


অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: পাড়ায় সমাধান কর্মসূচিতে একটি পঞ্চায়েতে রাস্তায় আলো বসানোর ২০টি কাজের তালিকা গৃহীত করা হয়েছিল। আশ্চর্যজনকভাবে সবক’টিই প্রকল্প বাস্তবায়নে বরাত পেয়েছেন জেলার এক প্রভাবশালী নেতার ঘনিষ্ঠ ব্লক সভাপতির শ্যালক! এই স্বজনপোষণের অভিযোগ ছড়িয়ে পড়তেই শোরগোল পড়েছে নদীয়া জেলার রাজনৈতিক মহলে। তোলপাড় চলছে তৃণমূলের অন্দরেও। দলের একটা বড় অংশ বিষয়টিকে ভালোভাবে নিচ্ছেন না। সবমিলিয়ে ভোটের ঠিক আগে কৃষ্ণনগরের এই ‘টেন্ডার কেলেঙ্কারি’ শাসক শিবিরকে বিড়ম্বনায় ফেলবে মনে করা হচ্ছে। যদিও ব্লক প্রশাসনের তরফে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোনো অনিয়ম হয়নি। স্বচ্ছতার সঙ্গেই সবকিছু হয়েছে।
কৃষ্ণনগর দক্ষিণ বিধানসভার অন্তর্গত কৃষ্ণনগর-২ ব্লকের নওপাড়া-২ পঞ্চায়েতে। সম্প্রতি পাড়ায় সমাধানে গৃহীত প্রকল্পের কাজে ইস্যু হওয়া অর্ডার কপি সামনে এসেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, বিশেষ এক ব্যক্তি পঞ্চায়েতের রাস্তায় আলো বসানোর সমস্ত কাজে বরাত পেয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, আদৌও কি টেণ্ডার প্রক্রিয়া স্বচ্ছতার সঙ্গে করা হয়েছিল? অন্যদিকে, তৃণমূল পরিচালিত ওই পঞ্চায়েতে আবার প্রধান ও স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের বনিবনার অভাবে সার্বিক উন্নয়নের কাজ স্তব্ধ। এর পিছনেও সরকারি কাজে নেতার পরিবারের সদস্যদের একচেটিয়া প্রভাব খাটানোর বিরুদ্ধে প্রধানের আপত্তি কি অনুঘটকের কাজ করেছে? এমন প্রশ্নও উঠে আসছে বিভিন্ন মহল থেকে।
জেলাজুড়ে উন্নয়নমূলক কাজে পঞ্চায়েতের টাকা খরচের নিরিখে পিছিয়ে থাকা পঞ্চায়েতগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নওপাড়া-২ পঞ্চায়েত। বিষয়টি ইতিমধ্যেই প্রশাসনের নজরে এসেছে। কাজ না করায়, পঞ্চায়েতের কর্মচারীদেরও তুলেও নেওয়া হচ্ছে প্রশাসনের তরফে। তার মধ্যেই রাস্তায় আলোর কাজে টেন্ডার অনিয়মের মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে এল। পঞ্চায়েতের তৃণমূল প্রধান কাকলি বিশ্বাস বলেন, ‘পঞ্চায়েতে কাজ করার জন্য কয়েকদিন আগে টেন্ডার করা হয়েছিল। টায়েড ফাণ্ডের কাজ করার জন্য পঞ্চায়েত রেজোলিউশন হয়েছিল। কিন্তু, কিছু নেতৃস্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়াকে ফ্লপ করানো হয়। কাউকেই টেন্ডার ফেলতে দেওয়া হয়নি। বিষয়টি আমি সর্বস্তরে জানিয়েছি। কারণ, পঞ্চায়েতে অনেক টাকা পড়ে। অথচ, কাজ হচ্ছে না। বর্তমানে উন্নয়নের কাজ পুরোপুরি স্তব্ধ।’ জানা গিয়েছে, নওপাড়া-২ পঞ্চায়েতে প্রায় ৫২ লক্ষ টাকা পড়ে আছে। তার মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের কিছু টাকা আছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পুরো টাকাটাই অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে।
এদিকে, গতবছর আমাদের পাড়া কর্মসূচিতে জেলাজুড়েই কয়েক হাজার প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন হয়েছে নদীয়া জেলাজুড়ে। তাতে গত বছর সেপ্টেম্বরে মাসে ইস্যু হওয়া একটি অর্ডার কপিতে দেখা যাচ্ছে, নওপাড়া-২ পঞ্চায়েতে ২০টি প্রকল্পের মধ্যে প্রতিটি বাস্তবায়নের এজেন্সি হিসেবে একজন ব্যক্তির নাম রয়েছে। দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সংশ্লিষ্ট ওই ব্যক্তি আবার কৃষ্ণনগর-২ ব্লকের তৃণমূলের ব্লক সভাপতির শ্যালক। এতেই টেন্ডার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে। এনিয়ে ব্লক সভাপতি সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘যদি কিছু হয়ে থাকে, সেটি প্রশাসন বলতে পারবে। কারণ ওয়ার্ক অর্ডার ব্লক অফিস থেকেই হয়ে থাকে। তবে, আমি খোঁজ নিয়ে জানলাম, পঞ্চায়েতে দেড় কোটি টাকার কাজ হয়েছে। তার মধ্যে তন্ময় চট্টোপাধ্যায় শুধুমাত্র লাইটের কাজ পেয়েছেন। সেটা পাঁচ লাখ টাকার মতো হবে। এখানে আমার প্রভাব খাটানোর অভিযোগ ভিত্তিহীন।’
কৃষ্ণনগর-২ ব্লকের বিডিও অনুজ সিকদার বলেন, ‘আমাদের ব্লকে সবটাই প্রথা মেনে অনলাইন টেন্ডার হয়। যাঁরা অংশগ্রহণ করেন, তাঁদের মধ্যে যিনি যোগ্য, তাঁকে বিবেচনা করা হয়।তিনিই কাজ পান। এখানে স্বজনপোষণের কোনোও সুযোগ নেই। কাজ অত্যন্ত পরিস্কার হয়েছে। তবে, উন্নয়নমূলক কাজে গত অর্থবছরের কোনো টেন্ডার পঞ্চায়েত করেনি।’