


যতদূর পারো একই আসনে বসে সংখ্যা রেখে জপ করো। তুমি ১০৮ বার জপের কথা বলেছো, তুমি কি জানো না শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু দুই লক্ষ বার জপ করতেন, ওনার স্ত্রী বিষ্ণুপ্রিয়া আড়াই লক্ষ বার জপ করতেন। আমাদের সাধুদের মধ্যে স্বামী বিরজানন্দজী মহারাজ এক সময় এক লক্ষ আট হাজার বার সংখ্যা রেখে জপ করতেন, এখন বুঝে নাও? শ্রীমূর্তির ধ্যান তোমার মনের নির্মলতার উপর নির্ভর। নিজের মনে আসা ভাবনাগুলোর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করো, যেমন ঘর পরিষ্কার করার আগে ওখানে কোথায় কোথায় নোংরা আছে জেনে নাও তারপর ওটাকে পরিষ্কার করো। ঠিক তেমনি মনের বাসনাগুলোর সঙ্গেও ভালো করে পরিচিত হয়ে যাও, জেনে নাও কী কী বাসনা তোমার মনে আছে, তবেই ঐগুলোকে পরিষ্কার করতে পারবে।
যখন তুমি শ্রীশ্রীঠাকুরের নামকে আশ্রয় করে নিয়েছো তখন এটাই সবচাইতে ভালো উপায় হবে সংসারের চিন্তা ওনার উপর ছেড়ে দাও। ওনার ছবির সামনে একা বসে ওনাকে বলো, ‘হে প্রভু এই সংকট থেকে আমায় রক্ষা করো, আমি দিন-রাত তোমার নাম জপ করতে চাই এবং আমার তন-মন-ধন যেন তোমার চরণেই সমর্পণ করতে পারি। হে প্রভু আমি এইসব আর সইতে পারছি না।’ এইভাবে ওনার কাছে প্রার্থনা করো। তোমার প্রার্থনা অত্যন্ত ব্যাকুল হলে উনি নিশ্চয় শুনবেন। নিশ্চিন্তে থাকো।
যে লোকগুলো আধ্যাত্মিক পথে চলার জন্য প্রস্তুত, তাঁরা যেমন যেমন ওই পথে অগ্রসর হয়, সমগ্র সংসারের দুঃখ, কষ্ট ওদের মাথার উপর উঠে আসে। শ্রীশ্রীঠাকুরের জীবন দেখে নাও। আট বছর বয়সেই পিতৃবিয়োগ সহ্য করতে হয়েছে। তারপর কিছুদিনের মধ্যে রোজগার করার জন্য কলকাতা আসতে হলো। দক্ষিণেশ্বরেও কি হৃদয়রামকে নিয়ে ওনাকে কষ্ট সহ্য করতে হয়নি? সারদা মায়ের জীবন, জানকী মায়ের জীবন, যাঁদের জন্মদুঃখিনী বলা হয়, তুমি দেখো নি? এইসবের পরও সারদা মায়ের, জানকী মায়ের জীবন তো ভারতীয় নারীদের আদর্শ জীবনই হয়ে আছে। তবে তোমার দুঃখে, কষ্টে কীসের এত ব্যথা। তুমি কী জানো না, “সুখ-দুঃখের এই সংসারে কেন সবাই কান্নাকাটি করে? জ্ঞানীরা কাটায় জ্ঞানের মাধ্যমে আর মুর্খ কাটায় কান্নাকাটি করে? নিজের কষ্টে যদি ঘাবড়ে যাও তবে সংসারীদের কষ্ট নিবারণের জন্য নিজের যোগ্যতা কীভাবে বাড়াবে? প্রভুর নাম নিতে থাকো আবার শোক দুঃখে ঘাবড়াতেও থাকো। মা সারদা, মা জানকী, ওনাদের জীবনে তো এমন হয় নি।
সকালবেলা জপ ধ্যানের জন্য ভালো, মন শান্ত থাকে, তাই আসনে বসে বেশী সময় নিয়মানুসারে ধ্যান করতে থাকো। যদি তুমি সবসময় মনে মনে ইষ্টমন্ত্র জপ করার অভ্যাস করে ফেলো তো তোমার মনকে শান্ত করার জন্য আর কিছু করতে হবে না। নিজের মনের সঙ্গে সম্পর্কও তৈরী করতে পারবে, কথাও বলতে পারবে, তুমি জানো শুদ্ধ মনই শুদ্ধ আত্মা, তোমার শুদ্ধ মন তোমারই শুদ্ধ আত্মা। এই মন শুদ্ধ হলে তুমি শ্রীরামকৃষ্ণের রূপে, নিজের আদর্শ স্বরূপকে জানতে পারবে।
‘মধু সঞ্চয়ন’ (স্বামী গহনানন্দ উক্তি সংগ্রহ) থেকে