


শ্রীকান্ত পড়্যা, তমলুক: বিপ্লবের আঁতুড়ঘর ছিল অবিভক্ত মেদিনীপুর। দেশের জন্য মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছেন বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী। ক্ষুদিরাম বসু, মাতঙ্গিনী হাজরা, সতীশচন্দ্র সামন্ত, অজয়কুমার মুখোপাধ্যায় ও সুশীল ধাড়ার মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীরা উপহার দিয়েছেন এই মাটি। বীর বিপ্লবীদের সংগ্রামের মধ্য দিয়েই কাঙ্খিত স্বাধীনতা এসেছিল। এই মেদিনীপুরের মাটি থেকেই এক বঙ্গসন্তান দেশের সংবিধান রচনায় গুরুদায়িত্ব পালন করেন। তিনি হলেন বসন্তকুমার দাস। খেজুরির এক প্রান্তিক জনপদ রামচকে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী বসন্তকুমার দাস। স্বাধীনতা আন্দোলনে জাতীয় কংগ্রেসের এই নেতা খেজুরি সহ গোটা কাঁথি মহকুমায় বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিতেন। আন্দোলনের সামনের সারিতে থেকেছেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ জুলাই গণপরিষদের সদস্য হিসেবে তাঁর জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই বসন্তবাবু স্বাধীন সার্বভৌম দেশ গড়ার কাজে গুরুদায়িত্ব পেয়েছিলেন। গণপরিষদের অন্যতম সদস্য হিসেবে খসড়া সংবিধান রচনার কাজে চেয়ারম্যান ডঃ বিআর আম্বেদকরের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। সংবিধান রচনায় তাঁর পরামর্শ গৃহীত হয়। অবিভক্ত মেদিনীপুর দেশের সংবিধান রচনায় এই কারিগরকে নিয়ে গর্ব অনুভব করে।
১৮৯৮ সালের ১ মার্চ খেজুরির রামচক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বসন্তকুমার দাস। কাঁথি হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করার পর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হন। সেখানে পড়াকালীন অনুশীলন সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে ওঠে। কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হন। ১৯১৬ সালে বোমা মামলায় জড়িয়ে দু’বছরের জেল হয়। ১৯৩০ সালে জেলা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে বারবার জেল খাটতে হয়। ১৯৪৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর গান্ধীজি কাঁথিতে এলে সেসময় অভ্যর্থনা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন বসন্তকুমার। ১৯৫২ সালে কাঁথি লোকসভা থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালে তাঁর উদ্যোগে খেজুরিতে তৈরি হয় খেজুরি আদর্শ বিদ্যাপীঠ ও সুভাষ শিল্পভারতী। ১৯৬১ সালে তাঁর নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে খেজুরি আদর্শ বালিকা বিদ্যাপীঠ। কাঁথি মহকুমায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
বসন্তকুমার দাসের সঙ্গে সতীশচন্দ্র সামন্তের অদ্ভুত মেলবন্ধন ছিল। দু’জনেই অধুনা পূর্ব মেদিনীপুরের। একজন কাঁথি, অপরজন তমলুক থেকে লোকসভায় নির্বাচিত। দু’জনের দিল্লির ঠিকানা– ৭নম্বর ইলেক্ট্রিক লেন। বসন্তকুমার বয়সে দু’বছরের বড় হওয়ায় সতীশচন্দ্র তাঁকে ‘বসন্তদা’ বলে ডাকতেন। আর বসন্তকুমার সম্বোধন করতেন ‘সতীশবাবু’ বলে। ১৯২১ সালে দু’জনেই অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন। স্বদেশমুক্তির প্রতিজ্ঞা তাঁদের কাছাকাছি এনেছিল। স্বাধীনতা সংগ্রাম ছাড়াও তাঁরা গঠনমূলক কাজে নিজেদের উজাড় করে দেন। গান্ধীজির নেতৃত্বে দু’জনেই অহিংস সত্যাগ্রহী। বারবার কারাবাস বরণ করেছেন। ১৯৪৭ সালে গণপরিষদের সদস্য এবং প্রভিশনাল ও প্রথম লোকসভার নির্বাচিত সদস্য।
প্রাক্তন বিধায়ক তথা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ব্রহ্মময় নন্দ বলেন, যেকোনও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সংবিধান হল দেশের সর্বোচ্চ আইন। এই সংবিধান রচনায় বসন্তকুমার দাস ও সতীশচন্দ্র সামন্তের ভূমিকা ছিল। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের সংবিধান গ্রহণ করা হয়। আমরা প্রতিবছর এই দিনটা সাধারণতন্ত্র দিবস হিসেবে পালন করি। সেইসঙ্গে সংবিধান রচনায় আমাদের জেলায় যাঁদের নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে, তাঁদেরও স্মরণ করা উচিত।
খেজুরির ইতিহাস সংরক্ষণ সমিতির সম্পাদক পার্থসারথী দাস বলেন, আমরা রামচক গ্রামে বসন্তকুমার দাসের একটি মূর্তি স্থাপন করেছি। তাঁর রচিত পুস্তক সংরক্ষণে জোর দেওয়া হয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই খেজুরির মাটিতে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস সঠিকভাবে জানে না। আমরা সুযোগ পেলেই এই বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা, সভা ইত্যাদি করি।