


পরামর্শে জেরিয়াট্রিশিয়ান ডাঃ ধীরেশ কুমার চৌধুরী ও জেরিয়াট্রিক সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ দেবাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়।
ডিমেনশিয়া একটি মানসিক ও স্নায়বিক সমস্যা, যেখানে ধীরে ধীরে একজন মানুষের স্মৃতি, বোঝার ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং দৈনন্দিন কাজ করার দক্ষতা কমতে থাকে। অনেক সময় এর সঙ্গে মেজাজ ও আচরণের পরিবর্তনও দেখা যায়। ডিমেনশিয়ার প্রবণতা বার্ধক্যের সঙ্গে বাড়লেও এটি বার্ধক্যের স্বাভাবিক অংশ নয়। বর্তমানে ভারতে প্রায় ৮০ লক্ষের কাছাকাছি মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত, ৬০ ও তদূর্ধ্ব বয়সের ৭.৪% মানুষ ডিমেশিয়ায় ভুগছেন এবং সংখ্যাটি আগামী দিনে আরও বাড়বে বলে অনুমান করা হচ্ছে, কারণ আমাদের দেশে বৃদ্ধের জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
কাজে আসে বাড়ির ছোট ছোট পরিবর্তন: ডিমেনশিয়ার চিকিৎসায় ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু ওষুধে সব সমস্যার সমাধান হয় না। অনেক পরিবার ভেবে নেয় ডাক্তার ওষুধ দিলেই রোগীর অবস্থা বদলাবে, কিন্তু বাস্তবে বাড়ির পরিবেশ, যত্ন, ও নিয়মিত জীবনযাপন সমান জরুরি। বাড়িতে ছোট ছোট পরিবর্তন ডিমেনশিয়ার অগ্রগতি ধীর করতে সাহায্য করতে পারে। যেমন প্রতিদিন নিয়ম করে হাঁটা, হালকা ব্যায়াম, অথবা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শে শারীরিক কসরত করা মস্তিষ্কে রক্তসঞ্চালন বাড়ায় এবং মনও ভালো রাখে। এছাড়াও ভালো আলোর ব্যবস্থা, বাথরুমে গ্র্যাব বার লাগানো, হাঁটার জায়গা ফাঁকা রাখা, রান্নাঘরে ধারালো জিনিস দূরে রাখা—এইসবও দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করে ডিমেনশিয়া রোগীকে অন্যান্য ঝুঁকি থেকে বাঁচায়।
ডায়েটই যখন ওষুধ: একইভাবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস খুব গুরুত্বপূর্ণ—তাজা শাকসবজি, ফল, ডাল, কম তেল-ঝাল খাবার, পর্যাপ্ত জল খাওয়া রোগীর শারীরিক স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং মস্তিষ্ককেও সক্রিয় রাখে।
ভালোবাসা ফল দেয়: অনেক সময় আমরা দেখি রোগী সারাদিন বিছানায় বা চেয়ারে বসে কাটিয়ে দেন, এতে স্মৃতি ও চলাফেরার ক্ষমতা দ্রুত কমে যায়। তাই পরিবারকে সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করতে হবে যাতে রোগী নিয়মিত কিছু কাজ করেন এবং সামাজিকভাবে যুক্ত থাকেন। বাড়ির সবাই যদি রোগীর সঙ্গে আলাপ করে, আড্ডা, হাসিঠাট্টা করে এবং ভালোবাসার পরিবেশ দেয়, তবে রোগী একা নন—এই অনুভূতিটাই তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অমূল্য। অর্থাৎ, ডিমেনশিয়ার সঙ্গে লড়াইয়ে ওষুধ যেমন দরকার, তেমনই দরকার বাড়ির স্নেহ, সহানুভূতি এবং সচেতন যত্ন। মস্তিষ্ক কে যথা-সম্ভব সক্রিয় রাখুন - এটাই উপায়!
