


বড়ো বেসরকারি ব্যাংকে দু’বছরের স্থায়ী আমানতে সুদ মিলছে প্রায় ৬.৩ থেকে ৭ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে প্রায় ৬.৪৫ থেকে ৭.১ শতাংশ। এই হার বাড়েনি। অথচ ব্যাংকের মুনাফা বাড়ছে। সঙ্গে ঋণের কিস্তিও। বাড়ি-গাড়ি কেনার ঋণ নিলে রেপো রেট ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তি টাকা গুনতে হবে, অথচ অবসরপ্রাপ্ত মানুষটি তাঁর সারা জীবনের সঞ্চয় ব্যাংকে রেখে বাড়তি আয়ের আশা করতে পারবেন না! আবার ব্যাংকের শাখার লাইনের বাইরের দুনিয়ায় ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার ঘটেছে। সেই লেনদেনেই মাশুল বসিয়ে লাভের মুখ দেখতে বদ্ধপরিকর সরকার। উৎসব মরশুমে ব্যবসায়ীদের চাপে সামান্য পিছোলেও, ইউপিআইতে এমডিআর বসবেই দীপাবলির পর। আর এই ব্যাংকঋণে ইএমআই বেড়ে যাওয়া, ইউপিআইতে ২০০০ টাকার বেশি লেনদেনে ব্যবসায়ীদের উপর মাশুল—উভয় ক্ষেত্রেই কোপ পড়বে কার উপর? ঘুরিয়ে হোক বা সরাসরি আম জনতার ঘাড়ে।
রিজার্ভ ব্যাংক রেপো রেট ৫.২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫.৫০ শতাংশ করতেই এক মুহূর্ত দেরি করেনি ব্যাংকগুলি। ঋণের সুদ তারা বাড়িয়ে দিয়েছে ০.২৫ শতাংশ। ধরুন, কেউ ৩০ লক্ষ টাকা গৃহঋণ নিয়েছেন ২০ বছরের জন্য। এবার ব্যাংক সুদের হার বাড়ালে তাঁর মাসিক কিস্তি কয়েকশো টাকা বাড়তে পারে। ঋণের অঙ্ক ও মেয়াদ বেশি হলে সেই আর্থিক বোঝাও বেশি হবে। মাসে কয়েকশো টাকা শুনতে যতই সামান্য লাগুক, সংসারে বাজার-দোকান, ওষুধ, বিদ্যুতের বিল, সন্তানের পড়াশোনার খরচ মিটিয়ে যে পরিবার মাসের শেষে হিসাব মেলাতে হিমশিম খায়, তার কাছে সেটুকুও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের প্রশ্নটাও যুক্তিসংগত হল, রেপো রেট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঋণের সুদ বাড়াতে ব্যাংকগুলির এত তৎপরতা আমানতের সুদের ক্ষেত্রে দেখা যায় না কেন? রেপো রেট বাড়তে আমানতের সুদও সামান্য হলেও বৃদ্ধি পাওয়া উচিত নয় কি? সেক্ষেত্রে তারা এত উদাসীন কেন? ব্যাংকগুলি মাঝেমধ্যে অবশ্য যুক্তি দেয়, নগদের জোগান যথেষ্ট। তাই আমানত সংগ্রহের জন্য সুদ বাড়ানোর তাড়া নেই। কেন একথা বলতে পারে তারা? ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ১২টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সম্মিলিত মুনাফা ছিল ১ লক্ষ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। আগের আর্থিক বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে তা পৌঁছে গিয়েছে রেকর্ড ১ লক্ষ ৯৮ হাজার কোটি টাকায়। একা স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার মুনাফাই ৭০ হাজার ৯০১ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে যে ব্যাংকগুলি সম্মিলিতভাবে ৮৫ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান করেছিল, তারাই এখন লাভের শিখরে। ব্যাংকের এই ঘুরে দাঁড়ানো নিশ্চয়ই ইতিবাচক। কিন্তু সেই সাফল্যের সুফল গ্রাহকের কাছে পৌঁছাবে না কেন? ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য। ইউপিআই পেমেন্ট জনপ্রিয় করতে এত দিন সরকারই নগদহীন অর্থনীতির পক্ষে প্রচার চালিয়েছে। কিন্তু এবার দু’হাজার টাকার বেশি ব্যবসায়িক ইউপিআই লেনদেনে বসছে ০.৪ শতাংশ মাশুল। আজ, বৃহস্পতিবার থেকেই ব্যবসায়ীদের জন্য এটি চালু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উৎসব মরশুমে ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত আপত্তিতে তা সাময়িকভাবে পিছিয়েছে। মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে সরকারি তরফে জানানো হয়, দীপাবলির পর মাশুল চালু হবে। তবে নির্দিষ্ট দিন জানানো হয়নি। ধরুন, কোনো দোকানে একজন ক্রেতা ইউপিআইয়ে ৫ হাজার টাকা দিলেন। ০.৪ শতাংশ হারে ২০ টাকা মাশুল কাটা হবে ব্যবসায়ীর অ্যাকাউন্ট থেকে। এই খরচ ক্রেতার উপর চাপবে না, এটা নিশ্চিত করবে কে?
দু’টি ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র স্পষ্ট। ব্যাংকের মুনাফা বাড়াতে ঋণগ্রহীতার পকেটে চাপ বাড়ছে। আবার ডিজিটাল লেনদেনের খরচ তুলতে ব্যবসায়ীর উপর কোপ। উভয় ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত চাপে পড়বেন সাধারণ মানুষ। অথচ সরকার উন্নয়নের সাফল্য বোঝাবে মুনাফা, লেনদেনের পরিমাণ আর ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রসারের হিসাব সামনে রেখে। মানুষের সংসারের হিসাবটা সেখানে কোথায়? ব্যাংকের এই সীমাহীন লাভের সুফলই বা পাচ্ছে কে? অর্থনীতির সাফল্য যদি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও ব্যয়বহুল করে তোলে, তাহলে তো মুশকিল! সব কিছুর শেষে সাধারণ মানুষকেই বিল মেটাতে হবে কেন?