


মৃণালকান্তি দাস: ভাবুন, পৃথিবীর এক প্রান্তে এমন একটি সমুদ্রপথ খুলে যাচ্ছে, যেখানে দিনের পর দিন সূর্য অস্ত যায় না। চারদিকে শুধু বরফ, হিমেল বাতাস আর মাইলের পর মাইল শূন্যতা। আর সেই বরফের বুক চিরে এগিয়ে চলেছে একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজ। পিছনে ছুটছে পারমাণবিক শক্তিচালিত আইসব্রেকার। লক্ষ্য— চীন থেকে ইউরোপ। রুটটি নতুন নয়। কিন্তু খেলাটি নতুন। কারণ এই পথ দিয়ে শুধু পণ্য যাচ্ছে না। এগিয়ে যাচ্ছে চীনের এক দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা—‘আইস সিল্ক রোড’। আর এই বরফের মহাসড়ককে ঘিরে এখন শুরু হয়েছে নতুন এক প্রতিযোগিতা।
পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বাড়লে প্রথম ধাক্কা লেগেছিল সমুদ্রপথে। হরমুজ প্রণালী অচল হলে বিপদ। সুয়েজে জট তৈরি হলে বিপদ। বিশ্বের বাণিজ্য তখন আটকে যায় কয়েকটি সংকীর্ণ জলপথে। এই বাস্তবতাই মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিওকে নতুন নৌপথের কথা ভাবতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু তাঁর চোখে যে বিকল্প পথটি ছিল, সেটি ছিল এমন এক অঞ্চল দিয়ে, যেখানে সাধারণ জাহাজের চেয়ে প্রকৃতিই বড়ো প্রতিপক্ষ। আর্কটিক।
রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষে আর্কটিক বৃত্তের মধ্য দিয়ে চলে গিয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ উত্তর সমুদ্রপথ। গ্রীষ্মে বরফ একটু পাতলা হয়। আর সেই সুযোগেই শুরু হয় দৌড়। কার আগে কে যাবে? কারা এই পথকে বাণিজ্যের নতুন রুটে পরিণত করবে? আর সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন— এই পথের নিয়ন্ত্রণ শেষপর্যন্ত কার হাতে থাকবে? জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত— তিন দেশই এই পথ ব্যবহার করার আগ্রহ দেখিয়েছে। কিন্তু অপেক্ষা করেনি বেজিং। ২০২৫ সালে পরীক্ষামূলক যাত্রার পর চীনের শিপিং কোম্পানি ‘সি লেজেন্ড’ উত্তর সমুদ্রপথে নিয়মিত কনটেইনার পরিবহণ শুরু করেছে।
নিংবো-ঝৌশান থেকে ব্রিটেনের ফেলিক্সস্টো। সরাসরি। সময় লাগে মাত্র ১৮ দিন। একই যাত্রা সুয়েজ খাল দিয়ে করতে গেলে সময় লাগতে পারে ৪০ দিনেরও বেশি। অর্থাৎ, অর্ধেকেরও কম সময়ে পৌঁছে যাচ্ছে পণ্য। এখন যদি আর্কটিকের সমুদ্রপথটিও তার নিয়ন্ত্রণে আসে, তাহলে বদলে যেতে পারে ইউরোপ-চীন বাণিজ্যের মানচিত্র। এটা কোনো হঠাৎ পরিকল্পনা নয়। ২০১৭ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং প্রকাশ্যেই চীন ও রাশিয়াকে আর্কটিক নৌপথ উন্নয়নের আহ্বান জানিয়েছিলেন। নাম দিয়েছিলেন— ‘আইস সিল্ক রোড’। তখন মস্কো খুব একটা স্বস্তিতে ছিল না। কারণ উত্তর সমুদ্রপথের বড়ো অংশ রাশিয়ার একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে। আর্কটিক তাদের কৌশলগত এলাকা। কিন্তু তারপর ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হল। পশ্চিম দুনিয়ার নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়া ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হতে থাকল। আর সেই সময়েই বরফের উপর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল চীন।
মস্কোর প্রয়োজন ছিল অর্থনৈতিক অংশীদার। বেজিংয়ের প্রয়োজন ছিল নতুন সমুদ্রপথ। দুই দেশের প্রয়োজন মিলে গেল একই জায়গায়। আর্কটিক। এই পথ দিয়ে জাহাজ চালানো মানেই শুধু বরফ কেটে এগিয়ে যাওয়া নয়। প্রয়োজন অনুমতি। প্রয়োজন আইসব্রেকার। প্রয়োজন নজরদারি। আর এই সবকিছুর বড়ো অংশই নিয়ন্ত্রণ করে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক কোম্পানি রোসাটম। রোসাটম উত্তর সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয় এবং পুরো রুটের কাজকর্ম তদারকি করে। প্রয়োজনে পাঠায় পারমাণবিক শক্তিচালিত আইসব্রেকার। অর্থাৎ, বরফের নীচে যতটা ঠান্ডা জল, তার উপরের কূটনীতি ততটাই উত্তপ্ত।
