


পক্ষে
শোভন সেন (শিক্ষক)
এ জি গার্ডিনার লিখেছিলেন, হীরে যদি রাস্তার ধারে নুড়ির মতো পড়ে থাকত, তাহলে আমরা কেউই তা কুড়োতে যেতাম না। কোনও জিনিস ব্যতিক্রমী হলেই তা মানুষের কাছে মূল্যবান হয়। মোবাইলে নানা প্যান্ডেল ও নানা প্রতিমার ছবি এবং ভিডিও সহজলভ্য। তাই তা আমাদের তেমন অবাক করে না। লাইন দিয়ে প্রতিমা দর্শনের মধ্যে একটা প্রাপ্তির আনন্দ আছে। এতে পুজোর আবহও অনুভব করা যায় সরাসরি। প্রতিমা দর্শনের সঙ্গে নতুন পোশাক পরার আনন্দ, সমবেত হওয়ার খুশি আর উদরপূর্তির তৃপ্তি তো আছেই। কিছু মানুষ লাইনে দাঁড়িয়েও অবশ্য চোখের পাঁচশো ছিয়াত্তর মেগাপিক্সেল ক্যামেরার তুলনায় মোবাইলের সাধারণ ক্যামেরায় প্রতিমা দর্শনে আগ্রহী। স্মৃতির বদলে মেমোরি কার্ডেই তাদের ভরসা। এও এক যুক্তিহীন হিড়িক!
বিশ্বজিৎ কর (অবসরপ্রাপ্ত কর্মী)
সশরীর লাইন দিয়ে ঠাকুর দেখা এবং সেটাই পরে মোবাইলে ধরে রাখাতেই আনন্দ। তবে শুধুমাত্র মোবাইলে ঠাকুর দেখায় কোনও মজাই হয় না। আরে বাবা, হোক না একটু ধাক্কাধাক্কি, হোক না লম্বা লাইন, এই সবকিছুর আনন্দের স্বাদটা একটু অন্যরকম। দল বেঁধে পায়ে পায়ে একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়া, ওই লাইনেই কত কথা, কত আলোচনা। আর হ্যাঁ অবশ্যই সেলফি তোলার হিড়িক। মাইকে অনবরত ঘোষণা, ‘লাইন সোজা রাখুন’, ‘এগিয়ে চলুন, এগিয়ে চলুন’, ‘ছোটদের হাত ধরে রাখুন’! এগুলো কম মজার?
সুকান্ত দাস (লেখক)
দুর্গাপুজো মানেই নতুন জামা, জুতোয় নতুন সাজগোজ। আর সেই সাজসজ্জায় তো চুপচাপ ঘরে বসে থাকা যায় না! যতই মোবাইলে সারা শহরের ঠাকুর দেখা যাক না কেন! শুধু ঠাকুর নয়, নতুন মণ্ডপ, নতুন নতুন মানুষজন সবকিছু চাক্ষুষ করতে, নতুনের ছোঁয়া পেতে লাইন লাগাতেই হবে! আর হ্যাঁ, কেবলই লাইন দেওয়া নয়, সেই ফাঁকে মোবাইলে ছবি তোলা, সেলফি তোলা এবং আরও কত কী। সুতরাং আট থেকে আশি/আছি পাশাপাশি/মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরি/ঠাকুর দেখে ফিরি!
