


নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: জ্বালানি নিরাপত্তায় ১৪০ কোটি দেশবাসীর স্বার্থই আমাদের অগ্রাধিকার! সস্তার তেলই কিনব। রাশিয়া থেকে তেল কেনার শাস্তি হিসাবে মার্কিন শুল্ক-হুমকির মুখে পালটা জবাব ভারতের। ব্রিকস সম্মেলনের আত্মবিশ্বাস যেন মোদি সরকারের অবস্থানেও বদল এনেছে। আমেরিকার আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে এবার তাৎক্ষণিক কঠোর প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে নয়াদিল্লি। কিছু মাস আগে পর্যন্ত যা ছিল বিরল। বরং আমেরিকা লাগাতার আক্রমণাত্মক ও অসম্মানজনক বিবৃতি দিলেও ভারত সরকার কেন নরম ও নীরব অবস্থান নিয়েছে— এই প্রশ্ন তুলে লাগাতার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বিদ্ধ করেছে বিরোধীরা। এমনকি, সদ্য ইউপিআইতে বড়ো ব্যবসায়ীদের জন্য মাশুল বসানোর সিদ্ধান্তের নেপথ্যেও মার্কিন চাপের অভিযোগ তুলেছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। এই আবহেই বৃহস্পতিবার মার্কিন সংসদে পাশ হয়েছে ‘লিন্ডসে গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট ২০২৬’। এই বিলের প্রতিপাদ্য কী? রাশিয়া থেকে সবথেকে বেশি তেল এবং গ্যাস আমদানিকারী পাঁচটি দেশের উপর প্রয়োজন হলে ১০০ শতাংশ শুল্ক বলবৎ করার অধিকার মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেওয়া হচ্ছে। এই বিল আগেই সেনেটে পাশ হয়েছিল। এই বিল একদিকে যেমন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বলবৎ করার অধিকারও দিয়েছে, তেমনই তিনি ইচ্ছা করলে সেই শুল্ক মকুব এবং স্থগিত রাখতেও পারবেন। এই বিলের প্রধান লক্ষ্য চীন এবং ভারত। কারণ, এই দুই দেশ আমেরিকার শত নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাশিয়া থেকে জ্বালানি ক্রয় করে চলেছে। সুতরাং এই বিল পাশ করিয়ে ফের ভারত ও চীনের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর হুঁশিয়ারি দিয়ে রাখতে চাইছে আমেরিকা। ডেমোক্রেটিক সেনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল এমনও হুমকি দিয়েছেন যে, ভারত এবং চীন যেন এবার নিজেদের শুধরে নিয়ে অন্য কোনো বিকল্প পথে জ্বালানি ক্রয় করে। বৃহস্পতিবারই এর জবাবে কঠোর বার্তা দিয়েছে ভারত সরকার। বিদেশ মন্ত্রক কড়া বিবৃতি দিয়ে বলেছে, ভারতবাসীর স্বার্থই ভারত সরকারের কাছে অগ্রাধিকার। সুতরাং সেই স্বার্থ সুরক্ষিত করতে যতরকম বিকল্প জ্বালানি ক্রয়ের পথ খোলা আছে, প্রতিটি পথে ভারত জ্বালানি কিনবে। ভারতবাসীর স্বার্থ সুরক্ষিত করতে সবরকম বাণিজ্য ও অর্থনীতির পদ্ধতি নেওয়া হবে। বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে ভারতের নীতি ও সিদ্ধান্ত। সোজা কথায়, সস্তায় তেল যেখান থেকে পাওয়া যাবে সেখানে থেকেই কেনা হবে।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকেই ভারত যে লাগাতার রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল কিনে চলেছে, সেটি বরাবরই নাপসন্দ ডোনাল্ড ট্রাম্পের। বারবার তিনি সেই আপত্তি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন। কিন্তু এবারই প্রথম মার্কিন শুল্ক-হুমকির বিল পাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভারত সরকারের বিদেশ মন্ত্রক কড়া বিবৃতি দিয়ে প্রত্যাঘাত করেছে ট্রাম্প প্রশাসনকে। বিগত আর্থিক বছরে মস্কোর থেকে ১৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলার মূল্যের তেল কিনেছে দিল্লি। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ ও অশোধিত তেল সরবরাহে অনিশ্চয়তার জেরে ভারতের রাশিয়া-নির্ভরতা বেড়েছে। জুলাই মাসের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, দেশের মোট তেল আমদানির ৫১ শতাংশই আসছে পুতিনের দেশ থেকে। প্রতিদিন গড়ে ২০ লক্ষ ব্যারেল। প্রাকৃতিক গ্যাসের আমদানি অবশ্য আহামরি নয়। খুব বেশি হলে ৩ শতাংশ। কিন্তু আমেরিকা এভাবে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে, আবার মনেপ্রাণে চাইবে ভারত জ্বালানি আমদানির সংকট মেটাবে সিংহভাগ তেল মার্কিন মুলুক থেকে বেশি দামে কিনে, এই মনোভাব নয়াদিল্লি মেনে নিচ্ছে না। সেটাই এদিন স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ১০০ শতাংশ শুল্কের হুমকিও ভারত আর গ্রাহ্য করছে না। মোদি সরকারের আমেরিকা নীতি হঠাৎ এত আক্রমণাত্মক কেন?