চীন নতুন পথ খুঁজতে চাইছে। রাশিয়া নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চাইছে। আর অন্য দেশগুলি হিসাব করছে— এই নতুন রুটে পা রাখা আদৌ নিরাপদ কি না। সবাই জানে, বরফের নীচে লুকিয়ে আছে বিপদ। দূর থেকে উত্তর সমুদ্রপথকে স্বপ্নের মতো মনে হতে পারে। কম দূরত্ব। কম সময়। কম জ্বালানি। কম কার্বন নিঃসরণ। সি লেজেন্ডের দাবি, এই পথে চীন-ইউরোপ যাত্রার সময় কমে যাওয়ায় কার্বন নিঃসরণ প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত কমতে পারে। কিন্তু পরিবেশবিদরা বলছেন, আর্কটিকের হিসাব এত সহজ নয়। কারণ এখানে একটি দুর্ঘটনা মানেই শুধু একটি জাহাজের ক্ষতি নয়। এটি হয়ে উঠতে পারে গোটা একটি মহাদেশের বাস্তুতন্ত্রের বিপর্যয়।
ধরুন, একটি জাহাজ বরফের চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হল। ইঞ্জিন বন্ধ। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। তারপর জ্বালানি ছড়িয়ে পড়ল বরফের সমুদ্রে। সাধারণ সমুদ্রে তেল পরিষ্কার করাই কঠিন। আর্কটিকে? প্রায় দুঃস্বপ্ন। ভারী জ্বালানি তেল জলের চেয়ে ঘন। ঠান্ডায় সেটি আরও ধীরে ভাঙে। আর যদি তেল বরফের নীচে আটকে যায়? তখন তাকে উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। পরিবেশবিদের আশঙ্কা, এমন বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য রাশিয়ার প্রস্তুতিও যথেষ্ট নয়। কারণ উত্তর সমুদ্রপথের বিশাল অংশই জনবসতি থেকে বহু দূরে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতেই লেগে যেতে পারে কয়েক সপ্তাহ। অর্থাৎ, দুর্ঘটনার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন— যে সময়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটিই হয়তো হারিয়ে যাবে।
বিপদ শুধু তেলের নয়। আছে আরও অদৃশ্য এক শত্রু। ব্ল্যাক কার্বন। ভারী জ্বালানি পোড়ালে যে কালো কণাগুলি বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, সেগুলি আর্কটিকের বরফের উপর জমতে পারে। সাদা বরফ সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে। কিন্তু কালো কার্বন সেই আলো শোষণ করে। ফলে বরফ আরও দ্রুত গরম হয়। আরও গলে। আরও কালো হয়। আরও বেশি তাপ শোষণ করে। একটি ভয়ংকর চক্র শুরু হয়। অর্থাৎ, যে উষ্ণায়নের ফলে আর্কটিকের বরফ গলছে এবং নতুন সমুদ্রপথ খুলছে— সেই বাণিজ্যই আবার বরফ গলার গতি বাড়িয়ে দিতে পারে। এ যেন বরফ গলিয়ে তৈরি করা রাস্তা, যা আবার নিজের অস্তিত্বকেই ধ্বংস করছে।
কিন্তু পরিবেশের থেকেও বড়ো আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। কে এই পথ ব্যবহার করছে? রাশিয়ার উপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা জারির পর উত্তর সমুদ্রপথে নতুন এক ধরনের জাহাজের আনাগোনা বেড়েছে। নাম— ‘শ্যাডো কনভয়’। এরা এমন জাহাজ, যেগুলি অনেক সময় যথাযথ বিমা বা নিয়ন্ত্রক তদারকি ছাড়াই চলাচল করে। উদ্দেশ্য? রাশিয়ার তেলের উপর আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া। নরওয়ের অসলোতে অবস্থিত আন্তর্জাতিক পরিবেশগত ও বিজ্ঞানভিত্তিক সংস্থা বেলোনা ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০২৫ সালে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা প্রায় একশোটি জাহাজ এই রুটে ছিল— উত্তর সমুদ্রপথে চলাচলকারী মোট পণ্যবাহী জাহাজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ২০২৬ সালে সেই প্রবাহ আরও বাড়ার খবর সামনে এসেছে। কারণ গ্রীষ্মে বরফ কমছে। জাহাজ চলাচল সহজ হচ্ছে। আর পৃথিবীর উষ্ণতা যত বাড়ছে, এই ‘বরফের রাস্তা’ তত দীর্ঘ সময় খোলা থাকছে। তার প্রমাণও মিলছে।
