


দেবাশিস পাঠক: তখন শহর কলকাতা ছিল বাঙালি অধ্যুষিত। সেই শহরের পার্বণ তালিকায় ধনতেরাস ছিল না। তবে বিশেষ দিনে গয়না কেনার ধুম ছিল তখনও।
আর সেই বিশেষ দিনটা ছিল অক্ষয় তৃতীয়া।
১৭৮৭ সালের কথা। ৩০ এপ্রিল গভর্নর জেনারেল বাহাদুরের আদেশ অনুসারে জে ডনক্যান সাহেব রেভিনিউ ডিপার্টমেন্ট থেকে একটা তালিকা প্রকাশ করেন। সেই তালিকা মোতাবেক যে সকল পার্বণ উপলক্ষ্যে দেশীয় কর্মচারীরা দরকারে ছুটি নিতে পারত, সেগুলির মধ্যে ছিল অক্ষয় তৃতীয়া। সাহেবসুবোরা মনে করতেন, নেটিভবাবুরা লাগলে অক্ষয় তৃতীয়ায় ছুটি নিতে পারেন। আর, হিন্দুর উৎসব বলে যেসব দিনে অফিস এমনিতেই ছুটি থাকত, সেই তালিকার প্রথমেই ছিল রথযাত্রা। ছিল চড়কপুজো, এমনকি রামনবমীও। কিন্তু কী আশ্চর্য! প্রয়োজনে ছুটি পাওয়া যাবে কিংবা এমনিতেই হিন্দু পর্ব বা উৎসব হিসেবে ছুটি থাকবে অফিস, এমন কোনো তালিকাতেই নববর্ষ অর্থাৎ ১ বৈশাখের উল্লেখ নেই। সেদিক দিয়ে বিচার করলে, সেকালের কলকাতায় নববর্ষের চেয়ে অক্ষয় তৃতীয়ার গুরুত্ব বেশি ছিল।
এর পিছনে কারণ ভিন্নতর। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নদীয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়কে বাঙালির ছুটির দিনের একটা তালিকা তৈরি করতে বলেছিল। নদীয়াধিপ সেই তালিকা তৈরি করলেন এবং তার মধ্যে অক্ষয় তৃতীয়াকে জায়গা করে দিলেন। সেই থেকে দিনটির গুরুত্ব বাড়তে থাকে।
এই অক্ষয় তৃতীয়া কীভাবে ঢুকে পড়েছিল বাঙালির পঞ্জিকায়? কীভাবেই বা নববর্ষকে সরিয়ে জায়গা করে নিয়েছিল আপন গুরুত্বে?
সেই বৃত্তান্তে লেপ্টে আছে ইতিহাস আর পুরাণ। শাস্ত্রকথার উঠোনে বিশ্বাসের পিঁড়ি পাতার গল্প সেসব।
প্রাচীন ভারতে যে দিনপঞ্জি অনুসরণ করা হত, তাতে বছরের প্রথম মাসটির নাম ছিল ‘মাধব’ আর বছরের শেষ মাসটির নাম ছিল ‘মধু’। এই মধু আর মাধব, দুইই বিষ্ণুর দু’টি নাম। তাই এই মাস দুটোকে ভগবান বিষ্ণুর মাস বলে মনে করত মানুষজন। মাধব মাস গ্রীষ্মকালীন মাস। তাই এই সময় জলাভাব দেখা দিত।
সেই কারণে এই মাসে জলসত্র, জলদান ইত্যাদিকে পুণ্যকর্ম বলে গণ্য করা হত। তার বাইরে অন্য মূল্যবান বস্তুদানেরও রেওয়াজ ছিল সেকালে। কলকাতা শহরের আদিপর্বেও তাই মাধব মাসের অক্ষয় তৃতীয়া তিথিতে বাঙালিরা দানধ্যান করতেন, জলসত্র খুলতেন, ব্রাহ্মণভোজন করানোরও প্রথা ছিল।
এদিকে ‘পদ্মপুরাণ’ ছাড়া অষ্টাদশ পুরাণের বাকি সবকটাতেই চান্দ্র বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিতে সত্যযুগের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধরা হয়। এক মাত্র ‘পদ্মপুরাণ’-এই মনে করা হয় এই দিন সত্যযুগ শেষ হয়ে ত্রেতাযুগ আরম্ভ হয়েছিল। আদি বাঙালিরা ‘পদ্মপুরাণ’ মেনে চলতেন। তাই তাঁরা ত্রেতা যুগের শুরুর এই দিনটিতে দানকার্য ও পুজোপাঠের উপর জোর দিতেন।
