


সংবাদদাতা, রামপুরহাট : স্বাধীনতা দিবসের ঠিক আগের দিন কিছু ঘণ্টা আগেই বীরভূমে ফের বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়াল শুক্রবার। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে রামপুরহাট থানার আয়াস গ্রামের বাথানপাড়ায় অভিযান চালিয়ে থরে থরে সাজানো বিস্ফোরক বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ। এই ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে বাড়ির মালিক তথা অবৈধ বিস্ফোরক কারবারি সরিফুল ইসলামকে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে আয়াস গ্রামের একটি বাড়িতে বিপুল বিস্ফোরক মজুত থাকার খবর আসে। খবর পাওয়া মাত্রই রামপুরহাট থানার একটি দল পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে। এরপর বাড়িতে তল্লাশি চালাতেই চক্ষু চড়কগাছ পুলিশ আধিকারিকদের। সরিফুলের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৩৮ কেজি জিলেটিন স্টিক এবং ৬টি ডেটোনেটিং কর্ড এক্সপ্লোসিভ ফিউজ।
তবে বীরভূমে অবৈধ বিস্ফোরকের রমরমা নতুন নয়। এর আগেও রামপুরহাটের রদিপুর ও হস্তিকাঁদা গ্রাম থেকে একাধিকবার বিপুল বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয় আন্তঃরাজ্য পাচার চক্রের এক সদস্যকে। একের পর এক বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনার জল গড়ায় এনআইএ পর্যন্ত। গত ২৮ জুলাই বাঁকুড়ার শালতোড়ায় একটি বাইকে বিস্ফোরণের সূত্র ধরে নলহাটি পাথর শিল্পাঞ্চলে এনআইএ অভিযান চালায়। সেখান থেকে প্রায় ১,০০০ কেজি (২০ ব্যাগ) অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট, ৪,০০১টি জিলেটিন স্টিক ও প্রচুর ডিটোনেটর উদ্ধার হয় এবং মূল অভিযুক্ত মহম্মদ রাকিব শেখকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর ঠিক চারদিনের মাথায় লক্ষণমারা গ্রাম থেকে বিস্ফোরক উদ্ধার করে পুলিশ এবং গ্রেপ্তার করা হয় ফুলবাস শেখ নামের এক কারবারিকে।
অবৈধ কারবারের মূল শেকড় কতটা গভীরে, তা স্পষ্ট হয় সম্প্রতি নলহাটির বৈধ বিস্ফোরক কারবারি শাহে আলম ওরফে বিকি ও তাঁর সহযোগীদের ওপর দুষ্কৃতীদের গুলিবর্ষণের ঘটনায়। এনআইএ ও পুলিশের ইনফর্মার সন্দেহে বিকি ও তাঁর দুই সঙ্গীকে লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলি চালানো হয় বলে পরিবারের তরফে অভিযোগ ওঠে। সেই ঘটনায় পুলিশ এখনও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার রাতে মল্লারপুরের কোটগ্রামের একটি মাটির বাড়ির চিলেকোঠা থেকে তিন ব্যাগ ভর্তি তাজা বোমা উদ্ধার করেছে পুলিশ। বাড়ির মালিক তথা অভিযুক্ত কাজী জহিরুদ্দিনের খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ। এলাকাটি ঘিরে রেখে খবর দেওয়া হয়েছে বম্ব স্কোয়াডকে। পুলিশ জানিয়েছে, এর আগে ২০২১ বিধানসভা নির্বাচন পরবর্তী সময়ে এই গ্রামের বিজেপির বুথ সভাপতি শেখ জাকির হোসেনকে খুনের অভিযোগে সিবিআইয়ের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিল জহিরুদ্দিন, এছাড়াও মল্লারপুর থানায় তার নামে একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের বিস্ফোরক দাবি, এই বেআইনি কারবারের পেছনে কাজ করছে এক আন্তর্জাতিক ও আন্তঃরাজ্য পাচার চক্র। তেলেঙ্গানা থেকে আসানসোল ও ঝাড়খণ্ড সীমানা পেরিয়ে চোরাপথে বীরভূমে নিয়ে আসা হচ্ছে জিলেটিন স্টিক ও ডিটোনেটর।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, ২০১৭ সালে পরিবেশ আদালতের নির্দেশে ২১৭টি খাদানের মধ্যে ২১১টি বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হলেও বাস্তবে বেশিরভাগই বেআইনিভাবে চলছে। আর খাদান সচল রাখতেই বিস্ফোরকের এই বিপুল চাহিদা। সেখান থেকে বোমা তৈরির উপকরণ খুব সহজেই চলে আসে দুষ্কৃতীদের হাতে। তাঁদের মতে, প্রশাসনের একটি অংশের ‘অদৃশ্য সেটিং’-এর কারণেই এই কারবার রমরমিয়ে চলছে।
এদিকে উদ্ধার হওয়া এই বিপুল বিস্ফোরক কেবল খাদানের কাজেই ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল, নাকি এর নেপথ্যে কোনো বড়সড় নাশকতার ছক লুকিয়ে ছিল, তা খতিয়ে দেখছে জেলা পুলিশ। স্বাধীনতা দিবসের আগে গ্রাম থেকে এইভাবে বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়েছে এলাকা জুড়ে।