


সঙ্গীতার ইচ্ছেডানা
নাম তাঁর সঙ্গীতা টুডু, বয়স আঠারো। পুরুলিয়া জেলার ঝালদা ২ নম্বর ব্লকের ছোট্ট গ্রাম ডামরুঘুটুতে বাস। বিএ প্রথম বর্ষের ছাত্রী এখন। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘ইকুইডাইভার্সিটি ফাউন্ডেশন’-এর ‘ইচ্ছেডানা’ ফেলোশিপের একজন ফেলো তিনি। সঙ্গীতার দাবি, এই ফেলোশিপের মাধ্যমে নিজের ইচ্ছে প্রকাশ করা এবং এলাকার মানুষকে সচেতন করা সম্ভব হয়েছে। অষ্টাদশীর মনে হয়েছে, পুরুলিয়ার টাটুয়ারা ও ডামরুঘুটু সাধারণ দুটো গ্রাম, যেখানে মেয়েদের স্বপ্ন দেখাটা যেন অপরাধ। খুব অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় গ্রামের মেয়েদের। গ্রামে যেন আর কোনও মেয়ের বাল্যবিবাহ না হয় সেই চেষ্টাতেই ব্রতী সঙ্গীতা।
কীভাবে কাজ করেন তিনি? সঙ্গীতার কথায়, ‘টাটুয়ারা ও ডামরুঘুটু গ্রামে বাল্যবিবাহ রোধের জন্য মেয়েদের দল গঠন করি। মেয়েদের নিয়ে ফুটবল টিম তৈরি করি। কারণ, আমি বিশ্বাস করি খেলাধুলো আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, স্বপ্ন দেখতে শেখায়। একটা সময় ছিল, যখন ছেলেরাই ফুটবল খেলত। আর মেয়েরা ঘরের কোণে বসে থাকত। সেই ধারণাটা বদলাতে চেয়েছি। অভিভাবকদের বুঝিয়েছি, সমাজের মানুষদের বুঝিয়েছি, এমনকী যাদের বিয়ের ঠিক হয়ে গিয়েছিল, তাদের পরিবারকেও বুঝিয়েছি।’
ইচ্ছেডানা-র কাজ করতে গিয়ে অনেক পরিবর্তনও এসেছে সঙ্গীতার জীবনে। গ্রামের অপরিচিত মানুষজন বা আশেপাশের গ্রামের মানুষের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। অনেক কিশোরীর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে। তিনি দেখেছেন, আগে বন্ধুরা তাঁর কথার তেমন গুরুত্ব দিত না। এখন তারা তাঁর কথা শোনে, গুরুত্ব দেয়। তাঁকে ভালোওবাসে। ফেলোশিপ পাওয়ার পর থেকে অভিভাবকদের সঙ্গে যে কোনও বিষয়ে আলোচনা করতে পারেন সঙ্গীতা। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই কাজের মাধ্যমে নিজের পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছেন।
তবে কাজ করতে গিয়ে বাধাও এসেছে। প্রথমদিকে গ্রামের মানুষদের বোঝানো, মেয়েদের অভিভাবকদের রাজি করানো, সবটাই ছিল চ্যালেঞ্জিং। তাঁর কথায়, ‘যখন মেয়েদের মিটিংয়ে ডাকতাম, তাদের অভিভাবকরা আসতে দিতেন না। বলতেন, এত কাজ পড়ে রয়েছে, কোথায় যাচ্ছিস? তখন তাদের বোঝাতাম, দু’-আড়াই ঘণ্টার মিটিং, আলোচনা শেষ হলেই তো বাড়ির কাজ করতে পারবে। অনেক বুঝিয়ে তাদের রাজি করাতাম। গ্রামের বিয়ে আটকাতে গিয়ে রাজনৈতিক বাধাও এসেছে। কিন্তু থেমে থাকিনি। আমার বিশ্বাস মেয়েরা যদি শিক্ষিত হয়, নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে, তাহলে সমাজ বদলাবে। তাই সবাইকে বলতে চাই, বাল্যবিবাহ বন্ধ করুন, মেয়েদের শিক্ষিত করুন, তাদের স্বপ্ন দেখতে দিন।’
অক্ষরের আলো
বীরভূমের থিবা গ্রাম পঞ্চায়েতের দত্ত বগতোড় গ্রামে থাকেন আফসানা খাতুন। বয়স সতেরো। ক্লাস টুয়েলভে পড়েন। তিনিও ইকুইডাইভার্সিটি ফাউন্ডেশনের ইচ্ছেডানা ফেলোশিপের একজন সদস্য। তাঁর স্বপ্ন, গ্রামের বয়স্ক মহিলারাও শিক্ষার আলোয় আলোকিত হন। আফসানা জানিয়েছেন, ইচ্ছেডানা ফেলোশিপ তাঁর কাছে শুধু একটা প্রোজেক্ট নয়, এটা তাঁর স্বপ্নপূরণের জায়গা।
‘বয়স্ক সাক্ষরতা’ নিয়ে আফসানার প্রোজেক্ট-এর উদ্দেশ্য পরিণত নাগরিকদের পড়াশোনা শেখানো, সমাজে তাঁদের উন্নীত করা। গ্রামের ২০-৫৫ বছর বয়সি ৩০ জন মহিলাকে লেখাপড়া শেখান তিনি। তাঁর কথায়, ‘শিক্ষার কোনও বয়স নেই। কীভাবে নিজের নাম লিখতে হয়, চিঠি পড়তে হয়, ফর্ম ভরতে হয়— ওঁদের শেখাই। গ্রামের মানুষের একটা ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে বয়স্ক মানে তাঁর আর পড়াশোনা শিখে কিছু হবে না। তাঁদের বোঝাতে চাই, যে কোনও বয়সেই শেখা সম্ভব।’
