থেকেই তৈরি ছিল। আমাদের সমাজ প্রায় সবসময় তৃতীয় ব্যক্তিকে ‘ভিলেন’ বলে ধরে নেয়, যেন যাবতীয় প্রতিরোধের দায় তাঁর! কিন্তু আদপে এই তৃতীয় জনের কোনও দোষ থাকে না। তৃতীয় ব্যক্তি কখনওই কারও জীবনে ‘তৃতীয়’ হয়ে আসেন না। যাঁর জীবনে আসেন, তিনিও তাঁকে ‘তৃতীয়’ ভাবেন না। যে কোনও সম্পর্কের ক্ষেত্রেই এটি সত্য। তৃতীয় জনের চলে আসার সুযোগ কিন্তু প্রথম দু’জন মিলেই করে দেন। আসলে ‘স্পেস’ বলে যে বিশেষ শব্দটি সম্পর্কের অভিধানে আছে, তার কোনও গুরুত্ব আমরা দিই না।
দেখুন, আমি নিজেই অনেক কষ্টে আমার বিবাহিত জীবনকে সামলাতে পেরেছি। তাই তৃতীয় ব্যক্তি নিয়ে কাউকে টিপস দেওয়ার আমি কেউ নই। তবে নিজের জীবনের পথে চলতে গিয়ে যা বুঝেছি, সেটুকু ভাগ করতে পারি। আমাদের সম্পর্কটিও একজন ‘তৃতীয় ব্যক্তি’-ই সামলেছে, তার নাম সহজ বন্দ্যোপাধ্যায়। সহজ প্রিয়াঙ্কা ও আমার সন্তান। তার প্রবেশ, তার উপস্থিতি আমাদের সম্পর্ককে এত দৃঢ় করেছে, যা আমরা দু’জনেও কখনও পারিনি। আমার কাছে সম্পর্কে তৃতীয় ব্যক্তিটি তাই আশীর্বাদের মতো। কে কীভাবে একটি সম্পর্কের ভাঙনকে দেখবেন, কে কীভাবে তার মেরামত করবেন, কখন সতর্ক হবেন— এই সবটুকুই ব্যক্তিবিশেষে ভিন্ন হয়। আমি এমন কয়েকজনকে চিনি, যাঁরা রাতের ঝগড়াটুকু রাতে মিটিয়ে তবে ঘুমাতে যান। ঝগড়াকে বাসি করেন না। কেউ আবার রাতে ঝগড়া করে হয়তো দু’পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়লেন, সকালে উঠে ফের সব স্বাভাবিক। কেউ আবার একটা ইস্যুতে দিনের পর দিন দূরত্ব বাড়িয়ে চলেছেন। কাজেই কার কোন রেসিপিতে কাজ হবে, এটা একান্তই তাঁদের ব্যক্তিগত বিষয়।
আমার ও প্রিয়াঙ্কারও সম্পর্কের একটা রেসিপি আছে। ওর সঙ্গে দ্বিতীয়বার সংসার করতে এসে বুঝেছি, কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে না বলে সরাসরি বলা ভালো। তাই আমি ও প্রিয়াঙ্কা এখন আর কোনও সমস্যা কার্পেটের নীচে লুকিয়ে রাখি না। একটি কারণে তৈরি খারাপলাগাকে ওপর ওপর লুকিয়ে রেখে, পরে সেই খারাপলাগাকে অন্য কোনও ঘটনায় প্রকাশ করার বোকামি আর করি না। যা নিয়ে সমস্যা, তা নিয়ে সরাসরি কথা বলি। এছাড়া কোনও বিষয়ে সাধ্যের বাইরে গিয়ে প্রতিশ্রুতি দিই না। সম্পর্কের শুরুতে বেশিরভাগ পুরুষ ‘ওভারকমিট’ করে ফেলেন, পরে কার্যক্ষেত্রে প্রেম একটু পোক্ত ও পুরনো হয়ে গেলে, ছেলেটি মেয়েটিকে ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড’ করে নেন। তখন সেসব প্রতিশ্রুতি পালনে অনীহা দেখা দেয়। এতে আরও জটিলতা বাড়ে। ব্যক্তিগতভাবে আরও একটি বিষয়ে সতর্ক হয়েছি। প্রোডিউসার বা ফ্লোরের কেউ দুটো খারাপ কথা বললে বা অপমান করলে, সেই রাগ পুষে রেখে বাড়ি ফিরে মা বা