রাশিয়ার একটি তরল প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজ গত মে মাসেই এই পথে আগাম যাত্রা শুরু করেছে। তারপর আরও একটি অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখা গিয়েছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারীরা উত্তর সমুদ্রপথের অনেক উত্তরে রাশিয়ার ট্যাংকারের একটি বড়ো কনভয়কে এগিয়ে যেতে দেখেছেন। কনভয়ে থাকা জাহাজগুলিতে প্রায় ৮০ লাখ ব্যারেল তেল। আর তাদের পথ? উত্তর মেরু থেকে মাত্র প্রায় ৫০০ মাইল দূরে। যে অঞ্চলে কয়েক বছর আগেও এমন দৃশ্য কল্পনা করাই কঠিন ছিল।
কিন্তু রাশিয়া কি খুব বেশি ঝুঁকি নিচ্ছে? মস্কো চাইছে উত্তর সমুদ্রপথকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিকল্প মহাসড়কে পরিণত করতে। কারণ হিসাবটা সহজ। পশ্চিমের নিষেধাজ্ঞা যত বাড়বে, নতুন পথের প্রয়োজন তত বাড়বে। আর এই পথের উপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ যত বেশি থাকবে, তত বাড়বে তার কৌশলগত গুরুত্ব। কিন্তু সমস্যাও ততটাই বড়ো। জাহাজ চালানোর খরচ বেশি। আইসব্রেকার প্রয়োজন। মরশুম সীমিত। নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রবল। জটিল বিমা। নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি আছে। আর কোনো দুর্ঘটনা হলে উদ্ধার অভিযানও অত্যন্ত কঠিন। তার উপর রয়েছে পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা। অর্থাৎ, হিসাবের খাতায় যতটা লাভ দেখা যাচ্ছে, বাস্তবে ঝুঁকির অঙ্কটা হয়তো তার চেয়েও বড়ো।
এরপরও কি হরমুজ ও সুয়েজের বিকল্প হতে পারবে আর্কটিক? প্রশ্নটা এখন আর কল্পবিজ্ঞান নয়। চীন নিয়মিত বাণিজ্যিক পরিষেবা শুরু করেছে। রাশিয়া পরিকাঠামো বাড়াচ্ছে। জাহাজের সংখ্যা বাড়ছে। বরফ কমছে। আর বিশ্ব বাণিজ্য নতুন পথ খুঁজছে। কিন্তু আর্কটিক এখনও সুয়েজ হয়ে উঠতে পারেনি। এখনও হরমুজ নয়। এখানে প্রতিটি যাত্রার সঙ্গে রয়েছে বরফের অনিশ্চয়তা। প্রতিটি জাহাজের সঙ্গে রয়েছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। প্রতিটি ট্যাংকারের সঙ্গে রয়েছে নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি। আর প্রতিটি নতুন যাত্রার সঙ্গে বাড়ছে এক গভীর প্রশ্ন— আর্কটিক কি বিশ্ব বাণিজ্যের নতুন মহাসড়ক হতে চলেছে? নাকি জলবায়ু পরিবর্তন, রাশিয়ার ভূ-রাজনীতি এবং চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষার সংঘাতে এটি পরিণত হবে পৃথিবীর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাণিজ্যপথে?
বিশেষজ্ঞদের উত্তর স্পষ্ট, এই মুহূর্তে নয়। কিন্তু সমস্যা হল— বরফ দ্রুত গলছে। আর যে রাস্তা আজ অসম্ভব মনে হচ্ছে, কয়েক বছর পর সেটিই হয়তো বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলির একটি হয়ে উঠতে পারে। বরফের উপর তাই এখন শুধু জাহাজ চলছে না। চলছে শক্তির লড়াই। চলছে বাণিজ্যের লড়াই। চলছে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর লড়াই। আর তারও গভীরে— চীন, রাশিয়া এবং পশ্চিমের মধ্যে ভবিষ্যতের আর্কটিক নিয়ন্ত্রণের এক নীরব যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে।
এই যুদ্ধে ভারতও বাইরে থাকতে পারবে না। কারণ আর্কটিক যত দ্রুত বদলাবে, তার প্রভাব তত দ্রুত পৌঁছবে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত। আজ যে বরফের রাস্তা দূরের কোনো ভূ-রাজনৈতিক গল্প বলে মনে হচ্ছে, আগামী দিনে সেটিই হয়তো নির্ধারণ করবে— বিশ্ব বাণিজ্যের পরবর্তী মহাসড়কের চাবি থাকবে কার হাতে।