


চিনি দিয়ে ত্বক ও চুলচর্চার ম্যাজিক জানলে এই উপাদানই হয়ে উঠবে আপনার বন্ধু। পরামর্শে রূপবিশেষজ্ঞ কেয়া শেঠ।
সেই কবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে!’ আধুনিক যুগে যদিও চিনিকে না চিনে উপায় নেই। চিনি এমনই এক উপকরণ যার প্রয়োজন আমাদের খাবারের প্লেট ছাড়িয়ে অন্যত্র ছড়িয়ে পড়েছে।
খাবার হিসেবে চিনি আদৌ ভালো কি না, এই নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যেও নানা মতভেদ। চিনির বিকল্প কিছু রাখতে হবে কি খাদ্যতালিকায়? এই বিষয়ে আলোচনার অন্ত নেই। তবে চিনির কদর গৃহস্থ বাড়িতে শুধু খাওয়ার জন্যই নয়, বরং চিনির কাজের তালিকা বেশ লম্বা। তার মধ্যে রূপচর্চাও অন্যতম। রান্না ঘরের এই সাধারণ উপকরণেই ত্বকে মিলতে পারে তারুণ্যের ছোঁয়া। চিনিতে থাকে প্রাকৃতিক গ্লাইকোলিক অ্যাসিড। যা ত্বক ও চুলের জন্য খুব কার্যকর। স্কিন কেয়ার, হেয়ার কেয়ার এবং বডি কেয়ারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে চিনির ভূমিকা তাই গুরুত্বপূর্ণ।
ত্বকচর্চা বিশেষজ্ঞদের মতে, চিনিকে ত্বক পরিচর্যায় সবথেকে ভালো ব্যবহার করা যায় স্ক্রাবার হিসেবে। এই স্ক্রাবার কেনারও ঝঞ্ঝাট নেই। কয়েক মুঠো চিনি দিয়েই সারতে পারেন কাজ। তাই বাড়তি খরচের প্রশ্নই নেই। চিনি দিয়ে রূপচর্চা প্রসঙ্গে কেয়া শেঠ জানালেন, ‘ঘরোয়া উপায়ে রূপচর্চার কথা বললে চিনি তার অন্যতম উপাদান। বিশেষ করে ত্বকের কালো দাগছোপ তুলতে বা দীর্ঘদিনের ট্যান তুলতে চিনি কাজে আসে। পাতিলেবুর রসের সঙ্গে হালকা দানাওয়ালা চিনি মিশিয়ে স্ক্রাবিং তো যুগ যুগ ধরেই হয়ে আসছে। কনুই, আন্ডারআর্মের কালো দাগ তুলতে এই স্ক্রাবার বেশ উপযোগী। চিনি দানাদার পণ্য হওয়ায় স্ক্রাবিংয়েই মূলত কাজে আসে। কিছু কিছু ফেসপ্যাকেও চিনি ব্যবহার করা হয়।’
বাড়িতেই বানিয়ে ফেলুন স্ক্রাবার
প্রথমেই চিনি গুঁড়ো করে নিন। একেবারে পাউডার করে নয়। যাতে হাতে হালকা দানা ভাব থাকে তেমনভাবে গুঁড়িয়ে নিতে হবে। এবার চিনি গুঁড়োর মধ্যেই অল্প মধু দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিন। এরপর হালকা হাতে ওই মিশ্রণটি মুখে ঘষতে থাকুন আর তুলে ফেলুন আপনার মুখে জমে থাকা মৃতকোষ। কালো শুষ্ক ঠোঁটের জন্য এই ঘরোয়া পরিচর্যা হতে পারে সবথেকে সেরা উপায়। নামীদামি কোম্পানির ত্বক পরিচর্যার সামগ্রীকেও পিছনে ফেলে দিতে পারে এই গুঁড়ো চিনির স্ক্রাবার। যাঁদের ত্বকে মধু সহ্য হয় না, তারা পাকা কলার সঙ্গে চিনির গুঁড়ো মিশিয়ে নিঃসন্দেহে ব্যবহার করতে পারেন। সপ্তাহে একদিন করে নিয়মিত এই স্ক্রাবার ব্যবহার করলে মুখের ট্যান অনেকটা দূর হবে। শুধুমাত্র মুখের ত্বকে নয়, হাতে এবং পায়ের জন্যও চিনিকে ব্যবহার করতে পারেন।
