


সংবাদদাতা, বাগমুণ্ডি: ‘পেটের জ্বালায় ছোট ছেলেটাকে ভিনরাজ্যে কাজে পাঠিয়েছিলাম। সেখানে কয়েকজন ওকে খুব মেরেছে। ছেলেটা এখনও বাড়ি ফেরেনি। পুলিশ বলছে আসবে। কিন্তু মায়ের মন তো মানে না। সবসময় শুধু ছেলের চিন্তাই হচ্ছে। কতক্ষণে ছেলেটাকে দেখব...’ কান্নাভেজা গলায় বলছিলেন সাহাবিদা বিবি। সংসারের অভাব ঘোচাতে তাঁর ১৪বছরের নাবালক ছেলে প্রথমবার বাড়ি ছেড়ে ছত্তিশগড়ে পাড়ি দিয়েছিল। সেখানে কাজ জুটেছিল। কিন্তু, শুধুমাত্র মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলার ‘অপরাধে’ ওই কিশোর সহ পুরুলিয়ার আটজন পরিযায়ী শ্রমিককে চরম নিগ্রহের শিকার হতে হল। এনিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে।
বিজেপি শাসিত রাজ্য ছত্তিশগড়ে ফের আক্রান্ত হলেন বাংলার শ্রমিকরা। এবার ঘটনাস্থল রায়পুর জেলার কোতোয়ালি থানার সুরজপুর এলাকা। অভিযোগ, বাংলাদেশি সন্দেহে স্থানীয় বজরং দলের কর্মীরা নির্মমভাবে পিটিয়েছে পুরুলিয়ার এই আট সংখ্যালঘু কিশোর ও যুবককে। শেখ জসীম নামে এক শ্রমিকের হাতে গুরুতর চোট লাগে। প্রাণ বাঁচাতে শ্রমিকরা নিজেদের পরিচয়পত্র দেখান। হিন্দিতে কথা বলারও চেষ্টা করায় তাঁদের ‘পাকিস্তানি’ বলে দাগিয়ে দিয়ে খুনের হুমকি দেওয়া হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মাস দু’য়েক আগে মফস্সল থানার চেপড়ি, তেঁতলো এবং আড়ষা থানার ভুরসু গ্রাম থেকে মোট আটজন কিশোর ও যুবক ছত্তিশগড়ে একটি পাউরুটির কারখানায় কাজ করতে যান। গত রবিবার কাজের বকেয়া পারিশ্রমিক চাওয়া নিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঝামেলা হয়। অভিযোগ, তারপরই বজরং দলের ৫০-৬০জন সদস্য লাঠিসোঁটা নিয়ে কারখানার গেটের সামনে বসে থাকা শ্রমিকদের উপর চড়াও হয়। আচমকা আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়েন শ্রমিকরা। বাংলায় কথা বলায় তাঁদের ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে শ্রমিকদের উদ্ধার করে। পরে পুরুলিয়া জেলা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে। নথিপত্র যাচাই করে তারা নিশ্চিত হয়, শ্রমিকার প্রত্যেকেই ভারতীয় এবং পুরুলিয়ার বাসিন্দা। প্রশাসনিক তৎপরতায় শেখ আসলাম, শেখ বাবিন ওরফে শরিফুল, শেখ জুলফিকার এবং শেখ জসীমকে উদ্ধার করে গ্রামে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তাঁরা বর্তমানে সুস্থ থাকলেও আতঙ্কে সিঁটিয়ে আছেন। আইনি জটিলতায় নাবালক শ্রমিকদের ফেরানো সম্ভব হয়নি। তারা সেখানকার পুলিশের অধীনেই রয়েছে।
শেখ আসলাম বলেন, আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে গেটের বাইরে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। আচমকা বজরং দলের ৫০-৬০জন এসে আমাদের বাংলাদেশি বলে পেটাতে শুরু করে। আমরা ভারতীয় পরিচয়পত্র দেখানোয় পাকিস্তানি বলে গালাগালি দিতে শুরু করে। মেরে দেব, কেটে দেব বলতে থাকে। আমরা আর কখনও ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাব না। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে আমাদের একটাই আর্জি, তিনি যেন আমাদের বাংলাতেই কাজের ব্যবস্থা করে দেন।
পুরুলিয়া জেলা পুলিশ সুপার বৈভব তিওয়ারি বলেন, ঘটনার খবর পাওয়ামাত্রই আমরা ছত্তিশগড় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করি। চারজন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিককে ইতিমধ্যেই ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বাকি চারজন নাবালক হওয়ায় আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে তাদের দ্রুত পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। জেলা যুব তৃণমূলের সহ সভাপতি বিকাশ মাহাত বলেন, মেরুকরণের রাজনীতি করতে বিজেপি পরিকল্পিতভাবে বাঙালিদের টার্গেট করছে। যদিও জেলা বিজেপির মিডিয়া ইনচার্জ জয়দীপ্ত চট্টরাজ বলেন, কাজটা ঠিক হয়নি। কিন্তু রাজ্যে যেভাবে অবাঙালিদের উপর অত্যাচার হয় তার প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন এটি।