


তন্ময় মল্লিক, বর্ধমান: বাংলায় প্রথম দফার নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৯৩.১৯ শতাংশ। তাতেই বিজেপি লম্ফঝম্ফ শুরু করে দিয়েছে। বলছে, কাজ করেছে ‘অ্যান্টি ইনকামবেন্সি ফ্যাক্টর’। তৃণমূলের দাবি, এসআইআরের হয়রানির প্রতিবাদে ভোট হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সত্যিই কি খুব বেশি ভোট পড়েছে?
ভোটের রায় কোন দিকে যেতে পারে, তা বিশ্লেষণের আগে একবার অঙ্কটা কষা যাক! গত লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যের ভোটার ছিল ৭ কোটি ৬৪ লক্ষের মতো। ভোট পড়েছিল ৮০ শতাংশের কিছু কম। অর্থাৎ, গড়ে ১০০ জনের মধ্যে ৮০ জন ভোট দিয়েছিলেন। বাকি ২০ জন ভোট দেননি। মোট ভোটারের ৮০ শতাংশ ধরলে ২০২৪ সালে ভোট দিয়েছিলেন প্রায় ৬ কোটি ১১ লক্ষ ভোটার। এবার নির্বাচন কমিশন প্রায় ৯১ লক্ষ নাম বাদ দিয়েছে। মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ কোটি ৭৪ লক্ষ। গত লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে প্রায় ১৩ শতাংশ কম। অর্থাৎ ২০২৪ সালে ভোটার তালিকায় ১০০ জনের নাম থাকলে এবার আছে ৮৭ জনের নাম। তার ৯৩.১৯ শতাংশ কত হচ্ছে? ৮১-র কিছু বেশি। অর্থাৎ লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় সামান্য কিছু বেশি ভোট এবার পড়েছে।
সাধারণত লোকসভার তুলনায় বিধানসভা নির্বাচনে কিছুটা বেশিই ভোট পড়ে থাকে। তবে, এবার আরও একটি কারণ রয়েছে। জেলায় জেলায় রটে গিয়েছে, ভোট না দিলে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়ে দেবে। বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের নাম। এই গুজবই পরিযায়ী শ্রমিকদের ভোটদানের ক্ষেত্রে ‘টনিকে’র কাজ করেছে। অন্যবার নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলি বাড়িতে গিয়ে ভিনরাজ্যে থাকা শ্রমিকদের ভোট দিতে আসতে অনুরোধ করত। অনেকে কাজের চাপের অজুহাত দেখিয়ে আসতেন না। কিন্তু এবার নিজেদের তাগিদেই পরিযায়ী শ্রমিকরা দল বেঁধে ভোট দিতে এসেছেন। কারণ, তাঁরা কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। ভগবানগোলা, সামশেরগঞ্জ সহ মুর্শিদাবাদ, মালদহের যে যে আসনে পরিযায়ী শ্রমিক পরিবারের বাস সবথেকে বেশি—সর্বত্র ৯৬ শতাংশ ভোট পড়েছে।
এমনিতেই ভোটার-আধার কার্ড থাকা সত্ত্বেও বিজেপিশাসিত রাজ্যে কাজে যাওয়া বাঙালিদের ‘বাংলাদেশি’ বলে মারধর করা হচ্ছে। মালপত্র লুট করে নিচ্ছে। এমনকি, খুনও করেছে। এই পরিস্থিতিতে ভোট না দিলে নাম কেটে যাবে, সেই ভয়ে সবাই ঝেঁটিয়ে ভোট দিতে এসেছেন। তাঁদের বক্তব্য, ‘আমাদের বাপ-ঠাকুরদার জন্ম এখানে। অথচ বাবা, মায়ের নাম বাদ। কিন্তু ভিন রাজ্যে কাজ করা সত্ত্বেও আমাদের নাম রয়েছে। এই নির্বাচন কমিশনকে আমরা বিশ্বাস করি না। হয়তো দেখা যাবে, ভোট দিইনি মানে বাংলাদেশি। এই বলে নাম কেটে দেবে। তাই কোনো ঝুঁকি নিইনি।’
বিপুল সংখ্যক নাম বাদ দেওয়ায় ভোটিং পার্সেন্টেজ বেড়েছে, একথা ঠিক। কিন্তু মোট ভোটদাতার সংখ্যা সেভাবে বাড়েনি। বিজেপি সেই পার্সেন্টেজকে সামনে রেখে ‘অ্যান্টি ইনকামবেন্সি’ ভোট বলে প্রচার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। এটাও নরেন্দ্র মোদির দলের আর এক জুমলা। ৪ মে স্পষ্ট হবে, প্রচণ্ড গরমেও মানুষের এই ভোটদান প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধিতার কারণে, নাকি এসআইআর হয়রানির প্রতিবাদে বিজেপিকে মোক্ষম চপেটাঘাত!