


সকলে এই নিয়ম জানেন না। অথচ নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে শ্বাস নিয়েও ছেড়ে হাঁটলে একাধিক অসুখ সারতে পারে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন যোগা বিশারদ অমরেন্দ্রনাথ দাস।
মানুষের জীবনে সহজাত কিছু অভ্যেস রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হাঁটাহাঁটির অভ্যেস। আট হোক কিংবা আশি হাঁটার ব্যাপারে অনীহা খুব কমজনেরই থাকে। হয়তো ঘড়ি ধরে বা নিয়ম মেনে হাঁটেন না বেশিরভাগ মানুষই। কিন্তু নিত্যদিন হাঁটাচলা করেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কিন্তু জানেন কী? শুধুমাত্র হাঁটলেই শরীরের একাধিক ব্যাধি দূর হয়। আক্রান্ত হতে হয় না অনেক রোগেই? মানব জীবনে হাঁটার বহু উপকার রয়েছে। নিয়ম মেনে প্রতিদিন হাঁটলে ঠিক কী ধরনের উপকার পাওয়া যায়, আর একজন সুস্থ মানুষের কতক্ষণ হাঁটা উচিত সেই সব বিষয়ে প্রত্যেকেরই জানা দরকার।
হাঁটার কী কী উপকারিতা রয়েছে?
সুস্থ জীবন পেতে গেলে কয়েকটি নিয়মের সঙ্গে হাঁটার অভ্যেস রাখা অত্যন্ত জরুরি। মানবদেহ এমনভাবেই গঠিত হয়েছে যাতে করে সহজেই আমরা সবাই হাঁটা চলা করতে পারি। বহু মানুষ কাজের জন্য বা অফিসে দীর্ঘক্ষণ বসেই থাকেন। বসেবসেই কাজ করতে হয় অনেককে। যার ফলে তাঁদের শরীরে একাধিক রোগ বাসা বাঁধে। সেই মানুষদের কাছেই হাঁটা হল বহু রোগ থেকে মুক্তির অন্যতম উপায়। প্রতিদিন প্রত্যেক মানুষের ১ ঘণ্টা বা ৩০ মিনিট করে হাঁটা উচিত। শরীরচর্চার নানা উপায়ের মধ্যে হাঁটা হল সেরা। সকালে প্রতিদিন নিয়ম করে সূর্যের আলোতে খালি পায়ে মাটির উপর হাঁটা খুবই উপকারি। যদি হাঁটার সময়ে শ্বাস-প্রশ্বাস ঠিকভাবে নিয়ম মেনে নেওয়া যায় তাহলে বহু রোগ খুবই কম সময়ে সেরে যায়। এই বিষয়টিকে ভ্রমণ প্রাণায়াম বলা হয়।
ভ্রমণ প্রাণায়াম
স্বামী শিবানন্দ সরস্বতী ভ্রমণ প্রাণায়াম বিষয়টির সর্ম্পকে কথা বলে গিয়েছেন। হাঁটা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। কেউ জোরে হাঁটেন। আবার কেউ ধীরে হাঁটেন। প্রত্যেক মানুষের শরীরের গঠন অনুযায়ী হাঁটার গতি বা ধরনের তারতম্য হয়। প্রত্যেক মানুষের একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় শ্বাস নেওয়া উচিত। শরীরে শ্বাস নেওয়ার মাধ্যমে সঠিক মাত্রায় অক্সিজেন না গেলে সমস্যা দেখা যায়। হাঁটার সময়ে ঠিকভাবে শ্বাস নিলে ও ছাড়লে প্রাণায়ামের মতো কাজ হয়। এটাকেই বলে ভ্রমণ প্রাণায়াম। ধরুন আপনি হাঁটছেন। প্রথম চার পা হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে শ্বাস নিতে নিতে যেতে হবে। পরের চার পা হাঁটার সময়ে শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে যেতে হবে। তার কিছুদিন বাদে প্রথম ছ’ পা হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে শ্বাস নিতে নিতে যেতে হবে। পরের চার পা হাঁটার সময়ে শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে যেতে হবে। তাহলে এটি প্রাণায়ামের মতো কাজ করবে। তবে মনে রাখবেন শ্বাস নেওয়ার থেকে ছাড়া পরিমাণ বেশি রাখতে হবে। কারণ শরীর থেকে বেশি পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড বের করে দিতে পারলেই মঙ্গল। আর এইভাবে সঠিক তালে হাঁটলে আপনার শরীরেই উপকার হবে। যক্ষ্মা, টাইফয়েডের মতো রোগ সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচা যায়। মনে রাখবেন এই তালে কোনও ব্যাঘাত না ঘটে। যদি তাল কাটে তাহলে হাঁটা থামিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ফের ওই নিয়মে হাঁটতে হবে। তবে সবটাই করবেন আপনার শরীরের ক্ষমতা অনুযায়ী। চার পায়ের বদলে দু’পা হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে শ্বাস নিতে নিতে যেতে পারেন। তবে হাঁটার পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়াতে হবে। যেমন চার পা হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে শ্বাস নিতে নিতে যেতে হবে। পরের ছ’য় পা হাঁটার সময়ে শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে যেতে হবে।
হাঁটার কী কী উপকার রয়েছে?
