


পেট ঠান্ডা রাখতে গ্রীষ্মে খাবেন কোন পানীয়? উপকার কোনটিতে বেশি?
গরম পড়তে না পড়তেই আখের রসের চাহিদা বেড়ে যায় ফি বছরই। আখ মাড়াইয়ের যন্ত্র নিয়ে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে পড়েন বিক্রেতারা। শিক্ষিত-অশিক্ষিত বহু মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে বেশ তৃপ্তির সঙ্গেই সেই রস পান করেন। অনেকে আবার বোতলে ভরে নিয়ে যান বাড়িতে জন্ডিস রোগীকে খাওয়াবেন বলে। ফ্রিজেও রেখে দেন অনেকে, মাঝে মাঝে খান পেট ঠান্ডা করার জন্য।
আখের নিশ্চয় পুষ্টিকর, তবে রাস্তায় আখ মাড়াই করে বরফ মিশিয়ে যে শরবত বিক্রি হয়, তা বিষ ছাড়া কিছু নয়। আন্ত্রিক ও জন্ডিস-সহ নানা রোগ এর ফলে শরীরে ঢুকে পড়তে পারে। জন্ডিস হলে আখের রস খেতেই হবে, এমন একটা ধারণা আমাদের আছে। জন্ডিস বা ন্যাবা লিভারের অসুখ। আমাদের রক্তের লোহিত রক্তকণা (আর বি সি) একটা নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে ভেঙে গিয়ে তৈরি হয় হলুদ রঙের বিলিরুবিন কণা। সুস্থ মানুষের দেহে ১০০ সিসি রক্তে ০.২ থেকে ০.৮ মিলিগ্রাম বিলিরুবিন কণা থাকে। যদি কোনও কারণে এর পরিমাণ দুই মিলিগ্রাম ছাড়িয়ে যায়, তখন চোখ, দেহের চামড়া, ইউরিন সব হলুদ হতে শুরু করে। একেই বলে জন্ডিস। বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস সংক্রমণের ফলে প্রধানত এমন হয়, যেগুলো অধিকাংশই জল ও খাদ্যবাহিত। কিছু ক্ষেত্রে রক্তের মাধ্যমেও এই ভাইরাস দেহে প্রবেশ করে।
জন্ডিস হলে সহজপাচ্য খাবার খেতে হয়, যাতে প্রোটিন ও ফ্যাট কম থাকবে, বেশি থাকবে কার্বোহাইড্রেট। যেমন ভাত, ডাল, তরকারি, মরশুমি ফল, গ্লুকোজ ইত্যাদি। মাছ মাংস ও তরকারি কম তেল মশলায় রাঁধতে হবে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে একবার জন্ডিস হলে সারা জীবন তেল, ঘি, মাছ, মাংস খাওয়া বন্ধ! জন্ডিস হলে আখের রস খাওয়া আবশ্যিক নয়। কিন্তু রাস্তার আখের রস নয়। বাড়িতে এনে ভালো করে ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে টুকরো করে চিবিয়ে চিবিয়ে খান। আখের রস থেকে মাত্র ৩৯ কিলো ক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। কার্বোহাইড্রেট থাকে মাত্র ৯.১ গ্রাম। কাজেই জন্ডিসের সেরা পথ্য আখের রস কখনওই নয়। না খেলেও ক্ষতি নেই, তবে খেলে সাবধানতা অবলম্বন করবেন। গরমকালে পেট ঠান্ডা করার জন্য অনেকে আখের রস খান। বলে রাখি, এই সময় যে কোন ফলের রসই উপকারি। আমের রস, তরমুজের রস, আনারসের রস— কম বেশি উপকার সবগুলোতেই আছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নিয়ে অবশ্যই এগুলো খেতে পারেন। গরমকালে ফলের রসের সত্যি কোনও বিকল্প নেই। গরমে ডাবের জলের চাহিদা ভয়ংকর ভাবে বেড়ে যায়। এখন একটি বড় সাইজের ভালো ডাব ৪০-৫০ টাকার কমে পাওয়া যায় না। গরমকালে অনেকে নিয়ম করে প্রতিদিন একটি করে ডাব খান। কী বিশাল খরচ বলুন তো! কিন্তু প্রশ্ন হল এই দামি ফল রোজ খাওয়া কি জরুরি! অনেকে বলেন, এতে নাকি পেট দারুণ ঠান্ডা হয়! আমার পাল্টা প্রশ্ন, তাহলে তো রোজ দু’ গ্লাস করে বরফ জল খেলেই হয়। এটা ঠিক যে প্রকৃতির বিশুদ্ধতম জল হল ডাবের জল, যাতে কোনও দূষণ থাকে না। নানা খনিজ লবণ এতে থাকে ঠিকই, কিন্তু পটাশিয়াম বেশি থাকায় হৃদরোগীর পক্ষে ডাবের জল সবসময় নিরাপদ নয়। পেট খারাপের পথ্য হিসেবে অনেকে একে নির্বাচন করেন। এর চেয়ে ঢের ভাল চিনি-নুন-লেবুর শরবত বা ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন খাওয়া। তবে মাঝেমধ্যে ডাবের জল নিশ্চয়ই খেতে পারেন। অতুলনীয় স্বাদ। পাশাপাশি ভেতরে শাঁসটাও নিশ্চয়ই খেয়ে দেখেছেন, স্বাদে এবং পুষ্টিতে যা অতুলনীয়।
লিখেছেন ডাঃ অমিতাভ ভট্টাচার্য