


কথা কওয়া খুব বড় সাধনা। মন কথা কবেই—তখন ঠাকুরের সঙ্গে কথা ক’বি। সে ভালবাসার কাঙ্গাল। যে একটু ভালবাসে তার দ্বারে ঘুরে ঘুরে বেড়ান। সাধুসঙ্গ লাভ তো সহজে হয় না। সৎগ্রন্থও সাধু সঙ্গের ফল প্রদান করে। নামসঙ্কীর্ত্তনকারিগণকে কিছু করতে হয় না, কেবলমাত্র নাম সঙ্কীর্ত্তন করতে করতে স্বয়ং নাদ এসে উপস্থিত হন, সাধককে আলোকে, পুলকে আনন্দে নিমজ্জিত করে ভগবদ্দর্শন করিয়ে দেন। যিনি সংসার হরণ করেন তিনি হরি নারায়ণ, অজ্ঞান হরণ যিনি করেন তিনি শিব, দুর্গতিহরণকারিণী দুর্গা, বিঘ্ন হরণ যিনি করেন তিনি গণেশ, অন্ধকার হরণকারী হরি সূর্য্য। ‘হরে’ এই পদটি পঞ্চোপাসকেরই স্বীয় ইষ্টদেবতার সম্বোধন পদ। এইরূপ যিনি তাপ, চিত্তক্লেশ, পুনর্জ্জন্ম, ভূভার প্রভৃতি হরণ করেন তিনি হরি। এইহেতু বৈষ্ণব বিষ্ণুকে, শাক্ত শক্তিকে শৈবগণ শিবকে, সৌরগণ সূর্য্যকে, গাণপত্যগণ গণেশকে বুঝতে পারেন। গেছে কি? গেছে পতিনারায়ণ ব্রত। আবার যদি ভারতে ফিরে আসে পতিনারায়ণ ব্রত তাহলে মহাশক্তি জাতির সমস্ত শক্তি উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠবে। সতী নারীর জন্ম জন্মান্তরের স্মৃতি অক্ষুণ্ণ থাকে। তাঁরা অসাধ্য সাধনে সমর্থা হন। মাত্র নাম সঙ্কীর্ত্তন দ্বারা মানুষ কি প্রকারে কৃতার্থ হতে পারে তাহা আলোচনা করা যাক্। শব্দ হতে জগৎ সৃষ্টি হয়েছে একথা বেদে স্পষ্টাক্ষরে বলেছেন। শ্রুতিতে শব্দকে প্রাণস্পন্দন আখ্যা দেওয়া হয়েছে। সকলই শব্দ সম্ভূত। সেই শব্দব্রহ্ম মানব শরীরে মূলাধারে পরা, নাভিতে পশ্যন্তী, হৃদয়ে মধ্যমা, মুখে বৈখরীরূপে খেলা করে।
সৃষ্ট্যুন্মুখী গতিতে বৈখরী বাক্ সংসার রচনা করেছেন। জন্ম-জন্মান্তর ভ্রমণ করে যখন জীব বহির্মুখতার জ্বালায় অস্থির হয়ে কেন্দ্রাভিমুখে ফিরতে চায়, তখন বাক্কে অবলম্বন করেই কেন্দ্রে ফিরে আসতে শাস্ত্র নির্দ্দেশ দিয়েছেন। যে ক’টি নাম উচ্চারণ ক’রবে অথবা শ্রবণ ক’রবে সেগুলি সব রক্তে, মাংসে, অস্থিতে, মেদে, মজ্জায় মিশে যাবে, শরীর নামময় হয়ে যাবে।
কলির পথ—নাম সঙ্কীর্ত্তন। নাম কর—নাম কর—নাম কর। জয় নাম—জয় নাম—জয় নাম। ত্রৈবর্ণিক পুরুষ চিরদিন বেদবিহিত কর্ম্মের যথাযথ অনুসন্ধান ক’রে যে গতি লাভ করবেন, স্ত্রীগণ মাত্র স্বামীসেবার দ্বারা সেই গতি লাভে সমর্থা হবেন। সকল সাধনার শেষ হল নাদ, অনাহত ধ্বনি লাভ। অনাহত ধ্বনি লাভ করবার জন্য সাধকগণ সমস্ত ত্যাগ করে আহার বিহারের সংযম ক’রে সাধন পথে অগ্রসর হতে থাকেন। সাধনের সমস্ত বাধা অতিক্রম করে নাদ লাভে সমর্থ হন। মন্ত্রযোগী, হঠযোগী, লয়যোগী, পাতঞ্জলীযোগী, বৈষ্ণব, শাক্ত, শৈব, সৌর, গাণপত্য—সকলের কাম্য জ্যোতিঃ, নাদ। জ্যোতিঃ, নাদ ব্যতীত, জ্যোতিঃ, নাদ বাদ দিয়ে শান্ত হবার দ্বিতীয় পথ নাই। সকলেই চরমে নাদ প্রাপ্ত হন। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্যগণের বেদবিহিত কর্ম্মে অধিকার আছে। কলিযুগে তাঁরা বৈদিক কর্ম্ম যথাযথ অনুষ্ঠান করতে সমর্থ না হয়ে প্রত্যবায়ভাগী হবেন। কিন্তু শূদ্রের কোন বেদবিহিত কর্ম্মে অধিকার না থাকায় তাঁরা মাত্র ত্রৈবর্ণিক সেবা দ্বারা উত্তমাগতি লাভ করবেন। আমরা সবাই বিদেশে এসেছি। আমাদের একটা আলোকে আনন্দে ভরা স্বদেশ আছে। সে দেশে যেতে হলে অনুক্ষণ পাথেয় সংগ্রহ করতে হয়। সেই আলোর দেশের পাথেয় হল ‘নাম’।
ত্রিদণ্ডী স্বামী মাধব রামানুজ সংকলিত ‘শ্রীশ্রীওঙ্কারসহস্রবাণী’ (২য় খণ্ড) থেকে