


আমি তোমার শরণাগত। আচ্ছা, আমি কে? আমি রশ্মি, আমি তরঙ্গ। তুমি কে? তুমি সূর্য্য, তুমি সমুদ্র—সূর্য্যতে-রশ্মিতে, সমুদ্রে-তরঙ্গে তো কোন ভেদ নাই। রশ্মি তো সূর্য্যের সহিত নিত্য সম্বন্ধবিশিষ্ট, সাগর ও তরঙ্গও তো তাই। সূর্য্যের বুকে রশ্মি খেলে, সাগরের বুকে তরঙ্গ উঠে—তোমাতে আমাতে তাহলে পৃথক্ত্ব কোথায়? আমি তো তোমাতে রয়েছি। রশ্মি ও তরঙ্গ যখন বহির্মুখ হয়, তখন তারা অপৃথক্ হয়েও পৃথক্ মনে করে, তেমনি আমি তোমাতে থেকে তোমাতে ডুবেও যেন তোমা ছাড়া হয়ে আমি, তাই তোমার শরণ গ্রহণ করছি। বহির্মুখ আমি, আমায় অন্তর্মুখ কর। হে আনন্দ-পারাবার! তোমার এ ক্ষুদ্র তরঙ্গকে তোমাতে মিশায়ে লও! হে আমার নিস্তরঙ্গ মহাসাগর! তুমি জ্ঞানী ও ভক্তকে তোমার একমাত্র প্রশান্ত বুকে স্থান দাও। ভক্ত বলেন—তরঙ্গ সত্য, তুমি সত্য; জ্ঞানী বলেন—তরঙ্গ মিথ্যা, তুমি সত্য! এই নিয়ে ভক্ত ও জ্ঞানীর কত কলহ হয়। তুমি তো কলহের জিনিষ নও, তুমি যে অনুভবের ধন। অনুভবের আগে কলহ থাকে, অনুভবের পর আর কি কলহ থাক্তে পারে? তোমার তো রঙ্গ করা স্বভাব। রঙ্গ করবার জন্যই এই ভেদ সৃষ্টি করেছ! যাক্ আবার বল্ছি—আমি তোমার শরণাগত; তুমি কোথায় আছ বেদ তাহা বলেছেন—
যো দেবোঽগ্নৌ যোঽপ্সু যো বিশ্বং ভুবনমাবিবেশ।
যো ওষধীষু যো বনস্পতিষু তস্মৈ দেবায় নমো নমঃ।।
যে দ্যুতিশীল ক্রীড়াশীল পুরুষ অগ্নিতে, যিনি জলে, যিনি বিশ্বভুবনে প্রবেশ করে আছেন; যিনি ওষধীসমূহে, যিনি বনস্পতিতে বিদ্যমান আছেন—সেই দেবতাকে প্রণাম করি, প্রণাম করি। তুমি তো সকলেই আছ গো, তুমি তো সব সেজেই আছ গো, জগতে যা দেখছি সবই তো তুমি গো। বেদ বলছেন—
তদেবাগ্নিস্তদাদিত্যস্তদ্বায়ুস্তদু চন্দ্রমাঃ।
তদেব শুক্রং তদ্ ব্রহ্ম তদাপস্তৎ প্রজাপতিঃ।।
সেই অগ্নি, অর্থাৎ তুমিই অগ্নি, তুমিই আদিত্য, তুমিই বায়ু এবং তুমি চন্দ্রমা, তুমি শুক্র, তুমিই ব্রহ্ম, তুমিই জল, তুমি প্রজাপতি—সবই তো তুমি গো! তোমায় আবার প্রণাম করি।
ত্বং স্ত্রী ত্বং পুমানসি ত্বং কুমার উত বা কুমারী।
ত্বং জীর্ণদণ্ডেন বঞ্চয়সি জাতো ভবসি বিশ্বতোমুখঃ।।
তুমি স্ত্রী, তুমি পুরুষ, তুমি কুমার, তুমি কুমারী, তুমি বিশ্বতোমুখ, তুমি মায়া অবলম্বনে যেন জাত হও, বৃদ্ধ হয়ে দণ্ডের দ্বারা বঞ্চনা কর।
শ্রীগুরুপ্রকাশন প্রকাশিত ‘শ্রী ওঙ্কারনাথ-রচনাবলী’ (১৪ খণ্ড) থেকে