এদিকে আর্যাবর্তে অর্থাৎ উত্তর ভারতের মানুষ বিশ্বাস করতেন অক্ষয় তৃতীয়ার দিনেই সত্যযুগ শুরু। তাই, উত্তর ভারতে এই দিনটাতে পুজোপাঠ হলেও দিনটিকে ‘সঞ্চয়ের দিবস’ হিসেবে পালন করার প্রথা ছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ১৯৩৭-’৩৮ সালের পরে কলকাতায় উত্তর ভারতীয় বা আরও বিশদভাবে বললে, মাড়োয়ারি সম্প্রদায়, তাঁদের ব্যবসা বৃদ্ধি করতে শুরু করেন। উত্তর ভারতীয় রীতি মেনে তাঁরা বিশ্বাস করতেন, এ দিন সত্যযুগের সূত্রপাত ঘটেছিল। তাঁরাই এই দিন বাণিজ্যের খাতায় জমার ঘরে খানিক সঞ্চয় দেখাতে চাইলেন। আর সেইসূত্রে শুরু হল সোনা-রুপো এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিসের কেনাবেচা। ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কলিকাতায় চলাফেরা’ বইতে তেমনটাই লেখা আছে।
তিনি জানাচ্ছেন, সমগ্র বাংলা দূরঅস্ত, মাড়োয়ারি অধ্যুষিত বাণিজ্য কেন্দ্র পুরানো কলকাতার বড়োবাজারেও নাকি আগে অক্ষয় তৃতীয়া নিয়ে ততটা মাতামাতি ছিল না। তিরিশের দশকের শেষ দিক থেকেই সেখানেও বাড়তে থাকে এই তিথির গুরুত্ব।
সত্যযুগ কী?
সে তো সেই স্বপ্নকল্প সব পেয়েছির দেশ, যেখানে সব ভালো, সব আলো করে আছে। সেখানে নেই ঘৃণা, বিবাদ, দুঃখ কিংবা দ্বেষ। বাঙালি কিন্তু জেনে ও মেনে এসেছে, পরিভাষাগতভাবে যুগটির নাম কৃত যুগ। তাই আমবাঙালির কাছে যাহা কৃত, তাহাই সত্য। তাই, তার কাছে, সেই সেকাল থেকেই, সত্যযুগের সংস্কৃতিতে ত্রেতাযুগের বিশেষত্ব মিশে গিয়েছিল। সেভাবেই সে দেখতে ও চিনতে শুরু করেছিল অক্ষয় তৃতীয়াকে। উত্তর ভারতীয় বাণিজ্যিক সংস্কৃতিকে অভিযোজিত করেছিল নিজস্ব ধরনে। ব্রতকথা পাঠ আর গঙ্গাস্নান, সেই সঙ্গে লক্ষ্মী, গণেশ ও কুবেরের পুজোকে সেকালের বাঙালি জুড়ে নিয়েছিল তাদের আচার পালনের বৃত্তে।
অক্ষয় তৃতীয়ায় সোনাদানা কেনার রেওয়াজ সেদিনও ছিল, আজও আছে। তাই বলে তো সবাই সোনা-চাঁদি কিনতে পারত না সেকালের বাংলায়। যারা পারত না, যাদের সামর্থ্য ছিল না, তারা কি তবে অক্ষয় তৃতীয়া পালনে অনধিকারী? মোটেই তা নয়। সেজন্যই আমবাঙালির অক্ষয় তৃতীয়া ব্রত পালনে কোনো অসুবিধা আপত্তি ছিল না। ঘরে ঘরে পালিত হত এই ব্রত।
এয়োতিরা মূলত এই ব্রত পালন করতেন। লক্ষ্মী ও কুবেরের একযোগে পুজো করার জন্য পড়তেন ব্রতকথা।
