


পরামর্শে এনআরএস মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের গাইনিকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডাঃ পল্লব মিস্ত্রী।
বয়স কম হোক বা বেশি, ওজন বেশি থাকলে সব মহিলাই তা কমাতে চেষ্টা করেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ডায়েট কন্ট্রোল করেই ওজন কমানোর চেষ্টা করেন। অথচ কেউ কেউ এমনও আছেন, দেখা যায় শরীরে কোনও কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে ওজন বেড়ে যাচ্ছে। অনেক চেষ্টা করেও তা কমাতে পারছেন না? এর পেছনে প্রধান কারণ হতে পারে থাইরয়েডের অসুখ। প্রশ্ন হল থাইরয়েড কী? থাইরয়েড আমাদের গলার কাছে থাকা একটি ছোট গ্রন্থি, যা আমাদের শরীরের মেটাবলিজম বা বিপাক ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। যখন এই গ্রন্থি যথেষ্ট পরিমাণ হরমোন তৈরি করতে পারে না, তখন তাকে হাইপোথাইরয়েডিজম বলা হয়।
হাইপোথাইরয়েডিজমের কারণে বিপাক ক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। এর ফলে শরীর ক্যালোরি কম পোড়ায় এবং অতিরিক্ত ক্যালোরি ফ্যাট হিসাবে জমা হতে থাকে। এর ফলে নিয়মিত ডায়েট বা ব্যায়াম করেও ওজন কমানো কঠিন হয়ে যায়। এই কারণেই ওজন বৃদ্ধিও হাইপোথাইরয়েডিজমের একটি প্রধান লক্ষণ, কিন্তু এটিই একমাত্র লক্ষণ নয়। আরও বেশ কিছু উপসর্গ দেখে রোগী বুঝতে পারেন থাইরয়েডের সমস্যা হওযার আশঙ্কা আছে কি না।
হাইপোথাইরয়েডিজমের উপসর্গ
ক্লান্তি: সারাদিন দুর্বল লাগে। ক্লান্তিবোধ ঘিরে থাকে শরীর। পর্যাপ্ত ঘুমের পরেও সতেজ বোধ হয় না।
শীতলতা: হাইপোথাইরয়েডের রোগীর সাধারণের তুলনায় শীতভাবে বেশি লাগে।
শুষ্ক ত্বক ও চুল: রোগীর ত্বক রুক্ষ হয়ে যাওয়া, চুল পড়া বা চুলের আগা ফেটে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা যেতে পারে।
স্মৃতিশক্তির সমস্যা: কোনও কিছু মনে রাখতে অসুবিধা হওয়া, মনঃসংযোগের অভাব দেখা যেতে পারে রোগীর মধ্যে।
কোষ্ঠকাঠিন্য: কিছু রোগীর কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ভোগার মতো জটিলতাও দেখা যেতে পারে।
মেনস্ট্রুয়েশনে অনিয়ম: মেয়েদের ক্ষেত্রে মেনস্ট্রুয়েশনে অনিয়ম বা অতিরিক্ত রক্তপাতের মতো সমস্যাও দেখা যেতে পারে।
ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা: হরমোনের তারতম্যের কারণে মন খারাপ বা বিষণ্ণতার মতো জটিলতাও দেখা যেতে পারে।
অতএব এমন একাধিক লক্ষণ শরীরে প্রকাশ পেলে শুধু ডায়েট নিয়ে চিন্তা না করে একজন চিকিত্সকেরও পরামর্শ নেওয়া দরকার। চিকিত্সক রোগীকে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন (টিএসএইচ) এর মাত্রা দেখার কথা বলতে পারেন। এই পরীক্ষার ফলাফল থেকেই বোঝা যায় রোগীর হাইপোথাইরয়েডিজম আছে কি না।
যদি হাইপোথাইরয়েডিজম ধরা পড়ে, তাহলে চিন্তার কিছু নেই। সঠিক চিকিৎসা এবং ওষুধ সেবনের মাধ্যমে এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। চিকিত্সক সাধারণত থাইরয়েড হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির পরামর্শ দেন রোগীকে। এক্ষেত্রে রোগীকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট ডোজের ওষুধ খেতে হয়। এই ওষুধ নিয়মিত সেবন করলে বিপাক ক্রিয়া স্বাভাবিক হয় এবং ওজন কমানোর প্রক্রিয়া সহজ হয়।
সুতরাং, শুধু ডায়েট করেও যদি ওজন না কমে, তবে তা হাইপোথাইরয়েডিজমের লক্ষণ হতে পারে।
মহিলাদের বিপদ
হাইপোথাইরয়েডিজম মহিলাদের ক্ষেত্রে বিশেষ বিপত্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ হাইপোথাইরয়েডিজম এবং তার কারণে সৃষ্ট স্থূলত্ব মহিলাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে, উদাহরণ হিসেবে হৃদরোগ, বন্ধ্যাত্ব, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, স্নায়ু সমস্যা, গলগণ্ড, গর্ভকালীন জটিলতা, এমনকী গর্ভবতী মহিলাদের হাইপোথাইরয়েডিজম থাকলে তা প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া (গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধি ও খিঁচুনি), গর্ভপাত, অকাল প্রসব এবং শিশুর জন্মগত ত্রুটিওর কারণ হতে পারে।
লিখেছেন: সুপ্রিয় নায়েক