


সঞ্জয় গঙ্গোপাধ্যায়, বারাকপুর: শ্যামনগরের টোল বেশ বিখ্যাত। বহু নামকরা মানুষ সেই টোলে পড়িয়েছেন এবং পড়েছেন। শ্যামনগরের দেবব্রত ভট্টাচার্যদের বনেদি বাড়িটি বড়বাড়ি বলে পরিচিত। একসময় সেখানে টোল চলত। সেই বাড়িতে দুর্গাপুজোর ইতিহাস নিয়েও চর্চা চলে মানুষের মধ্যে। তাদের পুজো এবার ৩৩৩ বছরে পড়ল। পুজোর অন্যতম বিষয়টি হল, দশমীতে ইলিশ মাছ ও পান্তা ভোগ। তন্ত্রমতে পুজো হয়। দুর্গাকে প্রথমে বাড়ির ছেলেরা বরণ করেন, তারপর মহিলারা। এরপর কাঁধে করে গঙ্গায় দেওয়া হয় বিসর্জন। বাড়ি থেকে গঙ্গা প্রায় পনেরো মিনিটের পথ। জয়দেব মুখোপাধ্যায়দের বংশ দীর্ঘদিন ধরে পুজো করছেন। আজ অবশ্য সে বনেদিয়ানা কালের গর্ভে তলিয়ে গিয়েছে। শুধু টিঁকে আছে সাবেকি পুজোর রীতি। শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে শাক্তমতে এখানে পুজো হয়। জন্মাষ্টমীতে বাঁশ পুজো করে সূচনা। সেই বাঁশ দিয়ে তৈরি হয় প্রতিমার কাঠামো। মূর্তি একচালা ডাকের সাজের হত একসময়। বর্তমানে কিছুটা পাল্টেছে কারণ কারিগর পরিবর্তন হয়েছে। চালচিত্র সেই সময় থেকেই ত্রিচালা ত্রিকোণ আকৃতির। এখন প্রতিমা অন্য জায়গায় তৈরি হয়। পঞ্চমীতে দেবী আসেন বড়বাড়ি। দশভুজাকে পরানো হয় সাবেক আমলের গয়না। পরিবারের অনেকে কর্মজগতে সাফল্য অর্জন করে গহনা উৎসর্গ করেন। পূজোর পাঁচদিন পঞ্চ উপাচারে আরাধনা। সন্ধিপুজো ও নবমীর পুজো হয় ষোড়শোপচারে।
আগে সপ্তমী, অষ্টমী ও মহানবমীতে পাঁঠা বলি হত। এখন হয় চালকুমড়ো, আখ বলি। এছাড়া প্রতিদিনই বেলা ১১টায় খিচুড়ি, পাঁচরকম ভাজা, মাছভাজা দেওয়া হয়। দু’টোর সময় সাদা ভাত, পাঁচরকমের ভাজা, মোচা, ফুলকপির ডালনা, আমের চাটনি, পায়েস, মাছ ভোগ দেওয়ার রীতি। বাড়ির পুকুর থেকে মাছ তুলে দেওয়া হয় দেবীকে আর রাতে লুচি, সুজি, হালুয়া, মিষ্টি ও নারকেল নাড়ু। পুজোর দিন বাড়ির মহিলারা ছাড়াও বাড়ির ছেলেরা কাজে হাত লাগান। মেয়েরা শ্বশুরবাড়ি থেকে বড়বাড়িতে আসবেন, প্রতি বিবাহের আগে হয় এই অলিখিত চুক্তি। আগে সন্ধ্যায় দুর্গাদালানে হত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মন্দিরের সামনে বাঁধানো মঞ্চ থাকত। বাংলার নামকরা শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করতেন। সেই মঞ্চের এখন ভগ্নদশা। সবই আজ ইতিহাস। এই ক’দিন বড়বাড়ির সমস্ত শরিক আসেন। পড়শি, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবাই যোগ দেন পুজোতে। অষ্টমীতে মাছ খাওয়ার রীতি। দশমীতে বিসর্জনের প্রস্তুতি শুরু হয় সেদিন সকাল থেকেই। সন্ধ্যায় বাড়ির ছেলে, জামাইরা কাঁধে দেবীকে নিয়ে শ্যামনগর কালীবাড়ি ঘাটে যান বিসর্জন দিতে। বাড়ির সদস্য দেবব্রত ভট্টাচার্য বলেন, ‘ষষ্ঠী বাদে আমাদের রোজই আমিষ ভোগ।’ নিজস্ব চিত্র