সেই ব্রতকথায় বলা হয়েছে এক গরিব ব্যবসাদারের কথা। প্রাচীনকালের সেই বৈশ্যের নাম ছিল ধর্মদাস। নাম থেকেই বোঝা যায়, তিনি দরিদ্র হলেও অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ছিলেন। সেই সঙ্গে ছিলেন দানশীল। তাঁর আয়ের উৎস খুব সীমিত ছিল সন্দেহ নেই, তবু তিনি ভগবানের প্রতি তাঁর ভক্তি ও ব্রাহ্মণদের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল অপরিসীম। প্রতিবছর অক্ষয় তৃতীয়ার দিন পুরোপুরি উপোস করতেন আর নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দানধ্যান করতেন। একবার তিনি জানতে পারেন এই তিথির আসল পৌরাণিক তাৎপর্য ও মাহাত্ম্য। তাই অক্ষয় তৃতীয়ার দিন গঙ্গাস্নান সেরে তিনি গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় দ্রব্য, যেমন জলভর্তি ঘড়া, শস্য, সোনা, ঘি, দই, বস্ত্র ইত্যাদি ব্রাহ্মণদের দান করেন। তাঁর পরিবার এতে তীব্র আপত্তি জানায়। ঘরে দানাপানির ব্যবস্থা নেই, অথচ দান করছেন ধর্মদাস উদারহস্তে, এটা মেনে নিতে পারেননি পরিবারের বাকি সদস্যরা। ধর্মদাস কিন্তু মত বদলাননি। তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। এই ব্রত পালন ও দান করার ফলে ধর্মদাস পরের জন্মে কুশাবতী রাজ্যের রাজা হন। এমনকি বলা হয়, তাঁর এই সাধনার কারণে ত্রিদেবও ব্রাহ্মণরূপে তাঁর যজ্ঞে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
এছাড়াও আর একটি ব্রত কথা পাঠ করতেন সেকালের গিন্নিরা। শতানীক মুনির গল্প।
একদা যুধিষ্ঠির শতানীক মুনির কাছে ধর্মকথা-শ্রবণ প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করেছিলেন—‘হে মহর্ষিপ্রবর। আপনার মুখে ইতিপূর্বে জলদানের মাহাত্ম্য শ্রবণ করেছি, অধুনা পুনরায় উহা সবিস্তারে শ্রবণ করার বাসনা করছি। কৃপা করে পুরঃসর কীর্তন করুন।’
শতানীক বললেন এক ব্রাহ্মণের কাহিনি। পুরাকালে কর্কশভাষী, ক্রোধী, নিষ্ঠুর, ধর্মকর্ম ত্যাগী এক ব্রাহ্মণ ছিল। একদা এক ব্রাহ্মণ ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর হয়ে তাঁর দরজায় গিয়ে কিছু অন্ন আর জল প্রার্থনা করেন। তাতে নিষ্ঠুর সেই ব্রাহ্মণ অত্যন্ত রেগে বললেন, যাও-যাও, এখানে ও সব কিছু হবে না, তুমি এখনি এখানই থেকে দূর হয়ে যাও। আমার ঘরে ও সব কিছু নেই।
এই কথা শুনে সেই ক্ষুধার্ত ব্রাহ্মণ চিন্তা করতে লাগলেন, তাই তো কী করি, কোথায় যাই।
সেই নিষ্ঠুর ব্রাহ্মণের স্ত্রী সুমতি ছিল সতীসাধ্বী আর ধর্মপরায়ণা। ঘটনার সময় সে সেখানে উপস্থিত ছিল। সে স্বামীকে বলল, প্রভু, ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত অতিথি এসে যদি তোমার গৃহ থেকে হতাশ হয়ে প্রস্থান করে, তার বিষণ্ণ মুখ দেখে যদি তোমার প্রাণে বেদনা অনুভূত না হয়, তাহলে এই ধনসম্পদ আর সংসারধর্মের কি দরকার?