ব্রেন এক্সারসাইজ: বাড়িতেই সহজ কিছু উপায়ে “ব্রেইন এক্সারসাইজ” করা যায়। যেমন প্রতিদিন কাগজ পড়া বা কেনাকাটার তালিকা তৈরি করা, সহজ পাজল বা শব্দ-জব্দ সমাধান করা, তাস, দাবা বা লুডো খেলা, পুরনো ছবি দেখে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা—এসব কাজ মস্তিষ্কের স্মৃতি ও মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে। গান শোনা বা গাওয়া, গল্প বলা বা শোনানো, কিংবা পুরনো দিনের গান ও কবিতা আবৃত্তি রোগীর মনে আনন্দ জাগায় এবং তাকে সক্রিয় রাখে।
জাগিয়ে তুলুন পুরনো শখ: অনেক সময় আমরা দেখি, যেসব শখ একসময় কারও জীবনের অংশ ছিল—যেমন বাগান করা, সেলাই, রান্না বা বই পড়া—ডিমেনশিয়ার পর সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়। অথচ এই শখগুলো পুনরুজ্জীবিত করা রোগীর মানসিক স্বাস্থ্যকে দৃঢ় করে। যেমন ধরুন, দক্ষিণ কলকাতার ৭৫ বছরের প্রভাতবাবু আগে গান খুব ভালোবাসতেন। ডিমেনশিয়া ধরা পড়ার পর তিনি চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যরা তাঁকে আবার গান শুনতে ও মাঝে মাঝে ভজন গাইতে উৎসাহিত করেন। আশ্চর্যের বিষয়, কিছুদিন পর তিনি শুধু গানেই আগ্রহী হলেন না, গানের সুরে তাঁর মুখে হাসিও ফিরল। এতে তাঁর মন ভালো হলো, এবং পরিবারও বুঝল যে রোগের মাঝেও আনন্দের জায়গা খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
রোগীর যত্ন নিতে নিতে ক্লান্ত লাগলে: ডিমেনশিয়ার যত্নের মূল স্তম্ভ হলেন পরিবারের সদস্যরা—যাঁরা দিন-রাত রোগীর পাশে থাকেন। কিন্তু অনেক সময় এই যত্নদাতারাই (কেয়ারগিভার) নিঃশব্দ যোদ্ধা, যাঁদের ক্লান্তি কেউ দেখে না। একটানা খাওয়ানো, ওষুধ মনে করানো, রাত জেগে রোগীর দিকে খেয়াল রাখা, আচরণগত সমস্যার মোকাবিলা করা—এসব করতে করতে কেয়ারগিভারের নিজের মানসিক ও শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। এটাকে বলে “কেয়ারগিভার বার্নআউট”—যেখানে হতাশা, বিরক্তি, ঘুমের সমস্যা, এমনকি অবসাদ পর্যন্ত হতে পারে। তাই পরিবারের ভেতরে দায়িত্ব ভাগাভাগি করা জরুরি, যেন একজন মানুষই সব চাপ নিতে না হয়। পাশাপাশি কেয়ারগিভারদের জন্য আলাদা সাপোর্ট গ্রুপ, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকাও সমান প্রয়োজন।
ফিজিওথেরাপির ভূমিকা: অনেক ক্ষেত্রেই ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি ও কগনিটিভ রিহ্যাবিলিটেশন রোগীর শরীর ও মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে। কারণ, ডিমেনশিয়া একবার শুরু হলে পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা যায় না, তবে ঝুঁকির অনেক কারণ আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। যেমন নিয়মিত শারীরিক অনুশীলন করলে রক্তসঞ্চালন ভালো থাকে এবং মস্তিষ্ক সক্রিয় হয়।
কীসে কমে ভুলে যাওয়ার ঝুঁকি: উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল, স্থূলতা—এসব নিয়ন্ত্রণে রাখলে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমে। ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান এড়ানো, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক চাপ কমানো মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। একইভাবে নিয়মিত মানসিক ব্যায়াম, নতুন কিছু শেখা, সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং পরিবার ও সমাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা ডিমেনশিয়া প্রতিরোধে সহায়ক।