


নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: মহিলা সংরক্ষণ বিল নিয়ে যখন দেশজুড়ে চর্চা তুঙ্গে, ঠিক তখনই বিজেপির নারী ক্ষমতায়নের দাবিকে কার্যত প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে বীরভূমের এক প্রান্তিক ব্লক রাজনগর। লোকসভায় বিজেপির টিকিটে জেতা মহিলা সাংসদের সংখ্যা যেখানে মাত্র ১২ শতাংশে আটকে, সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের আমলে বীরভূমের রাজনগর ব্লকে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে নারীশক্তি। রাজনগর ব্লকের পাঁচটি গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধানই মহিলা। মোদি শাসিত কোনো রাজ্যে কি এমন নজির আছে? এই প্রশ্নই এখন রাজনগরের মাটিতে দাঁড়িয়ে বিজেপিকে তুলোধনা করার প্রধান অস্ত্র তৃণমূলের। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, সদিচ্ছা থাকলে নারী ক্ষমতায়নের জন্য কোনো ‘বিল’ বা ‘গিমিক’-এর প্রয়োজন হয় না। এসবের তোয়াক্কা না করেই বাংলায় নারী ক্ষমতায়ন এবং প্রান্তিক মানুষকে মূল স্রোতে আনার কাজটা নীরবে সেরে ফেলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
প্রান্তিক জনপদ রাজনগর একসময় ছিল বীরভূমের রাজধানী। সেই ঐতিহ্যের মাটিতেই আজ নয়া ইতিহাস লিখছেন পাঁচ নারী। রাজনগর ব্লকের পাঁচটি পঞ্চায়েত ও তাঁদের প্রধানদের সামাজিক অবস্থান দেখলেই বোঝা যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার কীভাবে নারীশক্তি ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণিকে একসুতোয় বেঁধেছে। ভবানীপুর পঞ্চায়েতের আসনটি ‘জেনারেল’ বা সর্বসাধারণের জন্য হলেও তৃণমূল সেখানে দ্বিতীয়বারের জন্য প্রধান করেছে জিয়ালী কিস্কুকে। তফসিলি উপজাতি ভুক্ত জিয়ালী ও তাঁর স্বামী দুজনেই একসময় দিনমজুরের কাজ করতেন। আজ সেই লড়াকু নারীই হাজার হাজার মানুষের জনপ্রতিনিধি। একইভাবে চন্দ্রপুর পঞ্চায়েতের প্রধান জবা কিস্কুও তফসিলি উপজাতি পরিবারের সন্তান এবং দিনমজুর। গাংমুড়ি-জয়পুর পঞ্চায়েতের প্রধান তাপসী মণ্ডল সাহা তফসিলি জাতিভুক্ত হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। স্বামীহারা হওয়ার পর স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে লড়াই করে উঠে আসা লতিকা সূত্রধর আজ তাঁতিপাড়া পঞ্চায়েতের প্রধান। আর রাজনগর পঞ্চায়েতের প্রধান সরস্বতী ধীবর, যাঁর স্বামী পেশায় বেসরকারি স্কুল শিক্ষক, তিনিও এখন প্রশাসনের প্রথম সারিতে। শুধু পঞ্চায়েত নয়, খোদ রাজনগর পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি পদেও রয়েছেন এক নারী, নিবেদিতা সাহা।
রাজনগর ব্লক তৃণমূলের সভাপতি সুকুমার সাধু বলেন, বিজেপি কেবল বিলের নাম করে নাটক করে। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমাণ করেছেন, একজন দিনমজুর বাড়ির আদিবাসী বা পিছিয়ে পড়া ঘরের মেয়েও যোগ্য সম্মান নিয়ে প্রশাসন চালাতে পারেন। জিয়ালী বা জবা কিস্কুদের মতো দিনমজুর থেকে প্রশাসনিক প্রধান হয়ে ওঠা— এটাই আসল ক্ষমতায়ন।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কেবল মহিলা নয়, যেভাবে তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের ক্ষমতার অলিন্দে আনা হয়েছে, তা এক বিরল দৃষ্টান্ত।
এই নারীশক্তির দাপটই ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে সিউড়ির তৃণমূল প্রার্থী উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়কে রাজনগর ব্লক থেকে বিপুল লিড এনে দেবে বলে আত্মবিশ্বাসী ঘাসফুল শিবির। তৃণমূল প্রার্থী উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ঘরের মা-বোনেদের শুধু লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দেয়নি, তাঁদের হাতে শাসনদণ্ডও তুলে দিয়েছে। যেখানে বিজেপি কেবল সংরক্ষণ নিয়ে রাজনীতি করে, সেখানে আমরা ঘরের দিনমজুর মা-বোনদের প্রশাসনিক চেয়ারে বসিয়ে দিয়েছি। রাজনগরের এই অকৃত্রিম সমর্থনই এবারের ভোটে বিরোধীদের যোগ্য জবাব দেবে।’
যদিও বিজেপির জেলা সহ সভাপতি বলেন, তৃণমূল নারী ক্ষমতায়নের কথা বলে আসলে মানুষের চোখে ধুলো দিচ্ছে। খাতায়-কলমে মহিলাদের প্রধান করা হলেও, আসল ক্ষমতা ভোগ করে তৃণমূলের দাদারা। প্রধানমন্ত্রী মোদিজি লোকসভায় বিল এনে সাংবিধানিক সুরক্ষা দিতে চাইছেন, আর তৃণমূল চাইছে সস্তার রাজনীতি করতে।