


কয়েক বছর আগেই মহাত্মা গান্ধীর সার্ধশতবর্ষ পেরিয়ে এসেছি আমরা। সেই উপলক্ষ্যে এক বিশেষ উদযাপনের আয়োজন করেছে টিআরআই আর্ট অ্যান্ড কালচার সংস্থা। এখানে খাদি মসলিন শাড়ির উপর টেক্সটাইল ডিজাইনার গৌরাঙ্গ শাহ ফুটিয়ে তুলেছেন রাজা রবি বর্মার শিল্পচিত্র। এই কাজটা তিনি করিয়েছেন অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দা কিছু মহিলাকে দিয়ে। এই মহিলাদের তাঁত বোনা বিষয়ে সম্যক কোনো ধারণাই ছিল না। তাঁদেরই একজন মনসা পালেল্লা। তিনি জানালেন, এই প্রশিক্ষণের আগে তাঁরা কেউ ভাবতেই পারেননি এমন সূক্ষ্ম কাজে তাঁরা অংশগ্রহণ করতে পারবেন। ‘আমাদের গ্রামে যখন প্রথম মাস্টারমশাই এই প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন তখন আমরা সকলেই একটু সংকোচ বোধ করেছিলাম। যে কাজ জানিই না, তা শিখে কতটা নিপূণভাবে করতে পারব সেই নিয়ে বেশ দ্বন্দ্ব ছিল মনে। কিন্তু মাস্টারমশাই আমাদের ভরসা দেন। এবং ওঁর ভরসায় ভর দিয়েই আমরা মেয়েরাও কাজটা শেখার আগ্রহ দেখাই। আমরা সকলে একজোট হয়ে নিজেদের সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে কাজটা শিখেছি। আর সেই কারণেই যখন শাড়িগুলো তৈরি হয়েছে তখন আমাদের কাছে তা স্বপ্নপূরণের মতো। এ যেন আমাদের নিজস্ব অনুভূতি। নিজেদের সাফল্য প্রদর্শনের জায়গা। অর্থ দিয়ে এই অনুভূতি কোনো ভাবেই মাপা যায় না’, বললেন তিনি।
এই প্রসঙ্গেই গৌরাঙ্গ শাহ বলেন, ‘কাজটা সহজ ছিল না। এমন এক দল মহিলা যাঁরা তাঁত ও শাড়ি বোনা বিষয়ে প্রায় কিছুই জানেন না, তাঁদের দিয়ে এমন সূক্ষ্ম নকশা তোলানো বেশ কঠিন জিনিস। কিন্তু আমরা সকলেই নিজেদের কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান থেকেছি, তাই এই কাজটা সম্ভব হয়েছে।’ জামদানি তাঁর কাছে একটা অনুভূতি, একটা আবেগ। ফলে সেই কাজ যখন তিনি শুরু করলেন তখন এমন কারিগরদের দিয়ে কাজ করাতে চেয়েছিলেন, যাঁরা এ বিষয়ে আনকোরা। তবে এই কাজে কিছু চ্যালেঞ্জও ছিল। যেমন তাঁতের টানাপোড়েন, বুনন, সুতোর কাউন্ট ইত্যাদি একেবারে গোড়া থেকেই শেখাতে হয়েছে। গৌরাঙ্গ জানালেন, তাঁর সৌভাগ্য যে এই মহিলারা কাজের প্রতি একশো শতাংশ সৎ থেকে কাজটি শিখেছেন এবং করেছেন। প্রথম দিকে এই মহিলাদের সঙ্গে গৌরাঙ্গবাবুর একটা দূরত্ব ছিল। একটা সংকোচ কাজ করেছে তাঁদের মধ্যে। কিন্তু কাজ যত এগিয়েছে দূরত্ব ততই কমে গিয়েছে। গৌরাঙ্গবাবু বললেন, ‘একটা সময়ের পর আমি বুঝতে পারলাম মেয়েদের হাত আমার মুখের ভাষা অনুযায়ী কাজ করছে। আমি যা বলছি, নিখুঁতভাবেই সেটা বুঝে তাঁতে বুনতে পারছেন ওঁরা।’ প্রতিটি শাড়ি শেষ হওয়ার মুহূর্তটা শিল্পী এবং কারিগরদের কাছে ব্যক্তিগত অনুভূতির একটা জায়গা হয়ে উঠেছিল। আর সেই কারণেই তা আর সাধারণ জামদানি থাকেনি, বরং একটা শিল্প হয়ে গিয়েছে।
রাজা রবি বর্মার ছবি নিয়ে কাজ করার কথা ভাবলেন কেন? শিল্পী জানালেন, রাজা রবি বর্মাই প্রথম শিল্পী যিনি আমাদের দেশে মানবদেহ নিয়ে চিত্রকলা তৈরি করেছেন। এই কাজকে একটা বিশেষ মাত্রা দেওয়ার জন্যই তাঁর ছবিগুলো লিথোগ্রাফিক স্টোনে তুলে সেই নকশা তাঁতে বোনার ভাবনা এসেছিল গৌরাঙ্গবাবুর মাথায়। ভারতীয় সনাতনি ঐতিহ্যের সঙ্গে খাদির যোগাযোগ, গান্ধীজির জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন সব মিলিয়ে শাড়িগুলোকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন শিল্পী। এটা পরীক্ষামূলক কাজ হিসেবেই বিবেচ্য। এতে আপাতত ব্যবসায়িক দিকটা ঢোকানো হয়নি।