শ্রাবন্তী বিশ্বাস ভকত (ব্যবসায়ী)
দুর্গাপুজোর ভিড়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বা মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরার আনন্দ মোবাইল বা ডিজিটাল দুনিয়ার থেকে ভিন্ন। এর মাধ্যমে বোঝানো হচ্ছে যে, ভিড়ের মধ্যে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে অনেক মানুষের সঙ্গে উৎসব উদযাপন করা, ঠাকুর দেখা ও তার মধ্যে ভিড় ও উন্মাদনার যে অনুভূতি হয়, তা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অনলাইনে ঠাকুর দেখার থেকে অনেক বেশি তৃপ্তির। মোবাইলে ঠাকুর দেখা এক প্রকারের একাকী এবং ভার্চুয়াল অভিজ্ঞতা, যা মানুষের সঙ্গে সরাসরি মেলামেশা বা সম্মিলিত উৎসবের আনন্দ দিতে পারে না।
বিপক্ষে
সাগরময় অধিকারী (অবসরপ্রাপ্ত কলেজ গ্রন্থাগারিক)
লাইন দিয়ে ঠাকুর দেখা! নৈব নৈব চ। লাইন দিয়ে আমরা অনেক কাজ করেছি। ট্রেনের টিকিট কাটতে লাইন, বাতিল নোট জমা দিতে লাইন, নতুন নোট সংগ্রহ করতে লাইন, রেশন শপে লাইন, বিদ্যুতের বিলের টাকা জমা দিতে লাইন, পেনশনের টাকা তুলতে লাইন, এমনকী বৈদ্যুতিক শ্মশানে মরদেহ পঞ্চভূতে বিলীন করতেও লাইন। ঠাকুর দেখতে আর লাইন দেব না বরং ঘরে বসে মোবাইলে পাখার তলায় বসে যখন খুশি, যেমন খুশি ঠাকুর দর্শন করব। ভিড়ভাট্টায় হইচইয়ের মধ্যে সর্পিল গতিতে আগুয়ান চলমান লাইন ঠাকুর দেখার পুরো আনন্দটাই মাটি করে দেবে। ঠাকুর দর্শন করতে চাই প্রশান্ত মনে। এবার ঠাকুর দর্শনে বৃষ্টি বাধা হয়ে দাঁড়ালে মোবাইলটাই হবে একমাত্র আশা-ভরসা।
জয় মণ্ডল (কলেজ ছাত্র)
বাঙালির দুর্গাপুজোর আবহ শুরু হয়ে যায় সেই রথের দিন থেকেই। কোথায় কী থিম হবে সেটাও আমরা প্রথম মোবাইল থেকে জানতে পারি, ঠাকুর দেখার শুরুটাও আমরা বেশিরভাগ সময় মোবাইল থেকেই করে থাকি। আর কিছু মানুষ আছেন যারা শারীরিক অক্ষমতার জন্য লাইন দিয়ে ঠাকুর দেখতে পারেন না, এবং কিছু পেশা যেমন পুলিশ, দমকল, ডাক্তার, নার্স ও আরও কিছু পেশার মানুষ আছেন যাঁদের পুজোতেও কাজ করে যেতে হয়, সেখানে তাঁদের কাছে ঠাকুর দেখার আনন্দটা লাইন দিয়ে নয়, বরং মোবাইল ফোনেই।
দেবযানী মিত্র দত্ত (গৃহশিক্ষিকা)
আমার মতে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মোবাইলে ঠাকুর দেখাতেই আনন্দ। কারণ যাঁদের বয়স হয়ে গিয়েছে, হাঁটতে চলতে অসুবিধা অথবা যাঁরা ভিড় পছন্দ করেন না বা যাঁরা শয্যাশায়ী, তাঁদের জন্য মোবাইলে ঠাকুর দেখাই অনেক আনন্দের। বয়স্ক মানুষদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কেউ হয়তো থাকে না। অথচ সারা বছরের একটা প্রতীক্ষা থাকে মা দুর্গাকে মণ্ডপে গিয়ে দেখার। কিন্তু শরীর সঙ্গ না দিলে মুঠোফোনই ভরসা। আজ মোবাইলের মাধ্যমে আমরা বলতে গেলে পুরো পৃথিবীর প্রায় সব খবরই ঘরে বসে দেখতে পাই। পুজোমণ্ডপগুলো এত দুর্দান্ত থিম দিয়ে সাজানো হয় যে দেখতে খুব ভালো লাগে। চারিদিকে আলোকসজ্জা সকলের মন ভালো করে দেয়। ভিড়ের মধ্যে বয়স্ক বা অসুস্থ মানুষদের পক্ষে লাইন দিয়ে দেখা সম্ভবই নয়। তাই মোবাইলের মাধ্যমে মাকে দর্শন করেই মন ভালো হয়।
প্রত্যুষা (ছাত্রী)
লাইন দিয়ে ঠাকুর দেখা মজা আলাদা ঠিকই কিন্তু অনেক সময় উপচে পড়া ভিড় হয়ে যায়। তখন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হয় না। বিশেষত সপরিবারে ঠাকুর দেখতে বেরলে বয়স্ক সদস্যদের অতক্ষণ লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা যায় না। কারণ তাঁরা শারীরিকভাবে পুরোপুরি সক্ষম নন। আবার অনেক সময় ছোট শিশুরাও লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে যায়। আবার বহু জায়গায় প্রতিমা দর্শনে গিয়ে ধাক্কাধাক্কি হয়, তাতে অসুস্থ হয়ে পড়েন কেউ কেউ। এসব কারণেই মোবাইলে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ঠাকুর দেখা শ্রেয়।