


পক্ষে
কঙ্কনা বোস
রথ টানায় ছোটদের আগ্রহ কমে যাওয়া একটি বাস্তব ও জটিল সামাজিক পরিবর্তনের চিহ্ন। ফ্ল্যাট সংস্কৃতিতে খেলার জায়গার অভাব, বন্ধুদের সঙ্গে দূরত্ব ও একাকিত্ব ছোটদের নিঃসঙ্গ করছে। অনেক মা-বাবা পড়াশোনা ও প্রযুক্তিনির্ভর সাফল্যকে প্রাধান্য দিয়ে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক চর্চায় উৎসাহ দেন না। উপরন্তু নিউক্লিয়ার পরিবারে দাদু-দিদার মতো সংস্কৃতির ধারকরা থাকেন না, আর মা-বাবাও কর্মব্যস্ত। ফলে ছোটদের শেখানো, বোঝানো বা উৎসাহ দেওয়ার অভাব ঘটে। এইসব কারণে তারা ঐতিহ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
কলেজ ছাত্রী
দেবদত্তা রায়
বাঙালির ১২ মাসে ১৩ পার্বণের মধ্যে অন্যতম উৎসব রথযাত্রা। গ্রামীণ পাড়া এলাকায় আগে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের রথ নিয়ে বেরতে দেখা যেত। তবে কালের নিয়মে ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে তাদের ইচ্ছে। বর্তমানে হাতেগোনা কয়েকজনকে দেখা যায় হয়তো। ছেলেমেয়েরা এখন নির্ভর হয়ে পড়েছে মোবাইল দুনিয়ায়। তারা পড়াশোনার জন্য গৃহবন্দি। তাই তারা এইসব আনন্দ-উৎসব থেকে বঞ্চিত। বর্তমান যুগে দাঁড়িয়ে এই অত্যাধুনিক সমাজ সৃষ্টির কারণেই হয়তো আজ ছোটদের মধ্যে রথ টানার আগ্ৰহ হারিয়ে যেতে চলেছে।
স্কুলছাত্রী
তিয়াসা পাত্র
ছোটদের রথ টানার আগ্রহ কমে যাওয়ার বেশ কিছু কারণ আছে। বর্তমানে মোবাইল ফোন, টেলিভিশন এবং অন্যান্য আধুনিক বিনোদনের মাধ্যমের প্রতি শিশুদের আকর্ষণ বেড়েছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী উৎসবের প্রতি তাদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। অনেক সময় শিশুরা সময়ের অভাবে এই উৎসবে যোগ দিতে পারে না। আগের মতো শিশুরা খেলার জন্য মাঠে যাওয়ার সুযোগও পাচ্ছে না। শিশুদের প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতা তাদের শরীরচর্চা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। অভিভাবকরাও নিরাপত্তাজনিত কারণে শিশুদের ভিড়ের মধ্যে একা ছাড়তে নিরাপদ বোধ করি না। ফলে রথ টানা হয়ে ওঠে না।
গৃহবধূ
প্রার্থনা পাল
আজকের দিনে রথ টানার মতো ঐতিহ্যবাহী প্রথা সম্পর্কে ছোটদের আগ্রহ কমছে। আগে রথ এলেই পাড়ার শিশুরা দল বেঁধে দড়ি ধরত। এখন মোবাইলের নোটিফিকেশনেই চোখ আটকে থাকে। একসময় রথ টানা মানে ছিল আনন্দ—তা আজ কেবল ছবি তোলার উপলক্ষ। প্রযুক্তির নেশায় এই উৎসব এখন অতীত। অনেকে ভিড় ও নিরাপত্তার ভয়েও ছোটদের রথ টানাতে নিয়ে যান না। সময়ের সঙ্গে বদলেছে উৎসবের মানে। তাই রথ টানা এখন অনেকের কাছেই নিছকই একটি দর্শনীয় অনুষ্ঠান, অংশগ্রহণের কোনও ক্ষেত্র নয়।
কলেজ ছাত্রী
বিপক্ষে
বিশ্বজিৎ কর
