


ইতিহাসে পলাশীর যুদ্ধ এককথায় যেন ষড়যন্ত্রের যুদ্ধ। এর পশ্চাতে রয়েছে বিশ্বাসঘাতকতা আর ষড়যন্ত্রের নির্মম পরিণতি। মীরজাফর সে কারণেই আজও ‘নেমকহারাম’ বিশেষণেই পরিচিত। ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুর্শিদাবাদের অন্দরমহলের অনেক নাম। মীরজাফর, ঘসেটি বেগম, আজিমুন্নেসা— আরও কত।
দাদু আলিবর্দির আদরের নাতি সিরাজের হাতে মুর্শিদাবাদের শাসনভার তুলে দেওয়ায় চাপা বিদ্রোহ তৈরি হয়। বলা যায় বিদ্রোহের আগুনের ফুলকি তখনই প্রজ্জ্বলিত হয়। হিংসার আগুনে জ্বলতে থাকা মানুষ সিরাজের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক ঘুঁটি সাজাতে শুরু করেন। যা সিরাজ বুঝতে পারেননি। যুদ্ধে পরাজয়ের পর সিরাজ ষড়যন্ত্রের অভিসন্ধি বুঝতে পারেন। পরাজিত নবাব তখন থেকেই মৃত্যুভয়ে আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। প্রাসাদের অন্দরে অবিশ্বাস, হিংসা আর ষড়যন্ত্রের বাতাস বইতে থাকে। ষড়যন্ত্র এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে, এক দেওয়াল আর এক দেওয়ালকে সন্দেহের চোখে দেখে। তুচ্ছ কোনো শব্দ সিরাজের বুকে কম্পন তুলে দেয়। ভয়, আতঙ্কে খোলা তরবারি নিয়ে তিনি ছুটে যান অদৃশ্য শব্দের দিকে। চারপাশ থেকে ঘিরে ধরা মৃত্যুভয় সিরাজকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। মানসিক ও রাজনৈতিক ভাবে এক স্বাধীন নবাবের জীবন অন্ধকারের গভীরে ডুবতে থাকে।
বাংলা টকিজের প্রযোজনায় সম্প্রতি আকাদেমিতে মঞ্চস্থ হল নাটক ‘সিরাজ এবং’। নাট্য ভাবনা ও নির্দেশনার দায়িত্বে ছিলেন অবন্তী চক্রবর্তী। নাটকে সিরাজের ভূমিকায় সাহেব ভট্টাচার্য অসাধারণ। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গুরুগম্ভীর চরিত্রকে অভিনয় দক্ষতায় তিনি উতরে দিয়েছেন সফলভাবে। শারীরিক ভাষায় চরিত্রের অভিব্যক্তিকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন। ঘসেটি বেগমের চরিত্রে সেঁজুতি রায় মুখোপাধ্যায় অনবদ্য। তাঁর অভিনয়, সংলাপ পরিবেশন দর্শকদের মুগ্ধ করে। আমিনার চরিত্রে অর্পিতা গঙ্গোপাধ্যায়, মীরজাফরের চরিত্রে বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়, আজিমুন্নেসার চরিত্রে দেবলীনা ভট্টাচার্য, লুৎফুন্নেসার চরিত্রে সুস্মিতা দে যোগ্য সঙ্গত করেছেন। প্রত্যেকের অভিনয় দর্শকের মনে ছাপ রেখে যায়। তার সঙ্গে মঞ্চ, পোশাক ও আবহ পরিকল্পনা নাটককে পরিপূর্ণ করে তুলেছে। মঞ্চ ভাবনায় দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য, পোশাক পরিকল্পনায় নন্দিনী শর্মা ও আবহে শুভদীপ গুহ প্রশংসার দাবি রাখেন।
পরিচালক এই নাটকে সিরাজকে এক ট্র্যাজিক নায়ক হিসেবে তুলে ধরেছেন। যিনি বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের শিকার। এই নাটক থেকে স্বাধীনতার মূল্য সম্পর্কে এক গভীর বার্তা উঠে আসে।
তাপস কাঁড়ার