ত্বকে চিনির ব্যবহার
• বেশ খানিকটা গুঁড়ো চিনি, নারকেল তেল, অল্প একটু মধু, কফি পাউডার এবং আপনার পছন্দমতো সামান্য একটু বডিওয়াশ ভালো করে মিশিয়ে নিয়ে রোজ স্নানের সময় ব্যবহার করুন। কফি ও নারকেল তেল চিনির সঙ্গে যুক্ত হলে তার কার্যকরী গুণ হয়ে ওঠে আরও ভালো। হাত পায়ের ট্যান তুলতে ও কালচে ভাব দূর করতে এই মিশ্রণ সবচেয়ে ভালো কাজ দেয়।
• ১ চা চামচ চিনির সঙ্গে ১ চা চামচ নারকেল তেল বা অলিভ অয়েল এবং কয়েক ফোঁটা লেবুর রস মিশিয়ে মুখে দুই-তিন মিনিট আলতোভাবে ম্যাসাজ করুন। তারপর উষ্ণ জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এটি সপ্তাহে একবার ব্যবহার করা যেতে পারে।
• ১ চামচ চিনি ও ১ চামচ মাখন মিশিয়ে ব্যবহার করলে ঠোঁটের কালো দাগ অনেকটা চলে যায়। ঠোঁট নরম হয়।
সতর্কতা
যাঁদের ত্বক খুব সংবেদনশীল, তাঁরা চিনি দিয়ে স্ক্রাব করা এড়িয়ে চলুন। কারণ এটি ত্বকে জ্বালা বা লালভাব তৈরি করতে পারে। তবে একটা ভুল সামলে চলুন। স্ক্রাবিংয়ের সময় খুব জোরে ঘষাঘষি করবেন না। এতে ত্বক ছিঁড়ে যেতে পারে।
চুল পরিচর্যায় চিনি
শুধু ত্বক নয়, চুলের পরিচর্যাতেও কিন্তু চিনির গুরুত্ব অপরিসীম। চুলের ঘনত্ব বাড়াতে, চুলের প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহে চিনি আপনার বিশ্বস্ত বন্ধু!
• শ্যাম্পু করার সময় শ্যাম্পুর সঙ্গে মিশিয়ে নিন চিনি। মাথার ত্বকে হালকা হাতে মাসাজ করুন। চিনির দানা মাথার ত্বক অর্থাৎ স্ক্যাল্পকে এক্সফোলিয়েট করবে, রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে সাহায্য করবে। যা চুল গজাতে সাহায্য করবে। শুধু তা-ই নয়, এতে মাথার ত্বকের মৃতকোষ ঝরে যায়। ফলে খুশকির সমস্যা কমে।
• ব্রাউন সুগার বা সাধারণ চিনির সঙ্গে নারকেল তেল বা অলিভ অয়েল মিশিয়ে চুলে ম্যাসাজ করুন। এটি চুলকে আর্দ্র করে এবং চুলের গোড়া মজবুত করে।
• চিনি ব্যবহারের ফলে চুল হাইড্রেটেড থাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে। স্নানের আগে চিনির গুঁড়ো অলিভ অয়েলের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করতে পারেন। তাতে চুল হাইড্রেটেড থাকবে। কারও কারও ক্ষেত্রে শ্যাম্পু করার পর চুল খুব শুষ্ক হয়ে যায়। শ্যাম্পুর সঙ্গে চিনি মেশালে চুল হবে আর্দ্র।
• অনেক সময় প্রচুর পরিমাণে চুল ঝরে চুল পাতলা হয়ে যায়। শ্যাম্পুর সঙ্গে চিনি মিশিয়ে চুলে লাগালে চুল ঘন ও মজবুত হয়।
কাজেই খাবার পাতে চিনি ব্রাত্য করলেও রূপচর্চার রুটিনে চিনি কিন্তু মারাত্মক উপকারী। তাই রান্নাঘরে চিনিকে ব্রাত্য করার আগে দু’বার ভাবুন।
কথিকা পাল