


নিজস্ব প্রতিনিধি, আসানসোল: আর কোনো রাখঢাক নয়। রানিগঞ্জের কুখ্যাত কয়লা কারবারি জয়দেব খাঁকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দিল বিজেপি। আসানসোল দক্ষিণ বিধানসভা এলাকা থেকে তাঁকে জেলা কমিটির স্থায়ী আমন্ত্রিত সদস্য করা হয়েছে। জয়দেবকে নিয়ে রাজনৈতিক ময়দানে একাধিক বার বিপাকে পড়েছে বিজেপি। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের প্রচারে অণ্ডাল বিমান বন্দরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের হাতে তাঁকে পদ্মফুল তুলে দিতে দেখা যায়। একবার কয়লা মন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বৈঠকের ছবিও ভাইরাল হয়। প্রতিবারই জয়দেব বিজেপির কোনও পদে নেই বলে দায় এড়িয়ে গিয়েছিল গেরুয়া শিবির। এবার সরাসরি সেই জয়দেবকে জেলার পদাধিকারী করা হয়েছে। বিজেপি রাজ্য সহসভাপতি অগ্নিমিত্রার বিধানসভা এলাকা থেকে তাঁকে জেলার পদে আনা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, কয়লা কারবারির কাঁধে ভর করেই কী অগ্নিমিত্রার গড় ধরে রাখতে চাইছে বিজেপি? বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য ও জেলা নেতৃত্ব তীব্র আক্রমণ করেছেন। তারা নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার আস্ফালনকে কটাক্ষ করেছে।
বিজেপি নেতা জয়দেব খাঁ বলেন, ‘আমি আগে থেকেই এই পদে ছিলাম। এবারই প্রথম তা প্রকাশ্যে আনা হয়েছে। বিজেপিতে যোগ দেওয়ার জন্য আমাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। আমি সমাজ সেবা করি। কেউ আমাকে কয়লা মাফিয়া বললে আমি কী করতে পারি!’ অগ্নিমিত্রা পল বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে বলব।’ বিজেপির জেলা সহ-সভাপতি তাপস রায় বলেন, ‘সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত যা বলার জেলা সভাপতি বলবেন।’ জেলা সভাপতি দেবতনু ভট্টাচার্যকে একাধিক বার ফোন করা হলেও তাঁর কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
রানিগঞ্জের বক্তারনগর এলাকার বাসিন্দা জয়দেব। এখন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। অভিযোগ, লালার কয়লা সিন্ডিকেটের আমলে রানিগঞ্জ এলাকায় কয়লা কারবারের নিয়ন্ত্রক ছিলেন তিনি। একাধিক কেন্দ্রীয় সংস্থা তাঁর বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ থেকে সিআইডি—বিভিন্ন সংস্থাও তাঁর বিরুদ্ধে বহু মামলায় তদন্ত শুরু করে। শুধু মাত্র রানিগঞ্জ থানাতেই তাঁর নামে সাতটি মামলা রয়েছে। কয়লা ও বালি চুরি ছাড়াও একাধিক অপরাধে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এহেন প্রভাবশালী কয়লা কারবারির সঙ্গে বিজেপি নেতাদের ঘনিষ্ঠাতা বার বার প্রকাশ্যে এসেছে। তাতে যারপরনাই বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে দলকে। তৎকালীন বিজেপি রাজ্য সভাপতি বিজেপি বিধায়ক লক্ষ্মণ ঘোড়ুইয়ের সঙ্গে তাঁর পুজো দেওয়ার ছবি ভাইরাল হতেই তৃণমূল সরব হয়েছিল। পরবর্তীকালে দুর্গাপুরের একটি হোটেলে তৎকালীন কয়লা মন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশীর সঙ্গে তাঁর বৈঠকের ছবি ভাইরাল হয়। পরে অমিত শাহের সঙ্গে তাঁর ছবি ভাইরাল হতেই বিজেপিতে তিনি যে প্রভাবশালী, তা স্পষ্ট হয়ে যায়।
ভোটের আগে কার্যত সেই সম্পর্কে সিলমোহর দিল বিজেপি। দলীয় সূত্রে খবর, কয়লা কারবারিকে কাছে টানলে তাঁর অনুগামীদের ভিড় বিজেপিতে বাড়বে। লোকবল দেখাতেই এই সিদ্ধান্ত। এমন একটা হট-ইস্যুকে হাতছাড়া করেনি তৃণমূল। কলকাতায় তৃণমূল ভবণ থেকে সাংবাদিক সম্মেলন করে এমপি পার্থ ভৌমিক ও মন্ত্রী শশী পাঁজা জয়দেবকে সবচেয়ে বড় কয়লা মাফিয়া বলে তোপ দাগেন। তাঁরা বলেন, ‘সবচেয়ে বড় কয়লা মাফিয়াকে নিজেদের দলে নিয়েছে বিজেপি। এই বিজেপি স্বচ্ছতার কথা বলে।’ একই ইস্যুতে দুর্গাপুরে তৃণমূল জেলা কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেন জেলা সভাপতি নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী সহ জেলার শীর্ষ নেতারা। তাঁরা বলেন, ‘সিবিআই, ইডিকে দিয়ে ভয় দেখানো হবে। যিনি ভয় পাবেন তাঁকে বিজেপিতে সাদরে গ্রহণ করা হবে। এটা বিজেপির রেওয়াজ।’