


কাজলকান্তি কর্মকার, ঘাটাল: অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার অন্যতম প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা দাসপুরের তিয়রবেড়িয়ার পিতলের রথ। প্রায় ৮০ মন পিতল দিয়ে তৈরি এই রথ আনুমানিক ১০৫ বছরের পুরনো। পূর্বে হাতে গোনা কয়েকটি রথ থাকলেও, বর্তমানে জেলা বিভক্ত হওয়ায় এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রথের সংখ্যাও বেড়েছে। মেদিনীপুর জেলায় তিয়রবেড়িয়া ছাড়া আর কোথাও এত বড় পিতলের রথ দেখতে পাওয়া যায় না।
এই রথের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামন্ত পরিবারের নাম। জানা যায়, ঘাটালের বলরাম সামন্ত তিয়রবেড়িয়ায় এসে কলা পাতা কেটে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁর দ্বিতীয় পক্ষের পুত্র ত্রৈলোক্যনাথ সামন্ত ও রমানাথ সামন্ত কলকাতার বড়বাজারে ভুসিমালের ব্যবসা করে বিপুল অর্থ উপার্জন করেন। তাঁরা পূর্ব মেদিনীপুরের মালিদা গ্রামে প্রায় এক হাজার বিঘা জমি কিনে জমিদারি শুরু করেছিলেন।
ওই পরিবারের প্রবীণ সদস্য অসিতকুমার সামন্ত ও রামকৃষ্ণ সামন্তের কথায়, তিয়রবেড়িয়ায় সামন্ত পরিবারের পাশেই এক ব্রাহ্মণ পরিবারে কোষ্ঠী পাথরের কৃষ্ণ মূর্তি ‘মদনগোপাল জিউ’ তাঁদের কুলদেবতা ছিলেন। ব্রাহ্মণ পরিবার আর্থিক সংকটে পুজো চালাতে অক্ষম হলে, জমিদার ত্রৈলোক্যনাথ ও রমানাথ সেই পুজোর দায়িত্ব নেন। এরপর তাঁরা অষ্টধাতুর রাধার মূর্তি, রঘুনাথ জিউ শালগ্রাম শিলা এবং গড়ুরদেব স্থাপন করেন। অবশেষে তাঁরা এই সুবিশাল পিতলের রথ নির্মাণ করেন। লোকমুখে প্রচলিত ছিল, ‘লঙ্কা বেচে রথ কিনলেন ত্রৈলোক্যনাথ’, যা তাঁর ভুসিমালের ব্যবসায় অর্জিত সম্পদের ইঙ্গিত দেয়। প্রাথমিকভাবে তিনি আড়খানায় রথ স্থাপনের পরিকল্পনা করলেও, পরে তিয়রবেড়িয়াতেই রথ স্থাপন করেন।
পারিবারিক ইতিহাস থেকে জানা যায়, ওই ৮০ মন পিতলের রথ সুদূর জার্মানি থেকে আনা হয়েছিল, যার স্ট্যাম্প এখনও রথের গায়ে বিদ্যমান। জার্মানি থেকে কলকাতা পর্যন্ত সম্পূর্ণ নৌপথে (গঙ্গা, রূপনারায়ণ ও দুর্বাচটি নদী হয়ে) এই পিতল আনা হয়েছিল। এক কথায় একে ‘জার্মানি রথ’ বলা হয়। রথের পাঁচটি চূড়া পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের প্রতীক, যা লাল পতাকায় সজ্জিত। মাঝের চূড়ার লাল পতাকায় হলুদ সুদর্শন চক্র আঁকা থাকে, তাই এর নাম ‘চক্রধর’। এই চূড়ায় একটি ঘণ্টা এবং উপরে গড়ুরদেব অধিষ্ঠিত থাকায় রথের নাম ‘গড়ুরধ্বজ’। প্রায় ২৫ ফুট উচ্চতার এই রথের সামনে দু’টি পিতলের ঘোড়া এবং সারথী সাত্যকী। রথের ছয়টি লোহার চাকা ষড়রিপু দমনের প্রতীক। রথ টানার সময় যে চারটি দাগ পড়ে, সেগুলি ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষের প্রতীক।
ওই পরিবারের এই প্রজন্মের সদস্য সুমন সামন্ত বলেন, আমাদের রথ হয় উৎকল মতে। রথের নাম গরুড়ধ্বজ, কারণ মাঝের চূড়ায় রথের রক্ষক গড়ুর অবস্থান করছেন। রথের উপরের চার কোণের মন্দিরে গদাধর, নিত্যানন্দ, শ্রীবাস ও অদ্বৈত আচার্যের মূর্তি রয়েছে। মাঝে কুলদেবতা মদনগোপাল জিউ, রাধারানি এবং শালগ্রাম সজ্জিত থাকে।
জমিদার ত্রৈলোক্যনাথ নিঃসন্তান হওয়ায় তাঁর ভাই রমানাথ সামন্তের দুই পুত্র দুর্লভ সামন্ত ও অমূল্য সামন্ত তাঁদের বাবা ও জেঠুর নামেই তিয়রবেড়িয়ায় একটি স্কুল (বর্তমানে জগন্নাথপুর ত্রৈলোক্য রমানাথ উচ্চ বিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেন। রথের সময় এই স্কুলকেই মাসিবাড়ি করা হয়। রথের দিন পুজোর পর দুপুর থেকে স্কুলের সামনের মাঠেই আটচালাকে কেন্দ্র করে রথ তিনবার অথবা পাঁচবার ঘোরানো হয়। পুরীর মতো উৎকল মতে নবম দিনে এখানে উল্টোরথ হয় এবং এই নয় দিন মাসি বাড়িতে ধুমধাম করে পুজো চলে। মদনগোপালকে প্রতিদিন কাঁচা আতপ চালের নৈবেদ্য ও সন্ধ্যায় মিষ্টান্ন ভোগ দেওয়া হয়। রথের নয় দিন প্রতি সন্ধ্যায় খই, মুড়কি, গজা, মুগের জিলিপি, লুচি, সুজি, মিষ্টি ও ফলের ভোগ থাকে।
এছাড়াও দাসপুর থানার খানজাপুরে একটি পুরানো রথ রয়েছে। ওই গ্রামের বাসিন্দা প্যালারাম ন্যায়ভূষণ ১৭৪১ সালে ওই রথ প্রতিষ্ঠা করেন। এই রথ উপলক্ষে সাত দিনের মেলা হয়। বিশালাকার এই রথ টানা দেখার জন্য প্রচুর মানুষের ভিড় হয়। ওই থানারই হরিরামপুরের গ্রামবাসীদের রথ এবং চট্টোপাধ্যায় পরিবারের রথও বেশ প্রাচীন।