আফসানাকে প্রথম দিকে গ্রামের অনেকে বলেছিলেন, ‘এই বয়সে আর লেখাপড়া করে কী হবে?’ কেউ কেউ আবার বলতেন, ‘এইটুকু মেয়ে আমাদের আবার কী শেখাবে?’ স্কুলের শিক্ষক প্রথমে তাঁকে ক্লাস নেওয়ার অনুমতি দিলেও পরে বারণ করেন। এমন নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও দমে যাননি তিনি। জানতেন, কাজটা কতটা জরুরি। তাকে সাহায্য করেছে গ্রামের পঞ্চায়েত, ইকুইডাইভার্সিটি ফাউন্ডেশন, রাজনৈতিক নেতা এবং শিক্ষকরা।
কাজ যত এগিয়েছে, সাফল্যও এসেছে। আফসানার কথায়, ‘আজ আমি গর্ব করে বলতে পারি, আমার এলাকার মানুষ নিজেদের নাম লিখতে পারেন, চিঠি পড়তে পারেন, ফর্ম পূরণ করতে পারেন। তাঁরা এখন নিজেদের অধিকার সম্পর্কেও সচেতন। আমার কাজের জন্য পঞ্চায়েতের স্মারক সম্মাননা পেয়েছি, স্পিকার হিসেবে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। দক্ষতা, সাহস আর আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, এলাকায় নিজের পরিচয়ে পরিচিত হয়েছি। ইচ্ছেডানা ফেলোশিপ আমার পড়াশোনায় কাজে লেগেছে।’
অদম্য নয়না
সুন্দরবনের পাথরপ্রতিমা ব্লকের দক্ষিণ গঙ্গাধরপুর অঞ্চলের কন্যা নয়না বণিক এবার উচ্চমাধ্যমিক দিয়েছেন। ইকুইডাইভার্সিটি ফাউন্ডেশন-এর ইচ্ছেডানা ফেলোশিপে কাজ করছেন তিনিও। তাঁর প্রকল্পের উদ্দেশ্য মেয়েদের আত্মরক্ষার কৌশল শেখানো। নয়না বলছেন, ‘ইচ্ছেডানা ফেলোশিপ নিজেকে চেনার একটা জায়গা, আত্মবিশ্বাস জাগানোর উপায়। এই ফেলোশিপের মাধ্যমে ১০-১২ জন মেয়েকে স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন দেখাতে পেরেছি, তাদের আত্মরক্ষার কৌশল শিখিয়েছি।’
কীভাবে কাজ করেন তিনি? ‘যখন আত্মরক্ষার কৌশল শিখতে যেতাম, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন নানা কথা বলত। ট্রেনিং সেন্টারে ছেলেদের সঙ্গে শিখতে হতো বলে লোকজন বলত, এই মেয়ে আর বাড়িতে টিকবে না!’
বাধার উল্টো পিঠে থাকে ভালোবাসাও। বাড়ির সবাই তাঁকে বাইরে গিয়ে ট্রেনিং নিতে উৎসাহ দিয়েছেন। তাঁর মন্তব্য, ‘গত ছ’মাসে ৯-১৮ বছর বয়সি প্রায় ৫০ জন মেয়েকে জিমন্যাস্টিক শিখিয়েছি। রাস্তায় মেয়েদের হেনস্তার মোকাবিলা করতে আত্মরক্ষার কৌশল শিখতেই হবে।’
ফেলোশিপে কাজ করতে করতে আত্মবিশ্বাস, পরিচিতি, কাজের দক্ষতা বেড়েছে নয়নার। তিনি বলেন, ‘এখন অনেকে আমাকে চেনে, আমি স্বনির্ভর, সেটা জানে। যারা আগে বাধা দিত, তারাই এখন সমর্থন করে। বাবার রোজগার নেই, তাই ফেলোশিপের স্টাইপেন্ড দিয়েই পড়াশোনা চালাই।’
প্রথম দিকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কথা বলতে অসুবিধা হতো। কেউ রাজি হতো না, ছাত্রী পাওয়াই কঠিন ছিল। পরে নয়না তাঁর মেন্টরকে সঙ্গে নিয়ে সার্ভে করেছেন এবং বুঝিয়েছেন আত্মরক্ষার কৌশল শিখে মেয়েদের কী লাভ হবে। এরপর অভিভাবকেরা তাঁদের মেয়েকে ছেড়েছেন। ক্লাস দেখে পরে বলেছেন, ‘ওদের আরও শেখান।’
নয়না মনে করেন, মেয়েদের স্বনির্ভর হওয়া উচিত যাতে কারও কাছে হাত পাততে না হয়। মেয়েকে কলেজে ভর্তি করা বা পড়াশোনার খরচ চালানো নয়নার বাবার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তিনি ঠিক করেছেন, রেজাল্টের পর রোজগারের চেষ্টা করবেন এবং পড়াশোনাও করবেন। এখন শাড়িতে জরি লাগানোর কাজ শুরু করেছেন। তাঁর বয়সি সব মেয়েকে নয়না বলতে চান, ‘অল্প বয়সে বিয়ে না করে স্বনির্ভর হও, নিজের পরিচয় তৈরি করো। বিয়ে যে কোনও সময় করা যাবে। অন্যের পরিচয়ে না বেঁচে নিজের পরিচয়ে বাঁচো। কারও মেয়ে, কারও বউ, কারও বৌমা না হয়ে কাজ করে নিজের পরিচয় তৈরি করো।’