এই বলে সুমতি সেই ক্ষুধাকাতর ব্রাহ্মণকে পরিষ্কার শীতল জল দিল। সেদিন ছিল অক্ষয় তৃতীয়া। তিথি মাহাত্ম্যে সেই জলদান অক্ষয় হয়ে গেল। একথা বলে শতানীক বললেন, ‘হে ধর্মরাজ, বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তিথিটিই অক্ষয় তৃতীয়া। এইদিন যে কর্মের অনুষ্ঠান করা হয়, তাই অক্ষয় হয়ে যাবে। এই তিথিতে জলদান করলে অনন্তকাল বিষ্ণুলোকে তার চিরবাস হয়।’
বক্তব্য খুব স্পষ্ট। আর পাঁচটা ব্রতের মতোই। এই ব্রত পালনে ফলে ইহলোকে সর্বপ্রকার সুখের অধিকারী হয়ে মৃত্যুর পর বৈকুণ্ঠে বাস হয়।
অসিত পাল তাঁর ‘আদি পঞ্জিকা দর্পণ’-এ পুরানো বাংলা পঞ্জিকায় শিল্পচর্চা নিয়ে গবেষণা করেছেন। সেখানেও দেখা যাচ্ছে হালখাতা মানে পয়লা বৈশাখ। পুরনো পঞ্জিকায় অক্ষয় তৃতীয়া নিয়ে তেমন হইচই নেই যে। বৈশাখের এই দিনটাতেও যে সিঁদুর মাখানো টাকার ছাপ পড়ে লাল খেরোয় বাঁধানো খাতায়, লেখা হয় ‘ওঁ গণেশায় নমঃ’, পয়লা বৈশাখের মতো গণহারে না হলেও কিছু বিশেষ পণ্যের বণিকরা, বিশেষ করে সোনা ব্যবসায়ীরা যে এদিন হালখাতা করেন, সেসব কথা অনুল্লেখিত পুরানো দিনের পঞ্জিকাতে। যেহেতু অক্ষয় তৃতীয়ার হালখাতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালেই পালিত হতে শুরু করে, সম্ভবত সেই কারণেই অসিত পাল তাঁর সংগ্রহে থাকা হালখাতার যে ছবিগুলি উল্লিখিত বইটিতে রেখেছেন, তার শেষতমটি ১৯২৩ সালের।
ঐতিহাসিকের চোখে দেখলে, পয়লা বৈশাখ আসলে রাজা শশাঙ্কদেবের গৌড়াধিপতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার দিন। অনেক পরে মুঘল সম্রাট আকবর ফসলি বছরের হিসেবে এই দিন খাতা পুণ্যাহ চালু করেন। পয়লা বৈশাখ সে দিক থেকে দেখলে একটা তারিখ মাত্র। তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে বটে, ধর্মীয় কোনো মাহাত্ম্য নেই।
পয়লা বৈশাখের যে জেল্লা, সেটা বাণিজ্যিক। আর অক্ষয় তৃতীয়ার যে মাহাত্ম্য সেটা সম্পূর্ণ ধর্মীয়।
পয়লা বৈশাখের মতো বাজার জুড়ে যে দাপাদাপি, সেটা তার সেদিনেও ছিল না, আজও নেই। পয়লা বৈশাখ যেন বাড়ির আদুরে দুরন্ত বড়োছেলে, আর অক্ষয় তৃতীয়া যেন সবার অলক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা স্নিগ্ধমুখ লক্ষ্মী মেয়েটি। আজ আবার তাকে আরও কোণঠাসা করতে চলে এসেছে আর একটি অবাঙালি প্রথা। ধনতেরস।
চান্দ্র বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিতে নাকি শুরু হয়েছিল মহাভারত রচনা। ওই দিনটিই অক্ষয় তৃতীয়া। তাই হালখাতা হোক বা সোনা কেনা, যে কোনো কাজের শুভারম্ভের জন্য দিনটি বিশেষ প্রশস্ত। এই বিশ্বাস থেকেই অক্ষয় তৃতীয়ার দিন হালখাতা প্রথার সূচনা। প্রথমে উত্তর ভারতীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে এই প্রথার উদ্ভব, পরে ১৯৩০ এর দশকের বাঙালি সমাজে, বাংলার বণিক সমাজে তার আত্তীকরণ।