বউয়ের উপর অকারণে রাগ দেখাই না আর। এই অভ্যাস থেকে আমি সম্পূর্ণ বেরিয়ে এসেছি। এখন যেভাবেই হোক, যাঁর উপর রাগ, তাঁর উপরেই তা প্রকাশ করি। তাতে সম্পর্ক খারাপ হলে হোক! কিন্তু কিছুতেই সেই রাগের ভার আর বাড়ি অবধি টানি না।
আমাদের সম্পর্ক জোড়া লাগার মূল কারিগর আমাদের সম্পর্কটিই। প্রিয়াঙ্কার যখন ১৩ বছর বয়স, তখন থেকে আমি ওকে চিনি, ও আমাকে চেনে আমার ১৯ বছর বয়স থেকে। তাই আমরা শুধুই প্রেমিক-প্রেমিকা বা স্বামী-স্ত্রী ছিলাম না। দূরত্ব বাড়লেও এক অদ্ভুত নির্ভরশীলতা ছিল আমাদের। যে পাঁচ বছর আলাদা ছিলাম, তখন প্রিয়াঙ্কাকে একটু দূর থেকে দেখে বুঝতে পারলাম, প্রিয়াঙ্কা কী অপরিসীম স্ট্রাগল করছে! এই ইন্ডাস্ট্রিতে একা মেয়ে হয়ে লড়াই করে টিকে থাকা থেকে শুরু করে সন্তান মানুষ করা— সবেতেই ও পারফেক্ট! এত ভালো ও পূর্ণ মা আমি দেখিনি! ওই পাঁচ বছরে প্রিয়াঙ্কা একবারের জন্যও সহজকে ওর বাবার সম্পর্কে বিষিয়ে তোলেনি। অথচ ওর কাছে সে সুযোগ পর্যাপ্ত ছিল। আজ সহজের সঙ্গে আমার যে স্বাস্থ্যকর-সুন্দর সম্পর্ক, তার পুরো কৃতিত্ব ওর মায়ের। প্রিয়াঙ্কা নিজেও খুব ভালো সন্তান। ওর প্রতি আমার সম্মানও এই সামলে নিতে পারার অন্যতম কারণ।
যখন আমরা আলাদা ছিলাম, তার একটা পর্যায়ে আমার জীবনেও তৃতীয় ব্যক্তি এসেছেন। ওই সময় আসলে আমার ও প্রিয়াঙ্কার মধ্যে এমন কিছু হয়েছিল, বিশেষ দু’-একটি কারণে এতই দূরত্ব বেড়েছিল যে তৃতীয় ব্যক্তি আসার মতো পরিস্থতি তৈরি হয়। প্রেম এলে, তা যে কারণেই আসুক, ভাসিয়েই নিয়ে যায়। প্রেমের কোনও ঔচিত্যবোধ নেই। প্রেম কেবল প্রেমই বোঝে। মাথায় নানা হিসেব নিয়ে কোনও সম্পর্ক হয় না। আমার জীবনে কেউ এলে তিনি তাঁর নিজস্ব গুরুত্ব নিয়েই এসেছিলেন। তবে সব সম্পর্কই একটি এক্সপায়ারি ডেট নিয়ে আসে। তিনি যখন এলেন, তখন তাঁর জায়গা ছিল, পরে সেই জায়গাটি ভরাটও হয়ে গেল, আবার তিনিও নিজের জীবনের পথে এগলেন। হয়তো এভাবেই সবটা হয়েছে। তবে
আমি কাউকে ঠকিয়ে পিছিয়ে আসিনি, এটুকু বলতে পারি। প্রথম দিন থেকেই জানিয়ে রেখেছিলাম যে আমি আর দ্বিতীয়বার বিয়ে করব না। কারণ আমার একটি সংসারের অভিজ্ঞতা আছে ও এক সন্তান রয়েছে। তাই সংসার বা বংশবৃদ্ধি কোনওটি নিয়েই আমার আর আগ্রহ বা তাগিদ ছিল না। সহজের জন্যই প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল এবং আমার তৎকালীন প্রেমিকা অবশ্যই প্রথম থেকেই তা জানতেন। এত শর্ত ও নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে কেউ কেনই বা আমার সঙ্গে থাকবেন! আসলে কিছু সম্পর্কের কোনও ভবিষ্যৎ থাকে না, এটা দ্রুত বুঝে যাওয়াই ভালো।