


নিবেদিতা কাজ আরম্ভ করবার জন্য ব্যগ্র হয়েছিলেন। তাই দিল্লী, আগ্রা, লাহোর প্রভৃতি দেখে তিনি একাকী কাশী হয়ে ১ নভেম্বর কলকাতায় ফিরে এলেন। নিবেদিতার ইচ্ছা ছিল শ্রীশ্রীমার কাছে থাকেন। শ্রীশ্রীমাও তাঁকে পরম স্নেহে গ্রহণ করেন ও নিজের কাছে বাস করবার অনুমতি দেন। তখনকার হিন্দুসমাজ ছিল অত্যন্ত রক্ষণশীল ও গোঁড়া। মুষ্টিমেয় শিক্ষিত হিন্দু ছাড়া সমাজের সকলেই তখন বিদেশিদের স্পর্শে সযত্নে পরিহার করে চলতেন, বিশেষত মেয়েরা। বিদেশিদের বলা হতো ম্লেচ্ছ। সুতরাং কোনও ব্রাহ্মণকন্যা খ্রিস্টানের সঙ্গে বাস করবেন এটা অসম্ভব। নিবেদিতাকে স্বগৃহে স্থান দিয়ে শ্রীশ্রীমা কী সাহস ও উদারতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা আজকের দিনে আমরা ধারণা করতে পারব না। শ্রীশ্রীমা কলকাতায় এলে বাগবাজারে পল্লিতে অবস্থান করতেন এবং তখন ১০/২ বোসপাড়া লেনে বাস করছিলেন। তাই স্বামীজীর ইচ্ছা ছিল বাগবাজারেই নিবেদিতার কর্মকেন্দ্র স্থাপিত হয়।
বোসপাড়া লেনে ১৬ নম্বর বাড়িটি পাওয়া গেল। বাড়িটি বেশ সেকেলে ধরনের। নিবেদিতার কিন্তু খুব পছন্দ হয়েছিল। ১৬ নম্বরের এই বাড়িটি এখনও বর্তমান। কিন্তু ১৭ নম্বরের যে বাড়িতে তিনি দ্বিতীয়বার ভারতে আগমনের পর ১৯০২ থেকে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাস করেন, সেটি ভেঙ্গে সম্পূর্ণ নতুন করে নির্মিত হয়েছে। বাড়ি পাওয়া গেলেও ঝি পাওয়া খুবই কঠিন ছিল। একজন বিদেশি মহিলার কাছে হিন্দু পরিচারিকা কেন কাজ করতে আসবে? অবশেষে একজনকে পাওয়া গেল। নিবেদিতা তাঁর এক পুস্তকে কৌতুক করে লিখেছেন, ঝি একটি শর্তে তাঁর কাজ করতে রাজি হয়েছিল। শর্তটি এই যে, নিবেদিতা কখনও তাঁর রন্ধনকক্ষে প্রবেশ করবেন না, অথবা তার উনুন ও জল স্পর্শ করবেন না। একদিন নিবেদিতার চায়ের পাত্রটি স্পর্শ করবার পর ঝিকে স্নান করতে হয়েছিল। কারণ তার ধারণা ছিল মেমসাহেবমাত্রেই অখাদ্য ভক্ষণ করে, অতএব ওই বাসনগুলি স্পর্শ করা অশুচি কাজ। পরে অবশ্য নিবেদিতার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে সে নিবেদিতার ব্যবহৃত বাসনপত্র পরিষ্কার করত, কিন্তু অপর কোনও মেমসাহেব এলে এসব কাজ নিবেদিতাকেই করতে হতো। তিনি কিন্তু এসব কিছুই মনে রাখতেন না। আহার এবং স্পর্শ ব্যাপারে তাঁকে অনেক সহ্য করতে হয়েছে, হয়তো মনে বেদনাও লেগেছে, কিন্তু ক্ষত সৃষ্টি করেনি। তিনি জানতেন, সমস্ত ব্যাপারটা অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। ‘ঝি’ শব্দের অর্থ কন্যা, অবশ্য বর্তমানে পরিচারিকাকে ‘ঝি’ বলে সম্বোধনের মধ্যে সেই অর্থটি লুপ্ত। নিবেদিতা কিন্তু প্রকৃত অর্থগ্রহণে বিশেষ আনন্দিত হয়েছিলেন। তাই লিখেছেন, “অবশেষে একজন পরিচারিকা পাওয়া গেল। স্ত্রীলোকটি বেশ বৃদ্ধা। সে আমাকে ‘মা’ বলে ডাকত, আর আর আমার বয়স তার অর্ধেক হলেও আমি তাকে ‘ঝি’ বলে ডাকতাম, অর্থাৎ সে আমার মেয়ে।”
নিবেদিতা মেয়েদের জন্য একটি স্কুল খুলবেন এইরূপ স্থির ছিল। তার উদ্যোগ চলতে লাগল। ১২ নভেম্বর (১৮৯৮) বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা উপলক্ষ্যে একটি সাধারণসভার অধিবেশন হয়। ওই সভায় স্বামী বিবেকানন্দ, স্বামী ব্রহ্মানন্দ ও স্বামী সারদানন্দ উপস্থিত ছিলেন। নিবেদিতা সভানেত্রীত্ব করেন। উদ্বোধন পত্রিকায় ওই অধিবেশনের একটি সুন্দর বর্ণনা পাওয়া যায়:
নিবেদিতার সেই প্রথম উদ্যম। বাগবাজার পল্লিতে বালিকা বিদ্যালয় খুলবেন, সংকল্প। একদিন বলরামবাবুর বাড়িতে সব গৃহস্থ ভক্তদের একটি সভাগোছের, ঘরোয়া জলসা হলঘরে হল। যাতে গৃহস্থেরা মেয়ে দেন ওই স্কুলে—এই আবেদন। সকলে বসে আছেন। এমন সময় অতর্কিতভাবে স্বামীজী সবার পেছনে আসন গ্রহণ করলেন। নিবেদিতা ইংরেজিতে
বক্তৃতা দিলেন।
প্রব্রাজিকা অমলপ্রাণা প্রকাশিত ‘ভগিনী নিবেদিতা’ থেকে