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় বলছি যে রথের রশি টান দেওয়ার ব্যাপারে ছোটদের উৎসাহ আজও চোখে পড়ার মতো! কিন্তু অভিভাবকদের শাসনে তা মিইয়ে যায়। গত বছরের অভিজ্ঞতা— এক ভদ্রমহিলাকে দেখি উদভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক ছুটছেন, মুখে একটাই কথা ‘বান্টি, কোথায় তুই?’ বুঝলাম ভিড়ের মাঝে ছেলে হাতছাড়া হয়েছে। অবশেষে তাকে পাকড়াও করে একটু ফাঁকা জায়গায় নিয়ে এসে ধমকানি শুরু। ‘ছোটরা রথ টানে না। ধাক্কাধাক্কিতে যদি লেগে যেত!’ ফলে রথ এখনও শিশুদের টানে। আমাদের বাধা দেওয়ার প্রবণতাই নতুন।
অবসরপ্রাপ্ত
প্রদীপ রঞ্জন রীত
রথ টানায় ছোটদের আগ্রহ কমেছে, একথা ভুল। ছোটরা তথাকথিত কোনও ‘পুণ্যফল’ অর্জনের জন্য রথের রশিতে টান দেয় না, তারা রথ টানে বিমল আনন্দে। এই কারণেই শিশুরা খেলনা রথ সাজায়, বাড়িতে টানে। বড়সড় রথের মেলায় অত্যধিক ভিড়ের কারণে শিশুরা রথের রশি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। বাড়ির বড়রাও অনেক সময় ঝুঁকির কারণে ভিড় ঠেলে তাদের যেতে দেন না। খেলনা রথও শিশুদের কিনে দিতে চান না, এই ভেবে যদি পড়াশোনার ক্ষতি হয়! বড়দের আরোপিত কিছু বিধিনিষেধ বাদ দিলে শিশুরা আছে শিশুতেই।
স্কুল শিক্ষক
শুভাশীষ সেনগুপ্ত
গ্রামেগঞ্জে কিন্তু এখনও রথযাত্রার আকর্ষণ শিশু-কিশোর, কিশোরীদের কাছে আকাশচুম্বী। রথের দিন গ্রামের রাস্তায় ছোট ছোট রথ ফুলমালায় সাজিয়ে, উৎসাহ উদ্দীপনার সঙ্গে বাচ্চারা পাড়া পরিক্রমায় বেরয়। দাদা, দিদি, কাকু, কাকিমাদের থেকে সামান্য অর্থের বিনিময়ে যখন জগন্নাথদেবের প্রসাদ তাঁদের হাতে তুলে দেয়, তা দেখতে ভালো লাগে। মোবাইল, টিভি এই নিষ্পাপ কিশোর কিশোরীর মন এখনও দখল করতে পারেনি। পুরনো দিনের রথ টানার পরম্পরা অল্পবয়সিদের দল এখনও সযত্নে রক্ষা করে চলেছে। জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলরামের পথ পরিক্রমা এই ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের হাত ধরেই আগামীদিনে চলবে।
অবসরপ্রাপ্ত
সুনিতা নাইয়া
রথ টানায় ছোটদের আগ্রহ কমেছে— এই মত একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। বরং এখন ছোটদের মধ্যে রথটানা ও রথ সাজানো নিয়ে প্রতিযোগিতা হয়, কে কত সুন্দর করে রথ সাজাল, তা নিয়ে খুদের মায়েদের সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টের হুড়োহুড়ি! মা-বাবার সঙ্গে গিয়ে নিজের পছন্দের রথ কেনা, তারপর তা সাজানো এই সবকিছুর মধ্যে ছোটদের মনে থাকে প্রবল আনন্দ। বলরাম সুভদ্রা জগন্নাথদেবকে সাজিয়ে রথে চড়িয়ে চলে তাদের রথ টানা। তাদের মনে থাকে আনন্দের জোয়ার। ছোটরা এখনও কত আনন্দের সঙ্গে রথ টেনে রথের মেলায় গিয়ে জিলিপি, পাঁপড় ভাজা খেয়ে রথযাত্রা পালন করে। আমি মনে করি বছরের পর বছর কেটে গেলেও রথযাত্রা নিয়ে শিশুদের মনে সবসময়ই এইরকম উত্তেজনা থাকবে।
চাকুরিজীবী