সেকালের শহুরে বাঙালি যে এই বিশেষ তিথিতে সোনা কিনতে শুরু করল, সেই প্রথার পিছনেও তাদের মধ্যে কাজ করেছিল একটি পৌরাণিক বিশ্বাস। পুরাণকার বলছেন, ভগীরথের আবাহনে মহাদেবের জটা থেকে মা গঙ্গা এই ধরিত্রীতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সেই আবির্ভাব লগ্ন ছিল অক্ষয় তৃতীয়ার পবিত্র তিথি।
বিশ শতকের তিনের দশকের মাঝামাঝি সময়, কলকাতা শহরের মানুষ, প্রাক বিশ্ব যুদ্ধের আবহে সম্ভবত টের পেয়েছিলেন, একটা যুগ পরিবর্তন আসন্ন। যুদ্ধের পর এমন একটা সময় আসবে, যখন বদলে যাবে জীবন ও বাঁচার ধরণ। অক্ষয় তৃতীয়ার ভেতর অনেকগুলো সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের স্মৃতি যে লুকিয়ে আছে, সেটা বোধকরি এসময় ধরে ফেলেছিল বঙ্গ সমাজ। সে বুঝেছিল, গঙ্গার মর্তধামে আসার ভেতর রয়েছে পাপ থেকে নিষ্কৃতি খোঁজার তাগিদ। গঙ্গায় ডুব মারব আর পাপ থেকে মিলবে মুক্তি। এই ব্যবস্থা নিশ্চিত হওয়ার সূত্রপাত। পাপ করব না, এই পণ বাঙালি সেদিন করেনি। বরং, আসলে পাপ রয়েছে, এবার চাই পাপ থেকে পিছলে পুণ্যে যাওয়ার রাস্তা, এই বোধ তাঁকে তাড়া করেছিল। সেজন্যই সে অক্ষয় তৃতীয়া পালনে উৎসাহিত বোধ করে। আবার গণেশ ও ব্যাসদেবের মহাভারত লিখন বুঝিয়ে দেয়, কথ্য থেকে লেখ্য সংস্কৃতিতে প্রবেশের বিশেষ স্মৃতি ধরা আছে এই দিনে। বলা থেকে লেখায় প্রবেশ মোটেও সহজ কথা নয়। তাই তার মাহাত্ম্যও অনেকখানি। অক্ষয় তৃতীয়াকে সেকালের বাঙালি পরশুরাম জয়ন্তী হিসেবেও চিনত। ইংরেজ আমলে বাঙালি যখন ন্যায়, স্মৃতিচর্চার পাশাপাশি ‘বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী’ অনুভবে থিতু হতে শুরু করল, তখন থেকেই মূলত অলংকার ও রত্ন ব্যবসায়ীদের সৌজন্যে অক্ষয় তৃতীয়ার মহানাগরিক চৌহদ্দিতে আসন পেতে বসল। উত্তর ভারতীয় বণিক সংস্কৃতি আর গৌড়-বঙ্গ-পুণ্ড্র-বরেন্দ্রের পুণ্যার্থীর মনোভাব মিলেমিশে তার এক ছিমছাম উৎসব হয়ে দেখা দিল অক্ষয় তৃতীয়া, শহর কলকাতায়। এসবই কিন্তু ওই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে।
ঘরদোর সব সাত সকালেই সাফ সুতরো। সকালে স্নান সেরে, ফুল তুলে, গরদের থান পরে পুজো দিয়ে বাড়ির সবচেয়ে বয়ঃজ্যেষ্ঠা তৈরি। এর মধ্যে পাড়া থেকে এসে হাজির হতেন পাড়ার অন্য বাড়ির বউ-ঝিরা। সবার স্নান হয়ে গিয়েছে। তাঁদের সবারই বিশেষ দিন, কারণ তাঁদের বাড়িতে কাসুন্দি হবে। তাই আজ সবার উপবাস। সকলে যেতেন সরষে ধুতে। একটা নতুন ধুতি আর বেতের ধামায় সর্ষে, ফল ও মশলা নেওয়া হত।
কিন্তু শহরের অলিতে গলিতে ছাদওলা বাড়িগুলোতে অক্ষয় তৃতীয়ার দিন সেই কাসুন্দি তৈরির পার্বণ একেবারেই উধাও। জানলে মন খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু কিচ্ছুটি করার নেই। যুগ ও সমাজের পরিবর্তনেই তো অক্ষয় তৃতীয়ার অনিবার্য সরণ। কী আর করা যাবে!