শরীরচর্চা, সাঁতার কাটার থেকেও সহজ হল হাঁটা। এই কাজটা ছোটবেলা থেকেই সব মানুষ পারে। নিয়মিত হাঁটলে শরীরে একাধিক রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। রোজ হাঁটলে শরীরের রক্ত সঞ্চালন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন অঙ্গ সচল থাকে। কম হাঁটলে হৃদযন্ত্রের নানা রোগ হয়। বসে বসে কাজ করেন যাঁরা, তাঁরা না হাঁটলে মেদ জমে শরীরে, এমনকী ডায়াবেটিসেও আক্রান্ত হতে পারেন। সূর্যের আলোতে হাঁটলে বেশি উপকার পাওয়া যায়। কারণ সূর্যের আলো আমাদের শরীরে ভিটামিন ডি’র অভাব দূর করে। হাঁটাকে জীবনের অন্যতম অভ্যেস বা কাজ হিসেবে ধরে নিতে হবে। তবে ব্যথা-বেদনা হলে হাঁটা উচিত নয়।
কোন সময়ে হাঁটা উচিত?
গ্রীষ্মকালে খুবই সকালে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই হাঁটা উচিত। বেশি বেলায় না হাঁটাই ভালো। কারণ সকালে হাঁটলে তবেই বাতাসে অক্সিজেনটা বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়। বেলা বাড়লে অক্সিজেন কমে যায় বাতাসে, সঙ্গে চড়া রোদ গায়ে লাগলে ক্ষতি হবে। শীতকালে একটু বেলায় হাঁটা উচিত। দুপুরে যদি কেউ হাঁটতে চান তাহলে খাওয়া-দাওয়ার দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর হাঁটতে পারেন। রাতে খাওয়া-দাওয়ার পরে হাঁটুন। খেয়েই ঘুমোতে যাবেন না। তার আগে কিছুক্ষণ হাঁটুন। তবে সকালে হাঁটার মতো উপকার কোনও কিছুতেই নেই।
নিত্যদিন কতটা হাঁটা উচিত?
যে সব ব্যক্তির মেদ রয়েছে শরীরে, ডায়াবেটিস রয়েছে তাঁদের ১ ঘণ্টা বা ৪০ মিনিট করে হাঁটা উচিত। তবে একজন সুস্থ মানুষ সুবিধামতো হাঁটতে পারেন। এরই সঙ্গে বলে রাখি, বেশি ক্যালোরি সেবন করলে সেই ব্যক্তিকে ততটাই হাঁটতে হবে যাতে সেবন করা পুরো ক্যালোরিটা পুড়ে যায়। তবে মাথায় রাখবেন খেতে খেতে কোনওদিন হাঁটবেন না। অনেক মানুষ আছেন যাঁরা বলেন, আমি তো রোজই হাঁটি। কখনও বাজার করতে যাই, বাস-ট্রেন ধরতে যাই। এইভাবেই হাঁটি। কিন্তু মাথায় রাখবেন এটা প্রকৃত হাঁটার উদাহরণ নয়। এতে কোনও উপকার নেই। যখন হাঁটবেন তখন মাথায় কোনও চিন্তা রাখবেন না। তাই সকালে হাঁটলে বেশি উপকার পাওয়া যায়। কারণ তখন মাথা পরিষ্কার থাকে ও বাতাসের অক্সিজেনটা বেশি পাওয়া যায়।